কমোডে এই যে একটানা সরসর শব্দ হচ্ছে এখন, বাবলি কি শুনতে পাচ্ছে? দ্রুত হাতে সে ট্যাপ খুলে দিল। ট্যাপ থেকে পানি পড়ার শব্দে ড়ুবে গেল ঐ শব্দটা।
বাথরুমের তাকে একটা তুলোর রোল। কে ব্যবহার করে? বাবলি? তুলোটা একবার বুলিয়ে দেখল সে। তারপর চারদিকে তাকাল। একটা তোয়ালে ঝুলছে। ওপাশে চিলতে হয়ে আসা সাবান। দুটো টুথব্রাশ। পাজামার একটা ফিতে জড়িয়ে আছে ফ্লাশ হ্যাণ্ডেলের সাথে। বাবলির পাজামায় তো রবারের ব্যাণ্ড। এটা কার? ভাল করে সে দেখতে লাগল সব। না, বিশেষ করে বাবলির এমন কিছুই চোখে পড়ল না। বেরিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ দরোজার গায়ে দেখল পেন্সিল দিয়ে লেখা–বাবলি। ইংরেজিতে। কবে লিখেছিল? কেন লিখেছিল? লেখাটা ছুঁয়ে দেখল বাবর। তারপর ঠোঁট বাড়িয়ে স্পর্শ করল অক্ষরগুলো। প্রথমে একসঙ্গে সব কটা অক্ষর। পরে একটা একটা করে–বি এ বি এল আই। সন্তৰ্পণে দরোজা খুলে বেরুল বাবর। নিঃশব্দে বাবলির জানালার কাছে এসে থামল। ডাকল, এই।
বাবলি মাথা তুলল। না। বাবর দেখল রংটা সে ভুল দেখেছে। চাদরের রং নীল। সে বলল, রাত ঠিক এগারটায় আমাকে টেলিফোন কর।
কথা বলল না বাবলি। গলা আরো নামিয়ে আনল বাবর।
আচ্ছা, আমিই করব। টেলিফোনের পাশে থেকো।
না।
তুমি করবে?
না।
চকিতে চারদিকে দেখে বাবর চাপা গলায় হিস হিস করে উঠল, কথা শোন। আমি টেলিফোন করব। রাত ঠিক এগারটায়। বলেই সে লম্বা লম্বা পা ফেলে বসবার ঘরে এসে ঘোষণা করল, ভুলেই গিয়েছিলাম। এখুনি বাসায় যেতে হবে। একজন আসবে।
০৭. একজন আসবে বলেও
একজন আসবে বলেও তক্ষুণি বেরুন সম্ভব হয়নি। আরো কিছুক্ষণ বসতে হয়েছে। বসেছে সে। বারবার তার মনে হচ্ছিল বাবলি একবার এ ঘরে আসবে। এলে কী হবে তা সে জানে। না। কিন্তু প্ৰতীক্ষ্ণ করেছে উৎকৰ্ণ হয়ে প্রতিটি মুহূর্ত।
ঝুঁকির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার প্রবল একটা আকর্ষণ চিরকাল অনুভব করেছে বাবর। বিপদ তার স্বাভাবিক পরিবেশ। উদ্বেগ তার পরিচ্ছেদ। এই দুয়ের বিহনে সে অস্বস্তি বোধ করে, মনে হয় বিশ্বসংসার থেকে সে বিযুক্ত। তাই বেঁচে থাকার প্রয়োজনে, স্বাভাবিকতার প্রয়োজনে, সে অবিরাম সৃষ্টি করে বিপদ আর ঝুঁকি।
বাবলি এলো না।
সুলতানা বলল, আরেকদিন আসবেন।
আসব। তার জন্যে বিশেষ করে বলতে হবে না।
আচ্ছা, সবসময় টিভির মত কথা না বলে বুঝি আপনি পারেন না?
সুলতানার ঐ হঠাৎ মন্তব্যে মুহূর্তের জন্যে থমকে গেল বাবর। তারপর হেসে ফেলে বলল, দেশে যখন টিভি ছিল না তখনও আমি এমনি করেই কথা বলতাম। আচ্ছা, চলি।
বেরিয়ে এসে দেখল এগারটা বাজতে এখনো অনেক দেরি। বাবলিকে হঠাৎ এগারটা সময় দিতে গেল কেন? না, ভেবে চিন্তে দেয়নি। এমনিই বেরিয়ে গেছে মুখ থেকে। বোধহয় এগারটা শুনতে ভাল, বলতে গেলে জিহ্বার এক রকম তৃপ্তি হয়। এ-গা-র-টা। বাবলির স্তনের ঘ্রাণটা অস্পষ্টভাবে আবার নাকে এসে লাগল হঠাৎ। নিজের আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করল বাবর যে আঙুলে সে তার শরীর সন্ধান করেছিল আজ বিকেলে।
বাসায় ফিরে যাবে?
আজ বড় একা লাগছে বাবরের। আজ নয়, কাল থেকে একা লাগছে। কিন্তু কেন লাগছে। তা এখনও বুঝতে পারেনি।
ধুত্তোর ছাই। খেলারাম খেলে যা।
এক নিমেষে মনটা প্ৰফুল্ল হয়ে উঠল তার। ভিআইপি স্টোরে গাড়ি থামাল সে। কিছু জিনিসপত্র কেনা দরকার। ব্লেড ফুরিয়ে গেছে, শেভিং লোশনও তলানিতে এসে ঠেকেছে। আরো কী কী যেন ফুরিয়েছে চট করে মনে পড়ল না তার।
স্টোরে ঢুকে বলল, একটা টেলিফোন করতে পারি?
টেলিফোনে বাসায় খোঁজ নিল, কেউ এসেছিল কি-না। না, কেউ আসেনি। মান্নান জিগ্যেস করল রাতে খাবে কি-না? না, সে খাবে না। বাইরে খাবে। আবার জিজ্ঞেস করল কেউ আসেনি? কেউ ফোন করেনি? না। হ্যাঁ, না।
বিশেষ কারো কথা ভেবে বাবর জিজ্ঞেস করেছে কি? না, তা করেনি? ওটা তার স্বভাবের অন্তৰ্গত। তার কেবলই মনে হয়। কেউ যেন তাকে খুঁজছে। বাসা থেকে বেরুলেই মনে হয়। কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। তখন বাসায় ফেরবার জন্যে অস্থির হয়ে ওঠে। আবার বাসায় ফিরলে মনে হয় বাইরে, শহরে, কী যেন হয়ে যাচ্ছে যা সে জানতে পারছে না।
শো কেসে লাল সবুজ নীল রংয়ের মেলা। লোশন, সাবান, শ্যাম্পু, ক্রম, পাফ, কত কী! হ্যাঁ, শ্যাম্পূও দরকার। ওটা নিতে হবে। ব্লেড দিন দুপ্যাকেট, সাবানটা কী রকম? নতুন বেরিয়েছে? ভাল? দিন। বাহ, চাবির রিংটা তো সুন্দর। কত দাম? সাত টাকা? না, থাক। ওটা কী? মিনি লাইট? দেখি দেখি, কী রকম? সুন্দর প্যাস্টেল নীল রংয়ের এতটুকু একটা টর্চ। মুঠোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে এত ছোট। পকেটে রাখা যায় স্বচ্ছন্দে। দিন একটা। বাবর পছন্দ করল প্যাস্টেল গোলাপি রং। কয়েকবার নেড়েচেড়ে দেখল। লাইটটা সুন্দর। মনটা খুব খুশি হয়ে উঠল তার। আর, দুপ্যাকেট সিগারেট দিন। লাইফ ম্যাগাজিন এটাই নতুন এসেছে? দিন এক কপি। পনির দেবেন। হাফ পাউণ্ড। এক বোতল টমাটো কেচাপ। আর–আর কী? আর কিছু না।
প্যাকেটটা নিয়ে গাড়িতে বসল বাবর। বাসায় ফিরবে পৌনে এগারটায়। তারপর ঠিক এগারটায় ফোন করবে বাবলিকে। এখনো ঘণ্টা দুয়েক সময় আছে। বরং খাওয়াটা সেরে নেয়া যাক। কোথায় খাবে?
ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাবর এসে ঢুকল। বইয়ের দোকানে দেখল। চমৎকার সব নতুন বই এসেছে। বই দেখল কিছুক্ষণ। কিন্তু কিনল না। আজ বই কেনার মুড নেই তার। শুধু দেখতে ভাল লাগছে।
