হঠাৎ তার পিঠ স্পর্শ করল কেউ। বাবর ঘুরে দেখল। আলতাফ। তার বিজনেস পার্টনার। আলতাফ বলল, আমি তোমাকে গরুখোঁজা করছি।
বাজে কথা! বাসায় এইমাত্র খবর নিয়েছি, কেউ আসেনি।
মানে, বাসায় এখুনি যেতাম।
এই তোমার গরুখোঁজা?
চল কোথাও বসি, জরুরি কথা আছে।
কী ব্যাপার?
এমন কিছু নয়। চল।
তোমার পারিবারিক কিছু?
না, না।
ব্যবসা?
হ্যাঁ, ব্যবসার।
চল, খেয়ে নিই। খেতে খেতে শুনব।
সে অনেক সময় লাগবে। তার চেয়ে বারে চল। কুইক দুটো হয়ে যাবে।
চল।
বারে এসে অর্ডার দিয়ে আলতাফ বলল, শুনেছ বোধ হয় সরকারি কিছু বড় অফিসার সাসপেণ্ড হচ্ছে?
হ্যাঁ, শুনেছি। আমাদের বন্ধুবান্ধব কে কে গেল?
এখনো পুরো খবর পাইনি। সবাই তো আল্লা আল্লা করছে।
ভালই তো।
তবে, একজনের একেবারে পাকা খবর।
কে?
আমাদের হতরন সাহেব।
বল কী? লাফিয়ে উঠল বাবর। সত্যি?
হ্যাঁ, সত্যি।
যার কথা তারা বলছে তিনি ব্রিজ খেলায় এক্সপার্ট। কিন্তু হরতন বলতে পারেন না। বলেন হতরন। সেই থেকে তার নাম হয়ে গেছে হতরন সাহেব।
মুশকিলের কথা।
বাবরকে চিন্তিত দেখাল।
হতরন যাচ্ছে তাহলে?
ইয়েস, স্যার। পাকা খবর। সেই জন্যেই তোমাকে খুঁজছিলাম।
এইমাত্র কিছুদিনের কথা, হতরন তাদের একটা বড় কাজ পাইয়ে দেবে বলেছে, যার কমিশনই হবে প্ৰায় পঞ্চাশ হাজার টাকা। শর্ত ছিল এই হতরনের বড় মেয়ের বিয়ে সামনে, গহনার সম্পূর্ণ টাকা দেবে তারা। গহনার অর্ডারও দেয়া হয়ে গেছে। কথা ছিল, গহনা নিয়ে যাবেন হতরন সাহেব, টাকাটা ওরা জুয়েলারকে দিয়ে দেবে।
বাবর জিজ্ঞেস করল, গহনা নিয়ে গেছে?
হ্যাঁ, আজই সকালে নিয়েছে। আমি টেলিফোন করেছিলাম।
আমাদের কাজটা।
সাসপেণ্ড হলে তো কাঁচা কলা পেলাম।
তা বটে।
আর সাসপেণ্ড না হলেই বা কী? এই সময় হতরন কেন হতরনের বাবাও কাজ দিতে সাহস করবে না।
তাইতো।
আলতাফ তাকে একবার ভাল করে দেখে বলল, মনে হচ্ছে তুমিও আজ খুব মনোযোগ দিতে পারছ না।
চমকে উঠল বাবর। বলল, না, তা কেন?
আমার যেন মনে হচ্ছে। আসল কথা কী জান? কথা হচ্ছে, গহনার টাকাগুলো। কাজ দশটা আসবে, একটা পাব, একটা পাব না।
তো কী করবে?
তুমি আজ সত্যি কিছু চিন্তা করতে পারছ না। কী হয়েছে?
কিছু না।
বুঝেছি। চল এবার গহনার দোকানে যাই।
গিয়ে কী হবে?
আচ্ছা, তোমার কী হয়েছে বল তো?
বাবর এবার সত্যি বিরক্ত বোধ করল। এক ঢোকে সবটা হুইস্কি গলায় ঢেলে দিয়ে বলল, চল গহনার দোকানে যাই।
গহনার দোকানে গিয়ে জানা গেল মোট দাম নহাজার সাতশ চুরাশি টাকা। সাড়ে নহাজার দিলেই চলবে।
আলতাফ বলল, দামটা আপনারা ওঁর কাছ থেকেই পাবেন।
কিন্তু কথা তো ছিল আপনারা দেবেন।
হাত কচলে অনাবিল একটা হাসি দিয়ে দোকানদার নিবেদন করল।
আলতাফ বলল, না, সে রকম কথা ছিল না।
মানে? বাবর চমকে উঠল। কিন্তু আর কিছু বলার আগেই নিজের হাতের উপর আলতাফের চাপ অনুভব করল সে।
আলতাফ এবার জোর দিয়েই বলল, আপনারা ভুল করছেন, সে রকম কোনো কথা ছিল না। দাম উনিই দেবেন। গয়না উনি নিয়ে গেছেন?
তা, নিয়েছেন।
তবে আর কথা কী?
কিন্তু আপনিই তো বলেছিলেন—
আপনি তখন ঠিক বুঝতে পারেননি। কথা ছিল, উনি গয়না নিয়ে যাবেন, যদি দাম নিয়ে গোলমাল হয়, তবে জিম্মা আমরা রইলাম।
কী বলছেন স্যার?
হ্যাঁ আপনারা যান তার কাছে। টাকা চান।
দোকান থেকে বেরিয়েই বাবর বলল, এটা কিন্তু ঠিক হলো না?
কী ঠিক হলো না?
এভাবে মিথ্যে বলাটা। দাম তো আমরাই দিতে চেয়েছিলাম।
আলতাফ গাড়িতে বসতে বসতে বলল, হঠাৎ এমন নীতিবাগিশ হয়ে উঠলে যে।
না, এটা নীতিবাগিশ টাগিশ কিছু না। কাজ পাচ্ছি না বলে ভদ্রলোককে তার মেয়ের বিয়ের সময় বিপদে ফেলাটা কিছু কাজের কথা নয়।
কী বলতে চাও তুমি?
ভদ্রলোকের কাছ থেকে অতীতে অনেক উপকার পেয়েছ। দু বার দু। দুটো কাজ দিয়েছিলেন।
তখন তাকে টাকাও দিয়েছি।
দিয়েছ, কিন্তু সেই দুটো কাজে কম লাভ আমরা করিনি। না হয় তার থেকে এই নয়। সাড়ে নয় হাজার টাকা দিলামই।
বুঝলাম না, আজ তুমি এই সাধারণ কথাটা বুঝতে পারছি না কেন। এই টাকাটা একেবারে পানিতে ঢালা হবে। অফিসার হিসেবে হি ইজ ডেড, ডেড ফর গুড়। কিম্বা তোমাদের ইংরেজিতে যাকে বলে ডেড আজ এ ডোর নেইল।
আলতাফ ইংরেজি একটু কম জানে বলে বাবরকে ইংরেজি নিয়ে মাঝে মধ্যে ঠাট্টা করতে ছাড়ে না।
বাবর দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, তবু আমার মনে হয়, গহনার দামটা আমাদের দিয়ে দেয়া উচিত। কী ব্যাপার, হতরনের বড় মেয়েকে দেখেছ নাকি?
দেখেছি, কেন?
চোখ টোখ ছিল নাকি তোমার?
বাজে কথা বল না।
কী জানি। তবে যাই বল, টাকা দেওয়ার বিরুদ্ধে আমি।
বাবর কিছু বলল না। অস্বাভাবিক একটা নীরবতার আশ্রয়ে সে বসে রইল। এ রকম বসে থাকা বাবরের স্বভাব নয়। কথা সে ভালবাসে। কথা না বলতে পারলে ডাঙ্গায় তোলা মাছের মত খাবি খায় সে।
আলতাফ বলল, চল হোটেলে যাই।
যেখানে তোমার খুশি।
তুমি রাগ করেছ?
মোটেই না।
এই জন্যেই মাঝে মাঝে তোমার ওপর আমার ভীষণ রাগ হয়। আলতাফ বলে চলল, তুমি সাধারণ একটু রাগও করতে পার না।
একেবারে মেয়েদের মত কথা বলছি। হা হা করে হেসে উঠল বাবর। বলল, ব্যবসা করতে গেলে রাগ করলে চলে না। ব্যবসা প্ৰেম নয়।
প্ৰেম তো তোমার কাছে বিছানায় যাবার রাস্তার নাম।
আবার হা হা করে হেসে উঠল বাবর। হাসতে দেখে আলতাফ আশ্বস্ত হলো। মনে করল, টাকা দেয়া না-দেয়া সম্পর্কে তার সিদ্ধান্তটাই বাবর মেনে নিয়েছে শেষপর্যন্ত। কিন্তু বাবরের সঙ্গে এতদিন ব্যবসা করলেও বাবরকে সে চেনে না, এইটে তার অজানা।
