.
আজ মাছ ধরতে যাবে আনু। দুপুরে সকাল সকাল খেয়ে চুপ করে বেরিয়ে পড়ল। হাফিজ মিয়ার পুকুরে যেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু যাওয়া যাবে না। হাফিজ মিয়া নিজেই কাল থেকে ছিপ ফেলছেন। পকেটে তবু মেথি দিয়ে তৈরি বড় মাছের টোপ বানানো আছে। কাল রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে মেজ আপা আর সে বানিয়েছে। মেজ আপার খুব সখ এদিকে। বাবার সাইকেলটা নিয়ে উঠোনেই সে পাক খায়। চড়তে শিখেছিল কমলগঞ্জে থাকতে। মা বলেন, গেছো মেয়ে। আনুর খুব ভালো লাগে; বুলুর বাবার দোকানে একটা ছবি ঝোলানো আছে, অনেক কটা মেমসাহেব সাইকেল চালিয়ে একসংগে সবাই ডানহাত তুলে হাসতে হাসতে যাচ্ছে।
পথে পিয়ন একটা চিঠি দিল আনুকে। পথে এরকম দেখা গেলে সে আর বাসায় যাবার কষ্ট করে না। বেঁচে যায় যেন, খুব খুশি হয়। আনু ছিপটা মাটিতে ঠেকিয়ে পোস্ট কার্ডটা তক্ষুণি পড়তে শুরু করে। পড়ে দপ করে আগুন জ্বলে ওঠে মাথায়। কিন্তু সেটা টের পায় না আজ। ছিপ তুলে খুব তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে আসে।
এসে দেখে মা জলচৌকিতে শুয়ে আছেন। তাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে তোলে আনু। বলে, মামা চিঠি লিখেছে মা।
ধড়মড় করে মা উঠে বসেন। বলেন, কই? কখন?
মা পড়তে বলার আগেই আনু পড়তে শুরু করে দেয় দোয়া বহুত বহুত পর সমাচার এই যে, আয়ুস্মান আনুর হস্তাক্ষরে একখানি পত্র পাইয়া তোমার যাবৎ বিষয় অবগত হইলাম। রেল কোম্পানি নগদ পাঁচ হাজার টাকা দিয়াছে ইহা একরূপ ঠকাইয়াছে বলিয়া আমার ধারণা। পানুর এন্তেকালে এ সংসারের যাহা ক্ষতি হইল তাহা লক্ষ টাকাতেও শোধ হইবার নহে। যাহা হউক, আল্লাহর নিকট শোকর গোজারি করিলাম যে, অন্তত কিঞ্চিত কিনারা হইয়াছে। তোমার প্রথমা কন্যার বিবাহের জন্য ভাবনা করিও না। আমি নিজ দায়িত্ব তাহা সম্পন্ন করিব। অত্র মহাকুমা সদরে একজন বি,এ, ফেল শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত বংশীয় পাত্রের সন্ধান। আছে। আমি দুই চারি দিনের মধ্যেই তাহাকে ও তাঁহার দুই একজন খাস্ দোস্ত সমভিব্যহারে তোমার বাটিতে পহুছিব। পছন্দ হইলে শুভকার্য এই যাত্রাতেই সম্পন্ন করা যাইবে। আর বিশেষ কি লিখিব? এদিকে আরেক সুযোগ হাত ছাড়া হইতেছে। বিলাতের মাতা তাহার নিষ্কর জমির তিন বিঘা মাত্র দুইশত পঁচিশ টাকা প্রতি বিঘা দরে বিক্রয় করিতে ইচ্ছুক। আমার হাত বর্তমানে কপর্দক শুন্য। যদি সাত শত টাকা ঋণ দিতে পারো তো প্রথম বর্ষের শস্য হইতেই শোধ করিতে পারিতাম। আমি তাহাকে বহু বুঝাইয়া রাখিলাম। তুমি অর্থের জোগাড় রাখিও। শ্ৰেণীমত আমার দোয়া পৌঁছাইয়া দিও।
চিঠি পড়া শেষ হতেই মা বলেন, তাহলে তো বাড়িঘর দোর ঠিক করতে হয় আনু।
আনু সেদিকে কান না দিয়ে চেঁচিয়ে বলল, টাকা দেবে নাকি তুমি মামাকে?
মা অবাক হয়ে তাকান। আনু আবার বলল, বলো, তুমি দেবে নাকি?
তুই চেঁচাচ্ছিস কেন আনু?
হাত ধরে তাকে চৌকিতে বসাতে চেষ্টা করেন মা। কিন্তু আনু শক্ত করে চিঠিটা ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। বলে, তুমি টাকা দিতে পারবে না।
তার গলার স্বর শুনে আপারা এসে ঘিরে দাঁড়ায়। বড় আপা জিগ্যেস করে, কার চিঠিরে আনু?
সবার দিকে তাকিয়ে মার চেহারাটা যেন হঠাৎ বদলে যায়। দেখতে পায় আনু, যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। আনু যেন ছোট হয়ে যায়। মনে হয়, ভীষণ একটা অন্যায় করে ফেলেছে সে। মা বলেন, এত যে চেঁচাস একা মামা ছাড়া তোদের আছে কে? বাপ তো জেলে, তাকে এসব দেখতেও হয় না, শুনতেও হয় না। গুষ্টি মরলে দুনিয়ায় শান্তি হতো।
চোরের মতো বেরিয়ে আসে আনু, ছিপটা লাথি মেরে সরিয়ে দেয়। ছিপটা বাইরের ছোট্ট ঘরে আড় হয়ে পড়ে ছিল। পথে এসে প্যান্টের পকেটে হাত দিতেই টোপের কৌটা ঠেকল। সেটা খুলে সব ফেলে দিল কচুবনের মধ্যে। বুলুদের বাসায় কলের গান বাজছে। সবাই যদি এক সংগে আজ মরে যেতে পারত তো মা টের পেতেন মজা। বড় আপার ওপর খুব রাগ হলো তার মাকে কিছু বলল না দেখে। অন্য দিন বকলে খুব এসে পেছনে ডাকে, আড়ালে। নিয়ে যায়। আজ সে চলে এলো, কেউ চোখ তুলে দেখলও না। বুক পকেটে পোস্টকার্ডখানা উঁকি দিচ্ছে। ভাজ করে রাখল আনু। তারপর ইস্টিশনে গিয়ে বসলো। বেলা চারটের গাড়ি এসেছে, ইঞ্জিন ব্যাক করছে, পানি নেবে একটু পরে। উলিপুর চিলমারীর বাস এসে পৌঁছুলো। লোকগুলো দৌড়ে দৌড়ে সব টিকেট ঘরের কাছে যাচ্ছে। বুলবুল চানাচুর বিক্রি করছে, বস্তা একআনা, লালমণিরহাট থেকে ভেজে আনে। ভারী চমৎকার। আনু একটা কিনল।
০৯. তিনদিন পরে রাত আটটার গাড়িতে
তিনদিন পরে রাত আটটার গাড়িতে মামা এলেন। সংগে আরো দুজন। দুজনেই প্যান্ট বুশ শার্ট পরা, একজনের হাতে সব সময় সিগারেট, আরেক জনের চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা। দুজনে নিজেরা নিজেরা কি বলে আর হাসে। তার মধ্যে চশমা পরা লোকটা কম হাসে। সিগারেটওয়ালা প্রায় কাতুকুতু দেয়ার মতো করে আনুকে বগলে বগলে টানে আর খালি জিগ্যেস করে তোমার কবোন? কোন বোন বেশি আদর করে? কে ভালো গান গায়? কার চুল লম্বা? একটারও জবাব দিতে পারে না আনু। ভীষণ লজ্জা করে তাব। লোকটার গায়ে মাখনো সেন্ট, তার গন্ধে মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে আনুর। লোকটা নতুন সিগারেট ধরানোর জন্যে হাত ছাড়তেই আনু প্রায় ছুটে পালায়।
মামা আড়ালে ডেকে ধমকান, বেয়াদব ছেলে! মেহমানদের কথার জবাব না দিয়ে উঠে আসে! দারোগার ব্যাটা আর শিখবে কত!
