পরপর কয়েকটা হুইস্কি খেল বাবর। খুব দ্রুত সেরে নিল রাতের আহার। তারপর বলল, আলতাফ, আমি একটু অন্যখানে যাব। কাল দেখা হবে।
কাল কোথায় দেখা হবে?
কেন, অফিসে?
ভুলে গেছ, কাল রাওয়ালপিণ্ডি যাচ্ছি।
ওহো তাইতো।
সেই জন্যেই তোমাকে খুঁজছিলাম। চল আমার বাসায়। কাগজপত্র নিয়ে একটু বসব। কমার্স সেক্রেটারির সঙ্গে সেই ফাইলটা নিয়ে–
হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে আছে। চল।
আলতাফ তাকে বাসায় এনে আবার একটা হুইস্কি দিল।
আবার কেন?
খাও না? ভাল জিনিস। জাপানের।
বাহ, বেশ চমৎকার তো।
বোতলাটা শেষ করবে নাকি আজ?
তুমি ফাইল বের কর।
ফাইল নিয়ে ড়ুবে গেল বাবর। কয়েকটা এষ্টিমেট দুজনে বসে আবার দেখল। না, যা করা হয়েছে, ঠিকই আছে। এই ড্রাফটা ভাল করে লেখা হয়নি। নতুন করে আবার লিখে দিল বাবর। কয়েকটা সই বাকি ছিল, সই করল। তারপর বলল, রাওয়ালপিণ্ডি থেকে ফিরছ কবে?
তা এক সপ্তাহ লাগবে।
পারলে একবার করাচি ঘুরে এসো। জাহাজের সেই—
হ্যাঁ, মনে আছে। ওটা তদ্বির করতে হবে।
এবারে একটা ফাইন্যাল কিছু করে আসা চাই-ই।
দেখি। মনে হয় করতে পারব।
আমি চললাম। গুড লাক।
বোতলাটা নিয়ে যাও।
না, থাক।
আরো জাপানি জিনিস।
থাক। ফিরে এসো এক সঙ্গে খাওয়া যাবে।
আলতাফ ফটিক পর্যন্ত এলো। বলল, আর শোন হতরন টেলিফোন করলে নিজে বলতে না পার বল আলতাফ না আসা পর্যন্ত কিছু বলতে পারছি না।
আচ্ছা।
সাড়ে নহাজার খুব কম টাকা নয়।
আমি জানি।
আচ্ছা দেখা হবে।
বাবর তীব্ৰবেগে গাড়ি ছুটিয়ে বড় রাস্তায় এসে পড়ল। তারপর গাড়ি থামিয়ে পকেট থেকে নোটবুক বের করে দেখে নিল হতরনের বাড়ির ঠিকানা। বাড়িটা খুঁজে পেতে দেরি হলো না। দরোজায় বিজলী বোতাম টিপল সে। একজন এলো। তাকে বলল, সাহেবকে ডেকে দাও।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এলেন তিনি। বাবরকে দেখেই বিস্ময়ে স্থলিত গলায় বলে উঠলেন, আপনি?
হ্যাঁ, আমি।
ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে বাবরের হাত চেপে ধরলেন। আমার কথা শুনেছেন সব?
হ্যাঁ শুনেছি।
আপনার কী মনে হয়, আমার বাড়ি ওয়াচ করছে ওরা?
ভয় পাবেন না। গাড়ি দূরে পার্ক করেছি। আমি এসেছি। কেউ জানবে না।
আমি, আমি কিন্তু গয়নাগুলো নিয়ে এসেছি।
জানি।
আপনাদের কাজটা করে দিতে পারলাম না। এদিকে এই বয়সে দেখুন দিকি, একটা কিছু হলো লজ্জায়–সামনে মেয়ের বিয়ে–অথচ জানেন, বহু অফিসার যারা রিয়ালি কিছু করেছে, তারা দিব্যি আছে, তাদের নাম পর্যন্ত কেহ করছে না।
আপনি শান্ত হয়ে বসুন।
বসছি, বসছি। এখন কী হবে। বলতে পারেন?
কী আর হবে? যা হবার তাই হবে। ঘাবড়াচ্ছেন কেন?
না। ঘাবড়ে আর কী হবে। চা খাবেন?
থাক, কষ্ট করবেন না। আলতাফের সঙ্গে দেখা হয়েছিল?
না।
টেলিফোন করেছিল?
না। কেন বলুন তো?
আপনার মেয়ের বিয়ে কবে?
সামনের বারো তারিখে।
কেনাকাটা সব হয়ে গেছে?
জি, এক রকম সবই হয়েছে। যদি লিষ্টে আমার নাম বেরোয় তাহলে কী করে যে বিয়ের দিন সবার সামনে দাঁড়াব। আচ্ছা, আপনি আলতাফ সাহেবের কথা জিগ্যেস করলেন কেন? উনি হাই সার্কেল থেকে কিছু শুনেছেন নাকি? আমার নাম আছে?
সত্যি, আপনি ছেলে মানুষের মত করছেন।
ভদ্রলোক তখন দুহাতে মাথা চেপে শূন্যদৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে বসে রইলেন। এক আধবার চেষ্টা করলেন শুকনো ঠোঁটজোড়া জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিতে। কিন্তু সে শক্তিটুকু তার দেহে অবশিষ্ট নেই। জিভটা বেরিয়েও যেন বেরুল না। দেখে হাসি পেল বাবরের। কিন্তু না, হাসলে নিষ্ঠুরতা করা হবে।
ভদ্রলোক হঠাৎ চোখ তুলে কিছু একটা বলার জন্যেই যেন বললেন, আপনি এলেন বাবর সাহেব, খুব ভাল করেছেন। সারাদিন ঘরের মধ্যে ছটফট করেছি। রোজা ছিলাম। তারাবির নামাজ পর্যন্ত পড়তে যাইনি। আমার এই বড় মেয়েটা বুঝলেন বাবর সাহেব খুব আদরের। ছেলেটাও ভাল পেয়েছি। এ রকম ভাল পাত্র পাওয়া ভাগ্যের কথা; এবার এমআরসিপি করে ফিরেছে। আলতাফ সাহেব এলেন না?
কী বলতে কী বলছেন ভদ্ৰলোক। এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে যাচ্ছেন ঠিক যেন একটা চড়াই। না, উপমাটা ঠিক হলো না। মাথার ভেতরে হুইঙ্কি কাজ করতে শুরু করেছে। বাবর দেখেছে, একটু বেশি সুরা পান করলেই এ রকম হাস্যকর কথা সব তার মনে পড়তে থাকে।
হতরন সাহেব আবার নীরব হয়ে গেলেন। আবার তার ঠোঁট শুকিয়ে এলো। আবার তিনি জিভ দিয়ে তা ভেজাবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলেন। এবারে তিনি বাবরের দিকে ভীত কিন্তু গভীর চোখে তাকিয়ে অনুমান করতে চেষ্টা কলেন কেন সে এসেছে। তার ভীষণ অস্বস্তি হতে লাগল। কেন লোকটা বলছে না। তার আসার আসল উদ্দেশ্য কী?
কিন্তু বাবর নিজে যে কোন চুপ করে আছে তা সে নিজেও বলতে পারবে না। একবার তার মনে হচ্ছে, সে গভীর ভাবে কী ভাবছে, আবার মাচ্ছে, না ভাবছে না। শূন্যতা, অসীম এক শূন্যতার মধ্যে বিনিসুতো ঝুলে আছে সে।
সোয়াতের গিরিশৃঙ্গগুলোর ফাঁকে ফাঁকে যেমন নীল শূন্যতা, শীতল শূন্যতা, স্তব্ধ শূন্যতা–এ যেন তেমনি। বাবর একবার মনোযোগ দিয়ে দেখছে–হতরন সাহেবের পা জোড়া যেন সেখানে কোনো দুর্বোধ্য লিপিতে কিছু লেখা আছে। আবার সেখানে থেকে চোখ ফিরিয়ে ভদ্রলোকের গালে কাটা জায়গাটা দেখছে। দেখতে দেখতে সেই দাগটা এত বড় হয়ে গেল যে তাতে আবৃত হয়ে গেল দৃশ্যমান সব কিছু। কোথায় যেন ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছে। ঝরে যাচ্ছে। আশা, উদ্যম, বর্তমান, ফোঁটায় ফোঁটায় নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে। বাবরের হাতে সিগারেট পুড়ছে। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে ছাই। আস্তে আস্তে বাঁকা হয়ে যাচ্ছে ধনুকের মত। বাবর উদ্বেগ নিয়ে এখন তাকিয়ে দেখছে কখন খসে পড়বে হাইটুকু। এই বুঝি পড়ে। এই বুঝি পড়ল। না, এখনো কিছুটা শক্তি, কিছুটা আকর্ষণ অবশিষ্ট আছে। বশির মত বাঁকা হয়ে এসেছে, তবু ধূসর সুগোল দীর্ঘ ছাইটা বিচ্ছিন্ন হচ্ছে না সিগারেট থেকে।
