কোল থেকে খরখর করে নেমে যাচ্ছিল ছিপটা। দুহাতে আঁকড়ে ধরে পড়ি পড়ি করে উঠে দাঁড়াল আনু। দুতিন পা এগিয়ে একেবারে পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে আড় করে একবার টানলো। স্রোতের উলটো দিকে টানছে। কি? আবার একটু ডানদিকে ফেরালো ছিপটা। ছিপ এলো, বড়শি রয়ে গেছে সেখানেই। মাছটা নড়ছে না। চুপ করে দম নিচ্ছে বুঝি। বড় কই হবে। কই না। কই হলে গোঁত্তা মারত হঠাৎ। একবার ডানে, একবার বামে কয়েকবার দুলিয়ে হু–উ–স করে ডাঙায় তুলে ফেলল ছিল্। সংগে সংগে গোড়ালির ওপর ঘুরে আকাশ পানে হা করে তাকিয়ে দুলতে দুলতে আনু দেখে রূপোর করনির মতো ফলি মাছটা দাপাচ্ছে, ভাজ হচ্ছে আবার সোজা হচ্ছে। পিঠের ওপর আটকেছে বড়শি। খানিকটা ছাল শুধু ধূসর মাংস ছিলে উলটে গেছে। খুব লেগেছে মাছটার। বড়শিটা গিললে কষ্টই পেতি না। নিচে দিয়ে। যাচ্ছিলি কেন? খুব সাবধানে খুলে আনে আনু। নিচে দিয়ে যাবার সময় বাঁকা হয়ে জোরে ভেসে উঠেছিল, তখন গেঁথেছে।
পেট থেকে আতুরি বার করে ছুরিটা পকেটে রাখে আনু। তারপর একটা গর্ত বানায়, গর্তটা আপনা আপনি ভরে ওঠে পানিতে। কতগুলো ঘাস ছিঁড়ে বিছিয়ে মাছটাকে সেখানে রাখে আনু। একটা বড় নৌকা নদী থেকে তাঁদের মধ্যে ঢোকে—- পলাশ বাড়ির হাট আছে। কালকে। আরো কয়েকটা নৌকা গেছে।
একটা বেলে পেলে হতো। ছোট্ট, এই আধ হাত মতো হলেও হয়। বেলে কেউ পছন্দ করে না। কেবল সে আর বড় আপা। আবার ছিপ ফেলে আনু। বাবাকে বললেও পারতাম। বাবাকে বললাম না কেন?
বুলু ভাইকে বললেও হতো। বুলু ভাইকে বললাম, আসতে, এলো না। সালু আপার সংগে ক্যারম খেলছে দুপুর থেকে। মা ঘুমিয়ে কি, নইলে দিত এক বকুনি। দিতাম যদি মাকে ডেকে।
অনেকক্ষণ কিছু ওঠে না। ছিপ উঠিয়ে আনে আনু। টোপ বদলায় অনেকক্ষণ ধরে। একটা তাজা পোনা লাগায়। লাগিয়ে আবার ফেলে। ফেলে চুপচাপ বসে থাকে। নৌকাটা এখন আর দেখা যাচ্ছে না।
মামাকে যদি টাকা দিতেন মা? ইস্, দেবে কী আমি তাহলে বাবাকে বলে দিতাম। মা একটা বোকা। মা খুব বোকা। মা কিস্সু বোঝে না। বাবাকে বললাম না কেন? আমি একটা বোকা। আমি খুব বোকা। আমি বোকা। শুনলে, বাবা রাগ করবেন। বাবাকে বললাম না কেন?
আস্তে আস্তে বেলা পড়তে থাকে। পেছনে বাজপড়া তাল গাছটায় কাক বসে আছে। কা কা করছে। একটা ঢিল ছুঁড়তে গিয়ে ছিপ নড়ে গেল। যাকগে। আমি খুব বোকা। কাকটা উড়ে গেল।
বাবাকে বলব। আবার যখন দেখতে যাবো বাবাকে, বলব। বলব, আমার পছন্দ হয়নি। বলব, মামা টাকা চেয়েছিল। আমি খুব চেঁচামেচি করেছিলাম কিনা, তাই মা টাকা দেয়নি। আমি অমন না করলে, দিত টাকা মামাকে। মামা সব টাকা নিয়ে যেত। বাবাকে বলব। আমি ভারী বোকা। বাবাকে সব বলব। আবার যখন দেখা করতে যাবো, প্রথমেই বলব।
ছিপ তুলে আনে আনু। পশ্চিম দিকে আকাশ লাল হয়ে এসেছে। মা এতক্ষণে উঠোন ঝাড় দিয়ে ওজু করতে বসেছেন। ছোট আপারা বেণী করছে বারান্দায় বসে বসে। বড় আপার জন্যে বেলে মাছ একটা পেলে হতো। বেলে মাছের জন্যে কাল পুলের নিচে যাবে আনু। সেখানে একবার দশটা পেয়েছিল আনু। পকেট থেকে সুতা বের করে ফলি মাছটার ঠোঁটে গেঁথে হাতে ঝুলিয়ে নিল সে। আরেক হাতে কাঁধের পরে ফেলল ছিপটাকে। খালের পানি সুন্দর কুলকুল করছে। যেন যেতে দিতে চায় না। আজ রেল লাইন ধরে ধরে বাসায় যাবে আনু। হোক সন্ধ্যে মা বকুক। মা কি জানে? মা কিসসু জানে না। মা একটা বোকা। মা খুব বোকা। মা যদি বোকা না হতো, আনু একটুও দুঃখ পেত না।
আনু বাসার উঠোনে এসে দাঁড়ায়। ছিপটাকে বারান্দায় রাখে ঠেস দিয়ে। মা নামাজ পড়ছেন। মাছটা দেয় সেজ আপার হাতে। ওরা অবাক হয় এতবড় মাছ দেখে। আনু একটুও হয় না। আনু হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসে। নামাজ থেকে উঠে এসে মাছ দেখে মা তাকে বকুক না। সে মন খারাপ করবে না, শুয়ে পড়বে না, ইস্টিশনে যাবে না, রাস্তায় গিয়ে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকবে না। আনু এখন পড়বে। আনু পড়তে শুরু করে। আনু বই নিয়ে পড়তে ব্রু করে। আনু ইংরেজি বই থেকে দাগানো শব্দগুলোর মানে মুখস্থ করে মনে মনে। ছমাস। থেকে কিসসু পড়া হয়নি।
যেন আজ নিজেও জানে, আনু বড় হয়ে গেছে।
১০. গীর্জার পুকুরটা ঘন গাছপালায় ঘেরা
গীর্জার পুকুরটা ঘন গাছপালায় ঘেরা–ঢাকা, নির্জন, কেমন গা ছমছম করে, দুপুর বেলাতেও সন্ধ্যের মতো মনে হয়। মনে হয়, এক্ষুণি রাত হয়ে যাবে। কিন্তু ভয় করে না আনুর। ভাঙা ঘাটে শেষ ধাপে বসে ছিপটা ফেলে তাকিয়ে থাকে সবুজ পানির দিকে। এখানে এর আগে কোনদিন আসেনি সে। সেদিন বুলু ভাইদের বাড়িতে রাজমিস্ত্রীর কাজ হচ্ছিল, মিস্ত্রী বলেছে গীর্জার পুকুরের কথা।
রাস্তা থেকে প্রথমে চোখে পড়ে বড় আটচালা লম্বা টিনের ঘরটা। এর একদিকে লাইব্রেরী, বিনি পয়সায় ছোট ছোট বই দেয় পাদ্রীরা, আবার যতক্ষণ খুশি বসে বসে পড়ো ম্যাগাজিন, খবরের কাগজ, কেউ কিছু বলবে না। লাইব্রেরীর পাশে গীর্জা–ঘর। এই ঘরটার দক্ষিণে তিনটে টিনের বড় বড় ঘর। এখানে স্কুল। মাদার সর্বজয়া গার্লস স্কুল। মিশন থেকে স্কুলটা করে দিয়েছে। স্কুলের পেছনে থাকেন হেড মিসট্রেস জিনি সিসটার। পুরো নামটা শোনেনি আনু। এ নামেই সারা শহরে সবাই চেনে। সকাল বেলায় মেয়েরা দল বেঁধে হেঁটে হেঁটে স্কুলে আসে। মিনু আপা সালু আপা পড়ত এই স্কুলে। বাসা বদলের পর সেই যে কদিন কামাই দিল, আর যায় না ওরা। কেউ আর যেতে বলে না ওদের। বাসায় যখন ইচ্ছে হয়, বই নিয়ে বসে।
