আরো কাছে।
বাবলি এখন তার দেহের সঙ্গে এক। আর যুগলে যেন বাজছে সেই ছোট ছোট ড্রাম। দোকানে দেখা খেলনা ড্রাম। নীল রং চারদিকে। মাঝখানে একটা উজ্জ্বল লাল রেখা। বৃত্তাকারে ঘুরছে নীল, লাল, নীল। আবার নীল, আবার লাল, আবার নীল। ঘুরতে ঘুরতে রং দুটো একাকার হয়ে গেল। বাজনার দ্রুত লয় যেন বাবরের অস্তিত্বকে অতিক্রম করে এখন হঠাৎ শেকলকাটা পাখিব মত উড়ে গেল উর্ধে আকাশে, শূন্যে। উজ্জ্বল রোদে পুড়ে যেতে লাগল বাবরের চোখ। সে দুহাতে সজোরে চেপে ধরল। তার উত্তপ্ত অধীর দ্রুত স্পন্দিত শিশ্ন। এবং তৎক্ষণাৎ এক বহু আকাঙ্গিক্ষত, মন্ত্ৰোচ্চারিত, খরচৈত্রের বৃষ্টির আবেগে আকাশ বিদীর্ণ হয়ে নেবে এলো অন্ধ, অজস্র শাস্ত্রে বর্ণিত চল্লিশ দিন-রাত্রির প্রান্তর পাহাড় ডোবান মুখর জলধারা। বাবর ভেসে যেতে লাগল স্থলিত একটা সবুজ পাতার মত।
দিনের প্রথম কাজ ব্যাংকে যাওয়া। হতরন সাহেবের মেয়ের গহনার দরুন সাড়ে ন হাজার তুলতে হবে। চেক কাটতে ভুলে সাড়ে দশ হাজার লিখে ফেলল বাবর। ভুলটা আর সংশোধন করল না। সাড়ে দশ হাজারই তুলল। এক হাজার নিজের কাছে থাকবে। এত টাকা এক সঙ্গে সাধারণত নিজের জন্যে রাখে না, আজ রাখল। বাবর ঘটনাচক্ৰে বিশ্বাস করে। কে জানে, কখন কী হয়, কোন কাজে লাগে। নোট নেবার সময় বাবর পুরনো নোটই পছন্দ করল। কিন্তু এমনভাবে পুরনো নোট সে চাইল যেন কারো সন্দেহ না হয়। হতরন সাহেবকে পুরনো নোট দেয়া তার জন্যে, বাবরের জন্যে, উভয়ের জন্যেই নিরাপদ। কেবল নিজের নোটগুলো নতুন দশ টাকায় নিল সে। ম্যানেজার সাহেব জিগ্যেস করলেন, কী ব্যাপার বাবর সাহেব। এক সঙ্গে হঠাৎ এত টাকা ক্যাশ দরকার পড়ল?
একটা জমি কিনব। আজ বায়না হচ্ছে।
তাই নাকি? কোথায়?
বনানীতে।
মোনায়েম খাঁর বাড়ির পাশেই নাকি? বলে ম্যানেজার খ্যা খ্যা করে হাসলেন, উচ্চাঙ্গের একটি রসিকতা করছেন। বাবরও তার জবাবে তারই মত খ্যা খ্যা করে হাসল ইচ্ছে করে। ম্যানেজার তা দেখে আরো সুধা ঢেলে উচ্চগ্রামে। এবার খ্যা খ্যা করে উঠলেন। বাবর ব্যাংক থেকে বেরুল।
হঠাৎ মনে হলো, খবরের কাগজে কি হতরন সাহেবের নাম বেরিয়েছে? মোড় থেকে কাগজ কিনে তন্নতন্ন করে দেখল সে। তা, সাসপেণ্ড অফিসারদের নামের লিস্ট আজও বেরোয়নি। তার মানে আর একটা দিন ভদ্রলোক এই রোজার দিনে দারুণ উৎকণ্ঠায় ভুগবেন। এ হচ্ছে স্বয়ং ঈশ্বরের নাটক। বাবর হাসল।
হতরনের বাড়ির সামনে এসে তাকিয়ে দেখল। চারদিক। না, সন্দেহজনক কাউকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। টাকাটা খবরের কাগজে মুড়ে সে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে কলিং বেল টিপল। অপেক্ষা করল। কেউ সাড়া দিল না। আবার বেল বাজাল। অনেকক্ষণ পর্যন্ত দরজা খুলল না কেউ। বেলটা আবার টিপতে যাবে দরজা ফাঁক হলো। দেখা গেল হতরন সাহেবের নিশিজাগা চেহারা।
বাবর বলল, এই যে। এবং খবরের কাগজের মোটা মোড়কটা হাতে তুলে দিল তাঁর। বলল, এতে আছে।
উত্তরের অপেক্ষা না করে সে ফিরে এলো গাড়িতে। আবার চারদিকে দেখল। একটা লোক গাছতলায় দাঁড়িয়ে আছে দূরে। আই বি-র লোক? আচ্ছা, দেখাই যাক। বাবর একটা সিগারেট বের করে। এ-পকেট ও-পকেট হাতড়াবার ভাণ করল। তারপর লোকটার কাছে গিয়ে বলল, দেশলাই আছে?
লোকটা যেন কৃতাৰ্থ হয়ে গেল। দেশলাই বার করে দিল বাবরের হাতে। না, গোয়েন্দা হলে এতটা কৃতাৰ্থ হতো না। বাবর সিগারেট ধরিয়ে গাড়িতে ফিরে গেল, আয়নাটা একটু ঘুরিয়ে দিল যাতে লোকটাকে দেখা যায়। খুব ধীরে গাড়ি চালাল সে। কিছু দূর গেল। দেখল লোকটা এবার চারদিক দেখে গাছতলায় বসল প্রস্রাব করতে।
যাঃ বাবা। এই ব্যাপার? সেই জন্যে লোকটাকে আমন উসখুস করতে দেখা গিয়েছিল? বাবর গাড়ির গতি বাড়িয়ে পলকে বড় রাস্তায় গিয়ে পড়ল তখন।
ঘড়ি বলছে, দশটা দশ। জাহেদা নিশ্চয়ই এখন হোস্টেলে নেই। ওর সঙ্গে দেখা করা দরকার। প্রথমত, বাবলি কী করে তার চিঠি দেখল। দ্বিতীয়ত, উত্তর বাংলায় জাহেদা যেতে রাজি কি-না। এই দুটো ব্যাপার পরিষ্কার করা দরকার।
হোস্টেলের দারোয়ানকে সে জিগ্যেস করল জাহেদার কথা।
আচ্ছা দাঁড়ান, দেখে আসি।
শিগগির।
আরেকটা সিগারেট ধরাল বাবর। পায়চারি করল খুব ছোট পরিসরে। গাছপালার মাথায় আলোর নাচন দেখল। তখন ফিরে এলো দারোয়ান।
রুমে নেই।
ও। আচ্ছা। এলে তাকে বলবে–না থাক, আমি আবার আসব। বাবর এয়ারপোর্টে এলো। সকালে ঘুম থেকে এত দেরি করে উঠেছিল যে, নাশতা খাবার সময় ছিল না। খিদেও ছিল না তেমন। এখন প্ৰচণ্ড খিদে করে উঠল। সে রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসল। আলতাফের প্লেন সকাল পৌনে আটটায় ছেড়ে গেছে। আলতাফ কি কাজগুলো ঠিক মত গুছিয়ে আসতে পারবে? ভ্ৰকুঞ্চিত করে ভাবল খানিক বাবর। এখন সময় খুব সুবিধে যাচ্ছে না। হতরন সাহেব কাজটা দেবেন বলেছিলেন, তিনি নিজেই এখন কাৎ। এর আগে একটা কাজে বিশেষ কিছু থাকেনি। আজ সাড়ে নহাজার টাকা অমনিই চলে গেল। না দিলেও পারত। আলতাফ না দিতেই বলেছে। কিন্তু তার যে কী হলো, হঠাৎ মনে হয়েছিল টাকাটা না দেয়া খুব বড় রকমের অন্যায় হবে।
অনুতাপ বাবরের স্বভাববিরুদ্ধ। যারা অনুতাপ করে তারা এগোয় না। অনুতাপ একটি শিকলের নাম। কী করলাম সেটা বড় নয়, কী করছি সেটাই বিবেচ্য। বিলেতে থাকতে একটা নাটক দেখেছিল বাবর। তার একটা কথা এখনো মনে আছে তার। মেয়েটি জিগ্যেস করেছিল, আমি কোথায়? ছেলেটি তার উত্তরে বলেছিল, অতীত এবং ভবিষ্যতের মাঝখানে, যেখানে তুমি আগেও ছিলে, এখন আছ এবং পরেও থাকবে। অসংখ্য বর্তমানের গ্রন্থনা আমাদের জীবন।
