বাবলি তুমি জেগে আছ? কী করছ বাবলি? কোন ঘরে টেলিফোন? বাবলি, তুমি রাগ করেছ? আমি এগারটায় টেলিফোন করেছিলাম।
মিথ্যে কথা।
তুমি টেলিফোনের কাছে ছিলে?
বাবলি তার উত্তর করল না।
ছিলে তুমি টেলিফোনের কাছে?
আপনি মিথ্যে কথা বলেন।
হাসল বাবর। বলল, হ্যাঁ মিথ্যে বলেছি। তোমাকে মিথ্যে বলে দেখলাম কেমন লাগে। তুমি আমাকে বকবে না। বাবলি? বকো না? আমি খুব খারাপ। আমি খুব খারাপ লোক। তোমাকে এতক্ষণ বসিয়ে রেখেছি।
জি না, আমি আপনার জন্যে বসেছিলাম না।
টেলিফোন তোমার ঘরে? ঘুমুচ্ছিলে? আজ জান, সারাক্ষণ তোমার কথা মনে পড়েছে। মনে হয়েছে। জীবনের সবচে ভাল একটা দিন আমার আজ। এই দিনটার জন্যেই আমার জন্ম হয়েছিল। বাবলি! তোমাকে বড্ড দেখতে ইচ্ছে করছে। কাল আসবে?
না।
এসো না কাল?— আচ্ছা, পরশু সকালে। কলেজ যাবার পথে।
না।
তুমি খুব রাগ করেছ। এত রাগ করতে নেই। আমি তোমার ভাল চাই। তুমি কত বড় হবে। কত নাম হবে তোমার। তোমার বিয়ে হবে। আমি তোমার বাড়িতে বেড়াতে যাব। আচ্ছা, আমি গেলে আমাকে কী খেতে দেবে?–বল। বল? বাবলি?–না, তুমি সত্যি রাগ করেছি। আমাকে একবার বকে দাও। বাবলি? সত্যি একটা জরুরি কাজে এমন আটকে গেলাম, তাছাড়া টেলিফোনটাও খারাপ ছিল, এই একটু আগে ঠিক হয়েছে। মাত্র কয়েক মিনিট আগে। বিশ্বাস কর।
আপনি মনে করেন, আমি ছেলে মানুষ, না?
যাক, কথা বললে তাহলে। আমি ভাবলম, আর কোনোদিন আমার সঙ্গে কথা বলবে না।
আপনি মনে করেন, আমি কিছু বুঝি না?
তা কেন? তুমি সব বোঝা। তুমি সব বোঝ বলেই না আজ তোমাকে এত আদর করলাম। আসবে না কাল?
টেলিফোন আপনার খারাপ ছিল না।
তুমি রিং করেছিলে নাকি?
না।
তাহলে কী করে বুঝলে?
হ্যাঁ, করেছিলাম।
আমি বাসায় ছিলাম না। এই তো? বাইরে আটকে গিয়েছিলাম। চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে সাহেব এসেছেন তার সঙ্গে কিছু আলোচনা ছিল। উনি কালকেই ইয়োরোপ যাচ্ছেন। আবার দশদিন পর ঢাকায় আসবেন। তোমার জন্যে একটা মজার জিনিস আনতে দিয়েছি তার কাছে।
চাই না। আমি আপনার জিনিস।
কেন? এত রাগ করলে আমি কোথায় যাব বলতে পার?
যেখানে আপনার খুশি। আপনার কত জায়গা।
হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। কিন্তু তারা আমার আপন নয়।
আমিও আপনার কেউ না।
তুমি আমাকে টেলিফোন না করার জন্যে যে শাস্তি দেবে তাই নেব।
আমি আপনাকে টেলিফোন করতে বলিনি।
আচ্ছা শোন, এসব টেলিফোনে হয় না। কাল তুমি এসে আমাকে খুব করে বকে দিয়ে যাও। আসবে না?
কোনোদিন আর আসব না।
কেন?
জাহেদার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল।
কবে?
আজ।
আমার এখান থেকে যাবার পর?
হ্যাঁ।
কেমন আছে ও?
মিথ্যেবাদী। আপনার সঙ্গে ওর সোমবারেও দেখা হয়েছে।
তাই বলে কেমন আছে জিগ্যেস করতে নেই আজ?
আপনার চিঠি দেখলাম।
হৃৎপিণ্ডটা যেন গলার কাছে উঠে এলো বাবরের। বলল, দেখলে?
হ্যাঁ।
ও দেখাল?
জাহেদা তোমাকে দেখাল?
যে ভাবেই হোক, আমি দেখেছি।
তারপর?
ঘটনার হাতে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে বাবর বলল, তারপর কী?
আবার কী? আপনি কোনোদিন আমাদের বাসায় আসবেন না। যদি আসেন ভাইয়াকে সব বলে দেব।
বেশ, আসব না।
আপনি, আপনি একটা ইতর। আপনি মানুষ না। আপনি সব পারেন। টেলিফোন রাখার শব্দ শুনল বাবর।
বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল সে। তাকিয়ে রইল বাতির দিকে। কেমন একটা অস্পষ্ট রামধনু বাতিটা ঘিরে স্থির হয়ে আছে। কোথায় যেন সে শুনেছিল, এটা একটা ব্যাধিবাতির চারদিকে এই রামধনু দেখাটা। কালকেই একবার চোখের ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। এই যে মাঝে মাঝে মাথাটা একটু টিপ টিপ করে এটাও বোধহয় এই চোখেরই জন্যে। কিন্তু সে তো সব কিছুই পরিষ্কার দেখতে পায়। পড়তে পারে। নাকি, বর্ণকানা হয়ে যাচ্ছে?
বাবর হাসল। বর্ণকানা? মন্দ কী? লালকে বেগুনি দেখবে। সবুজকে নীল। আমরা কি বর্ণের সম্পূর্ণ ব্যঞ্জনা এই দুটো চোখ দিয়ে উপলব্ধি করতে পারি? আমি একটা গাছের পাতাকে যতটুকু সবুজ দেখি, যে সবুজ দেখি, আরেকজন কি ঠিক তাই দেখে?
আজ হুইঙ্কিটা একটু বেশি হয়ে গেছে।
আশ্চর্য, পরপর দুদিন দুটো মেয়ে প্রায় একই কথা বলল। বাবর কোনো কারণ খুঁজে পায় না, কেন লতিফা তাকে ঐ কথাগুলো বলেছে। কেন সে লেখাপড়া ছেড়ে বিয়ের কনে হতে চলেছে? আর জাহেদাই বা কী রকম? চিঠিটা বাবলি দেখল কী করে? কী লিখেছিল। সে চিঠিতে? কথাগুলো মনে আছে? না। বক্তব্যটা মনে পড়ছে, শব্দগুলো মনে নেই। বাবলি দেখেছে চিঠিটা। দেখেছে? না, জাহেদা দেখিয়েছে? জাহেদা কেন হঠাৎ দেখাতে যাবে? তাহলে জাহেদা কি তার সাথে যাবে না? জাহেদা তো বলেছিল, যাবে। তারা দুজন এক সঙ্গে উত্তর বাংলা যাবে।
খেলারাম, খেলে যা। বাবলি জেনেছে, জানুক। কাল যদি বাবলি তার বাসায় আসে তাতেও আশ্চর্যের কিছু নেই। ঐ বয়সের মেয়েরা বরং আসব না বলেই আসে। না বলে হ্যাঁ করে। বাবলি এলে, কাল তাকে আর সে ছাড়বে না। শুধু আদর নয়, চুমো নয়, কথা নয়। বাবলিকে সে কাল সোজা বিছানায় নিয়ে যাবে।
বাবর শুধু এই কথাটা ভুলে গেছে, বাবলি স্পষ্ট বলে দিয়েছে, সে আসবে না। বোধহয় হুইঙ্কির জন্যে তার এখন বিশ্বাস করতে কোনো বাধা হচ্ছে না যে বাবলি কাল আসবে।
বাবর টের পায় আবার তার দুপায়ের মাঝখানে উত্তাপ বাড়ছে। বড় হচ্ছে। তার দেহকে ছাপিয়ে উঠছে আয়তনে। বাবর উপুড় হয়ে শুল। শাসন মানল না। তবু বড় হতে লাগল। উত্তাপে উত্তেজনায় যেন সেখানে ছোট ছোট ড্রাম বাজানোর কাঠিতে বাড়ি পড়তে লাগল। সৃষ্টি হতে লাগল একটা দ্রুত লয় ছন্দের। লয়টা দ্রুত থেকে আরো দ্রুত হতে লাগল। চোখের ভেতরে বাবলিকে সে দেখতে পেল স্পষ্ট। নির্বাক। নগ্ন। কাছে, আরো কাছে। সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে তাকে অনুভব করতে লাগল বাবর।
