অপ্রস্তুত হয়ে মা জড়সড় হয়ে বসলেন। আনুকে বললেন, আনু আর একটা গোশত দিই? আনু মাথা নাড়ল। কিন্তু নিল। অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন মামা! পরে গলা নামিয়ে বললেন, দাবি দাওয়া খুব বেশি। তাই সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি। ওখানে তোমার ভাবীকে দিয়ে কায়দা করতে হবে। তুমি নিশ্চিন্ত থেকো।
মা একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আল্লাহ্ এবার মুখ না তুললে আমার আর দিশা নেই ভাইজান।
তুলবে, বুবু তুলবে। আমি সামনের মাসেই তারিখ ফেলব, তুমি সাফ নিশ্চিন্ত থেকো। আনু, যাও তো পান নিয়ে এসো বাবা।
আনু ঢকঢক করে পানি খেল পুরো এক গেলাস। তারপর যেতে যেতে বারান্দার কাছে এসে চোখ ফিরিয়ে দেখল আর মামা ফিসফিস করে কি বলছেন। পান সে যতক্ষণ খুশি দের করে আনতে পারে, মামা রাগ করবেন না। আনু আর পান আনলো না। আনু গিয়ে রাতের রাস্তায় জোড়া সুপারি গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে রইল। তার পছন্দ হয়নি, এ কথা কাউকে বলা যাবে না। তার ইচ্ছে করছে বলতে, কিন্তু তাহলে বড় আপা হয়ত মুখটা আঁধার করে ফেলবে। আনু ফিরে এসে দেখল, বড় আপা শুয়ে রয়েছে। মাথার কাছে তোলা কাঁচের জগ আর পাতলা গেলাস চারটে। হয়ত ঘুমের মধ্যে হাত লেগে ভেঙে যাবে। মাথার কাছ থেকে একটা একটা করে সরিয়ে রাখল আনু।
পরদিন ভোরে মামা যাবার আগে বললেন, আনুর মা, তো আমার কি করলে?
এ প্রশ্নের জন্যেই যেন কাল থেকে বুক কাঁপছিল আনুর মার। তিনি চোরের মতো আনুকে একবার দেখলেন। আনু তখন পরম সাহসে তার ছিপ বার করে উঠোনে বসে বসে তেল খাওয়াচ্ছে। সে শুনতে পেল মা বলছে, আমার এ দুর্দিনে টাকা কোথায় ভাইজান? দারোগা সাহেবের বিপদের পর উপরে আল্লাহ্ জানে কী করে দিন যাচ্ছে এই ছেলেমেয়েদের নিয়ে।
খুব গম্ভীর হয়ে শুনলেন মামা! আনু ছিপটাকে ধনুকের মতো বাকিয়ে আবার ছেড়ে দিল। চমৎকার তার হয়েছে ছিপটা। পাঁচ সাত সের পর্যন্ত ভাঙবে না।
শেষ অবধি রাহা খরচ দিতে হলো মামাকে। মামা খুব অন্যমনস্ক হয়ে বাড়ি থেকে বেরোলেন। মার কথার ভালো করে জবাব দিলেন না। যাবার সময় আনুকে একবার বলেও গেলেন না। আনু আর ইস্টিশনে গেল না।
রান্নাঘরে পানি খাবার ছুতো করে এসে আনু দেখল মা সেখানেও নেই। ছাগলের বাচ্চাগুলো তরকারির খোসা চিবোচ্ছে। মা কুয়োতলায় বসে হাঁপাচ্ছেন আর গতরাতের সুরুয়া লাগা দস্তর খানা আছড়ে আছড়ে সাবানের ফেনায় সাফ করছেন। মার খুব কষ্ট হচ্ছে। মা তাকে। দেখে লজ্জা পেলেন যেন। কোনো রকমে থুপথাপ করে কাপড় রেখে হাত ধুতে ধুতে নিচু গলায় বললেন, বুলুদের হ্যাজাকটা দিয়ে আসবি?
.
পনেরো দিন ধরে মুখর হয়ে রইল বাড়ি বড় আপার বিয়ের গল্পে। মামা তো বলেই গেছেন, পছন্দ অপছন্দ তার হাতে, সামনের মাসে তারিখ দেখবেনই। মা আবার শেফালির বোঁটাগুলো রোদে বার করে শুকোচ্ছেন। বুলুর বাবাকে টাকা দিয়েছেন ঢাকা থেকে শাড়ি আনতে। বড় আপাকে দিয়ে একটা কাজও আর করিয়ে নেন না মা। একটা কিছু করতে। এলে হাত থেকে কেড়ে নেন। গাল পেড়ে সামনে যে মেয়েকে পান, বলেন, তোরা করিস কি? খালি আড্ডা আর খাওয়া। লেখাপড়া তো মাথায় উঠেছে।
বড় আপা এখন রোজ রাতে মুখে সর মাখে। সেদিন গুন গুন করে গানও গাইছিল। পরশুদিন নতুন স্যাণ্ডেল পরে আনুকে নিয়ে টাউন হলে থিয়েটার দেখতে গিয়েছিল। বাবাকে আনু বলে এসেছিল বিয়ের কথা। বাবা জিগ্যেস করেছিলেন, তোর পছন্দ হয়েছে আনু?
উত্তরে সে মাথা কাত করে জানিয়েছে– হ্যাঁ। বাবাকেও সে বলতে পারেনি। আনুর পছন্দ হয়নি। মা তাহলে খুব কষ্ট পাবে। বড় আপা আবার ঘরের সব কাজ করতে শুরু করবে। ময়লা কাপড় পরবে, গোসল করবে সেই বিকেল বেলায়, একদিনও বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার। জন্যে আর বলবে না আনুকে।
বড় আপা চলে যাবে! আনুর খুব খারাপ লাগে। বড় আপাকে আরেকদিন নিয়ে যাবে বকশীদের বাড়িতে। বকশীদের মেয়েগুলো একদিন আনুকে বলছিল, তোর দিদির নাকি বিয়ে? একদিন নিয়ে আসবি বেড়াতে?
আনু নিয়েই যেত। বড় আপা যেতে চায় না। হাসে আর বলে, ওদের নিয়ে যা। কিন্তু অন্য কোনো আপাকে নিয়ে বেড়াতে ভালো লাগে না আনুর। তার উৎসাহে যেন পানি পড়ে।
.
আয়নার মতো নিজেকে দেখা যাচ্ছে নদী থেকে একটু দূরে খালের পানিতে। আনু ছিপ হাতে নিয়ে ভাবে, বেলে মাছ পেলে বড় আপা খুব খুশি হতো। বেলে মাছ কী মিষ্টি, নারে? বড় আপা বলবে আর খাবে।
ইস ইস। ছিপ ধরে প্রচণ্ড টান দেয় আনু। কয়েকটা পচা পানা এসে ঠেকেছে। একটা দোলা দিয়ে বড়শিটাকে বাঁ হাত দিয়ে কাছে আনে, তারপর পানা ছাড়িয়ে নতুন একটা পোনামাছ গেথে টুপ করে আবার পানিতে ফেলে দেয়। ভাসতে ভাসতে ফানাটা স্থির হয়ে আসে। আনু আস্তে আস্তে তখন কাঁধ নামিয়ে দুহাঁটুর মাঝখানে ছিপটা রেখে বসে। ঝোঁপের মধ্যে কোথাও একটা পাখি ডাকতে থাকে তা টুক টুক, তা টুক টুক।
বাবাকে বললেও হতো। বাবাকে বললে, বাবা খুব শক্ত চিঠি লিখে দিতেন মাকে। মিনু আপাটা পড়ে না কেন? আমি বলতে যাবো। আমি বললেও পারতাম বাবাকে। বাবা আমাকে বললেন, তোর মামা টাকা চেয়েছিল নাকি রে? আমি তখন মাথা নেড়ে চোখে মুখে বললাম, না, না। মা যদি মামাকে টাকা দিত, কি বলতাম বাবাকে? আমার একটুও পছন্দ হয়নি। বাবাকে বললেও হতো। বললে, চিঠি লিখে দিতেন। বাবাকে বললাম না কেন?
