তারপর গলা খাকারি দিয়ে মা যন রান্নাঘরে। সেখানে রান্নার জোগাড় করছে আপারা। আজ মেহমান বাড়িতে। মা মুরগির খাঁচা থেকে সেই দশটার সময় দুটো বের করে জবেহ্ করেছেন। পালক ছাড়ানো, দেখতে দুটো কেবল–হওয়া বাচ্চার মতো, শুয়ে আছে গামলায় গরম পানিতে। গরম মশলার খোশবু ছড়িয়েছে। মামা উবু হয়ে বসতেই মা একটা পিড়ি টেনে দিলেন, মাথায় ঘোমটা টানলেন! মামা বললেন, তোমরা একটু যাও।
আপারা উঠে যেতেই অনুচ্চ কণ্ঠে মামা হাত নেড়ে নেড়ে কী বলতে লাগলেন মাকে। আনু বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। একবার ভাবল, কাছে যায়। আবার সংকোচ হলো। বাবা বলেছেন আনুকে পছন্দ করতে। আনু তখন পায়ে পায়ে বাইরের ঘরের দিকে আসে। কিন্তু তার আগেই সেজ আপা, নে আপা, ছোট আপা, সালু আপা, মিনু আপা বেড়ার ফাঁক দিয়ে দিয়ে উঁকি মেরে দেখছে। নিজেরা ঠেলাঠেলি করছে। মিনু আপা হাসতে গেছে তার মুখ চেপে ধরলো মেজ আপা।
শোবার ঘরে এসে দেখে খাটো করে রাখা হারিকেন। বড় আপা নামাজের চৌকিতে এক কোণে চুপ করে বসে আছে। তার দুহাত কোলের ওপর, যেন এখুনি উঠে যাবে। উলি না। আনুকে দেখে ম্লান হাসলো বড় আপা। বড় আপা কখনো হাসে না। হাসলে এত সুন্দর লাগে, মনে হয় নতুন মানুষ, ও যেন আনুর বড় আপাই না, অন্য কেউ, একেবারে ছবি।
বড় আপা নিঃশব্দে অনেকক্ষণ হাসে। তখন আনু একটা কথাও না বলে তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। একটা হাত টেনে নিল মুখের ওপর। সুন্দর চেনা চেনা গন্ধ। আনু টের পায়, বড় আপা আজ লুকিয়ে মুখে সর মেখেছে। হাতের ভেতরটা ভারী মিষ্টি হয়ে আছে তার।
পরদিন বড় আপাকে দেখল ওরা।
চশমা পরা লোকটা হচ্ছে পাত্র। আনুর খুব অস্বস্তি লাগে। বুলুর বাবা বড় আপাকে নিয়ে এসে তার মুখোমুখি বসলেন। আনু বসল তার আরেক পাশে। ভেতর থেকে এ বাড়ি ও বাড়ির সবাই তাকিয়ে রইল। সবাই মিলে আজ বড় আপাকে সাজিয়েছে। মার গয়নাগুলো পরিয়েছে। তোলা নীল শাড়িটা থেকে চামেলী আতরের গন্ধ দিচ্ছে। হাতের নখে ঠিকরে পড়ছে হ্যাঁজাকের আলো। বুলুর বাবা তার দোকান থেকে একদিনের জন্যে ধার দিয়েছেন। হ্যাঁজাকটা। শুম শুম করছে তার তেল পোড়ার শব্দ। বড় আপাকে জমিদারের বউযের মতো লাগছে। বুকের মধ্যে দুপদুপ করছে আনুর।
মামাই কথা পাড়লেন—- মেয়ে দেখতে হবে না কাশেম মিয়া। আমার ভাগনী বলে নয়, এরকম মেয়ে দুচার জেলায় হয় না। রান্না, সেলাই, নামাজ–রোজা, আদব–তমি সব কিছুতেই বরাবর কাবেল। ম্যাট্রিক পাশ করেছিল সেকেণ্ড ডিভিশনে। এতদিন আমরা বিয়েশাদির কথা—- বড় মেয়ে খান্দানি পাত্র শিক্ষিত নওশা তো আর হাতের তুড়িতে আসে না।
বলেই মামা অন্দরে চোখ ঠারলেন। শেষে বললেন, সওয়াল করুন, নাশতা–পানি জুড়িয়ে যাচ্ছে। কই আক্কাস কথা কও না?
আক্কাস অর্থাৎ সিগারেট সর্বক্ষণ যার হাতে হেঁ হেঁ করে হাসল। তারপর কোল বালিশ টেনে। গলা সাফ করে জিগ্যেস করল, আপনার নাম?
ফাতেমা খাতুন।
বড় আপা একটুও ভয় পায়নি। গলা একটুও কাপল না। কেবল কেমন যেন লজ্জা জড়ানো—- তাও ভালো করে ঠাহর হয় না। বড় আপাকে এই নিয়ে আট নজন দেখে গেল। একবার এসেছিল একজন, তাকে খুব পছন্দ হয়েছিল আনুর। রায়বাজারে এক ছোট দারোগা ছিল, মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে শীস দিত আর হাঁটত বিকেল বেলায়, চিনিচম্পা কলা খেতে খুব ভালোবাসত, ঠিক তার মতো দেখতে। সকালের গাড়িতে এসে রাতের গাড়িতেই চলে গিয়েছিলেন। যাবার সময় আনু সংগে সংগে ইস্টিশান পর্যন্ত গেছে। অন্ধকারে হঠাৎ তাকে দেখে লোকটা ভারী লজ্জা পেয়েছিল, তার সংগে কথা বলতে ভারী ইচ্ছে করছে লোকটার। সেও ঘুর ঘুর করছে। কিন্তু কথা হয়নি। লোকটা গিয়ে আর কোনো খবর দেয় নি।
জিগ্যেসবাদ চলল অনেকক্ষণ ধরে। মামা বাইরে গেলেন, বুলুর বাবা বাইরে গেলেন, পাত্র কথা বলল বড় আপার সংগে। আনু বসে রইল সারাক্ষণ। বুলুর বাবা বাইরে গেলে বড় আপা যেন খুব ভয় পেল। ভাল করে কথা বলতে পারল না। নিঃশ্বাস যেন গলার মধ্যে আটকে রইলো। আবার যখন ওরা ফিরে এলেন, বড় আপা নড়ে চড়ে বসলো। বড় আপাকে নিয়ে ভিতরে এলো আনু। বারান্দায় বুলু খাবার সাজাচ্ছে খানচায়। মা, মেজ আপা, বুলুর মা তুলে তুলে দিচ্ছেন।
আনুর পছন্দ হয়নি। কিন্তু বলতে পারল না কাউকে। বড় আপা শোবার ঘরে গেল। তাকে সংগে যেতে হলো। বড় আপা তার আঙুল ধরে আছে শক্ত করে। ঘরে যেতেই সালু আপা, মিনু আপা, ছোট আপা, সেজ আপা ঘিরে ধরল। সবার চোখ মুখ দিয়ে খুশি লাফিয়ে পড়ছে। গা টিপছে, হাসছে, ঢলে ঢলে পড়ছে। এমনকি বড় আপাকেও খুব খুশি লাগছে, কিন্তু দেখাচ্ছে না। আনু বলতে পারল না কাউকে। আনু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল জানালার শিক ধরে, এক পা ভাঁজ করে আরেক পায়ে ঠেকিয়ে। অনেকক্ষণ বসে থেকে তার পা ধরে গেছে। বড় আপাকে বললে যেন এখুনি ডাকবাংলা, নদীর পাড়, চৌধুরীদের দালান, দুতিন মাইল বেড়িয়ে আসতে পারবে।
রান্নাঘরে আনুকে খেতে দিয়েছিলেন মা। মামা চটি চটপট করতে করতে এসে একটা মোড়া টেনে বসলেন। উদ্বিগ্ন হয়ে মা জিগ্যেস করলেন, কি বলল ছেলে?
কি বলবে। সব আমার হাতে। পাকা কাজ না হলে আমি হাতই দিই না। তোমরা দুতিন গণ্ডা পাত্র দেখলে, খালি মুরগি পোলাও ধ্বংস।
