হতরন সাহেব বলে উঠলেন, বাবার সাহেব?
বাবর সচকিতে তাকাল তার দিকে। অভ্যাসবশত এক টুকরো হাসিও ফুটে উঠল তার সমস্ত মুখে।
বলুন।
বাবর ছাইটা নিজেই ঝেড়ে ফেলে দিল।
আমি এই এত বছর চাকরি করলাম, মনে করতে পারেন লাখ লাখ টাকা বানিয়েছি। সবাই তাই মনে করে। গভর্ণমেন্টও তাই মনে করছে। কিন্তু শুনলে অবাক হবেন, আমার ব্যাংকে একটা পয়সাও নেই। বড় কষ্ট করে জীবনটা চালিয়ে এলাম। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে পেরেছি, ঐ যা। কিন্তু একটা বাড়ি বলুন, এক টুকরা জমি, বেনামিতে টাকা–কিছু না। শুনি, আমাদের কোনো কোনো সাহেবের ফরেনে টাকা পয়সা আছে—
থাক ওসব। নাইবা বললেন।
না, না, বলছি। এই জন্যে যে, আপনাদের কাজটা করে দিতে চেয়েছিলাম বলে মনে করবেন না, আমি যে আসে তার জন্যেই করি। আপনারা মানে আপনাকে আমি অন্য চোখে দেখি। আপনিও রিফিউজি, আমিও আমার পৈতৃক বাড়িঘর জমিজমা সব মুর্শীদাবাদে ছেড়ে এসেছি। মেয়েটার বিয়ে যে কষ্ট করে দিতে হচ্ছে তা বললে কেউ বিশ্বাস করবে না–আপনারা আমার মেয়েকে নিজের মনে করে কিছু দিতে চেয়েছিলেন–বলতে বলতে ভদ্ৰলোক উদগ্রীব চোখে তাকালেন বাবরের দিকে। কথা শেষ করতে পারলেন না। ভয়, পাছে বাবর তার প্রতিবাদ করে। কে জানে হয়ত সে জন্যেই এত রাতে সে এখানে এসেছে কি-না।
বাবল বলল, আমি সেই ব্যাপারে এসেছি।
কেন, কিছু–অন্য রকম কিছু–মানে–বলুন।
গয়নার টাকাটা আমরা দেব বলেছিলাম।
সে আপনাদের দয়া।
বাবরের হঠাৎ রাগ হলো ভদ্রলোকের দীনতা দেখে। এরা পৃথিবীতে বাস করে কী করে? তার সামনে বাবর তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজেকে ঈশ্বরের মত মনে করতে বাধ্য হচ্ছে। বাবরের হাতে তার সব কিছু নির্ভর করছে এখন– অথচ বাবর মোটেই তা উপভোগ করতে পারছে না। তাই সে চুপ করল।
ভদ্রলোক বললেন, গয়না। আমি নিয়ে এসেছি। এখন—
জানি। টাকাটা দেব বলেছিলাম।
হ্যাঁ।
টাকাটা চেকে দিলে অসুবিধে হতো। আপনার নাম জানি না লিষ্টে আছে কি-না। কিছু চিন্তা করবেন না। টাকাটা নগদ কাল আপনি পেয়ে যাবেন। আমি দিয়ে যাব।
ভদ্রলোকে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। এক মুহূর্তে তার চেহারাটা আলো হয়ে উঠল। তিনি কিছু শব্দ খুঁজলেন, কিন্তু পেলেন না। শেষে বললেন, একটু চা খান।
না, আমি চলি। এই কথাটা বলতে এসেছিলাম।
অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনাকে কী আর বলব।
আর শুনুন, আলতাফ যেন না জানে।
আমার মেয়ের বিয়েতে আসবেন না?
আসব। চলি এখন।
কিছু খেলেন না?
আবার কোনোদিন।
আচ্ছা, আমার নাম কী লিষ্টে আছে বলে মনে করেন?
আমি খবর পাইনি। ভয়ের কি আছে। বিপদ তো পুরুষ মানুষের জন্যেই। ভয় করলেই ভয়।
তবু, এই বয়সে মান সম্মান।
আমি যাচ্ছি। কাল টাকা পাবেন।
ভদ্রলোক বাবরকে দরোজা পর্যন্ত এগিয়ে দেবার শক্তি পর্যন্ত পেলেন না। নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন ঘরের মাঝখানে।
ঘরে এসে শুতে যাবে হঠাৎ বাবরের মনে পড়ল বাবলির কথা। দৌড়ে সে টেলিফোনের কাছে গেল। রিসিভারটা তুলল। নামিয়ে রাখল। নিজের বুকের স্পন্দন শুনতে পাচ্ছে সে স্পষ্ট। হাতঘড়িটা খুঁজল। বাথরুমে খুলে রেখেছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তার সমস্ত শরীর যেন পাকিয়ে উঠল একটা দীর্ঘ স্কুর মত। ঘড়িতে সাড়ে বারোটা বাজে। সে বলে এসেছিল, বাবলিকে, এগারটায় তার টেলিফোনের অপেক্ষা করতে। বাবলির দুটো স্তন আবার সে দেখতে পেল ঘড়ির ডায়ালে। আর নাকে সেই অস্পষ্ট সুঘ্ৰাণ।ধীরে, যেন স্বাস্থ্যস্বচ্ছল। খোকা মায়ের কোলে ঘুম থেকে জেগে ওঠে, তেমনি নড়ে চড়ে উঠল তার শিশ্ন। বড় হতে লাগল। উত্তাপ বিকিরণ করতে শুরু করল। উত্তাপে, আয়তনে, সে তার দেহের চেয়েও বিশাল হয়ে উঠল যেন। তারপর আবার হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ল। শীতল হয়ে গেল। অস্তিত্ব অবলুপ্ত হলো তার। বাবর টেলিফোনের কাছে এলো।
এখন ডায়াল করবে বাবলিকে? এই মাঝ রাতে, যখন ওদের বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, নিস্তব্ধ হয়ে গেছে চারদিক। গভীর রাতে টেলিফোনের আওয়াজ বড় উচ্চগ্রামে বাজে। যদি সবার ঘুম ভেঙ্গে যায়? যদি বাবলির ভাই টেলিফোন ধরে? যদি বাবলিই ধরে আর পাশের ঘরে কান খাড়া করে থাকে তার ভাবী?
হাসি ফুটে উঠল বাবরের ঠোঁটে। খেলারাম, খেলে যা। মন্দ কী? বাবর প্রলুব্ধ হলো বিপদের সামনা করতে। বিপদ যদি আসেই দেখা যাক না আমি কী করে সামলাই। রিসিভারটা তুলে নিল বাবর। ধীরে, একটার পর একটা নম্বর ঘোরাল সে। শুনল অন্য দিকে বেজে উঠল টেলিফোন। কিম্বা এত দ্রুত যে, বেজে ওঠার আগেই কেউ রিসিভার তুলল। কিন্তু অপর পক্ষ কোনো সাড়া দিল না।
গাঢ় হিংস্র একটি স্তব্ধতা।
তখন বাবর বলল, হ্যালো।
সে স্তব্ধতা আরো বিকট হয়ে উঠল।
বাবর আবার বলল, হ্যালো।
তবু সেই স্তব্ধতা হত্যা করে কেউ উত্তর দিল না। কিন্তু আশ্চৰ্য, বাবরের মনে হলো স্তব্ধতা এখন তার হিংস্ৰ নখরগুলো গুটিয়ে আসছে আস্তে আস্তে। ঘুমিয়ে পড়ছে। বাঘের সুবৰ্ণ পিঠে ধীরে ধীরে সূর্যোদয়ের আলো এসে পড়ছে। নির্মল বাতাস বইতে শুরু করেছে দিগন্তের দিক থেকে।
বাবর অত্যন্ত কোমল প্ৰশান্ত কণ্ঠে প্ৰায় ফিস ফিস করে উচ্চারণ করল, হ্যালো।
অপর দিক থেকে জবাব এলো, এখন পৌন একটা বাজে।
বাবলি! বাবলি! বাবলি!
নামটা বারবার উচ্চারণ করেও তাপ্তি হলো না বাবরের। যেন এই উচ্চারণের মধ্য দিয়ে টেলিফোনের তারের ভেতর দিয়ে তার ঈষৎ কম্পিত দুটো হাত বাবলির শ্যামল মুখটাকে আদর করতে লাগল।
