মা খুব দ্বিধা করে আদর নিয়ে বলেন, একটা চিঠি লিখৰি আনু? আয়, আমি পোস্টকার্ড কলম বার করে রেখেছি।
আনু তখন উঠে দাঁড়ায়। যেন পড়ার টেবিলে যাবে লিখতে। তারপরই মনে হয় টেবিল তো এ বাড়িতে আনা হয়নি। ঘুমিয়ে গিয়েছিল আনু, সব ভুলে গিয়েছিল আনু।
কলম টলম নিয়ে এসে মা বসলেন চৌকির এক কোণে। মাঝখানে লণ্ঠন রেখে মনোযোগ দিয়ে ছোটবড় করে আলো ঠিক করলেন মা। পোস্টকার্ডটা তেলতেলে হয়ে গেছে। কলম নিয়ে আনু ওপরে সুন্দর করে লিখল, গড ইজ গুড়। তারপর জিগ্যেস করল, কার কাছে লিখবো মা?
তোর মামার কাছে।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল আনু পোস্টকার্ডের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু মা কিছুই বললেন না। যখন চোখ তুলে তাকাল দেখল মা খুব ভাবছেন। মা তাকে মাথা তুলতে দেখে একটু থতমত খেলেন যেন। তারপর পরামর্শ করার গলায় বললেন, টাকা যখন পাওয়াই গেল আনু এবার। তোর বড় আপাকে বিয়ে দিতে হয়। কত বড় হয়ে গেল। লোকে কত কী বলে, আরো বলবে এখন। তার মামাকে ডেকে আনি, কি বলিস? তুই বড় হলে আমার দুঃখ ছিল না।
মার চোখ যেন পানিতে চিকচিক করতে থাকে। আনু দেখতে চায় না। আনু চোখ নামায় আবার। মা বলেন, লেখ, পাকজোনাবেষু, আমার শত কোটি ভক্তিপূর্ণ সালাম জানিবেন ও ভাবীজানকে দিবেন।
.
সোমবারে রংপুরে গেল আনু বাবাকে দেখতে। বুলুর বাবার কাজ ছিল রংপুরে! তার সংগে গেল আনু। মা পিঠে বানিয়ে দিয়েছেন বাবার জন্যে। ছোট্ট টিফিনকারিতে ভরে সারাক্ষণ কোলে কোলে রেখে সকাল দশটার গাড়িতে চেপে বেলা দেড়টায় রংপুরে পৌঁছলো আনু। এর আগে আরো কয়েকবার এসেছিল। মাও এসছিলেন তিনবার। বড় আপা, সেজ আপা, মেজ আপাও তিনবার। সালু আপা দুবার। মিনু আপা প্রায় প্রত্যেকবার যতবার আনু এসেছে। মিনু আপা আজ আসেনি, ওর পরীক্ষা। আনু রোজ মাসে দুবার। আনু যখন জেলগেটে এলো তখন চারটেও বাজেনি। পথে খুব শস্তা বাঁধাকপি দেখে কিনেছিল একটা। মা দেখলে খুশি হবেন। মার মুখটা মনে করে ভালো লাগলো আনুর।
কত লোক এসেছে দেখা করতে। দুটো বউ এসেছে গরুর গাড়ি করে। তাদের সংগের লোকটা উবু হয়ে বসে আর তিনজনের সংগে পরামর্শ করছে। এককোণে চার পয়সার। কবিতা সুর করে করে পড়ছে আর বিক্রি করছে দুজন চোঙা লাগিয়ে। একজন পড়ছে, একজন থেমে যাচ্ছে, আবার সে পড়ছে, আগের জন দম নিচ্ছে। আর এক হাতে কপি, আরেক হাতে টিফিনকারি। মেলা লোক ভিড় করে পাঠ শুনছে। হাতখালি থাকলে আনুও গিয়ে শুনতো। চারটে বাজতে এখনো অনেক দেরি।
তারপর লাইনে গিয়ে দাঁড়াল আনু। এগুলো সব তার এখন মুখস্থ হয়ে গেছে। অফিসের এককোণে ছোটবাবুর টেবিলের কোণায় জিম্মা রাখলো কপিটা। টিফিনকারিটা দেখে দিল ওরা। ডাক পড়ল আনুর।
রোজকার মতো, বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন আনুকে। আনুর এটা অভ্যেস হয়ে গেছে। আনু বলল, পানু ভাইয়ের পাঁচ হাজার টাকা এসেছে। শুনে চমক ভাঙলো বাবার। বললেন, টাকা কোথায় রেখেছে তোর মা?
পোস্টাফিসে। মা বললেন, বড় আপার বিয়ে দেবে।
কোথায়?
জানি না। আমাকে বলেনি।
বাবা একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। চারিদিকে খুব হৈচৈ হচ্ছে। সবাই দেখা করছে। নিঃশ্বাসটা তাই শুনতে পেল না আনু।
পানুটা থাকলেও ভাবনা ছিল না। তুই নিজে পছন্দ করিস আনু। তোর পছন্দ না হলে না করে দিস।
আনুর কেমন লজ্জা করতে থাকে। আবার খুশিও লাগে। বলে, আমার কথা মা শুনবে?
শুনবে। আমি চিঠি লিখে দেব। আর শোন, তোর মামাকে ডাকিস না।
নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে আনু। বাবা বলে চলেন, তোর মামা তোক ভালো না। নিজের ভালো দেখবে, তোদের কিছু হোক না হোক তাকাবেও না। পানুর টাকার কথা ওকে জানিয়ে কাজ নেই। তোর মায়ের সৎ–ভাই হাজার হলেও।
কিন্তু সেদিনই রাতে আনু মামার কাছে টাকার কথা লিখেছে মার জবানিতে। বাবাকে বলতে সাহস হয় না। পায়ের নখ দিয়ে মেঝে খুঁড়তে থাকে। বাবা তখন তার মাথায় হাত রেখে চুলের জট ছাড়াতে থাকেন। জিগ্যেস করেন, রংপুর এসে কিছু খাসনি?
আনু মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে।
কী খেয়েছিস?
আনু জবাব দিতে পারে না। বাবা আরো হাত বুলোতে থাকেন। খামকা আনু বলে, মিনু আপার পরীক্ষা। একটুও পড়ে না।
আচ্ছা আমি লিখে দেব। পড়বে না কেন? না পড়লে কেউ বড় হতে পারে? অনেক পড়বে, পড়তে পড়তে স্কুল পাশ করবে, কলেজে যাবে, কলেজ থেকে ইউনিভার্সিটি তারপর বিলেত। বিলেত থেকে ফিরে এসে রিসার্চ করবে, ডক্টরেট নেবে। লোকে কত ভালো বলবে। সালাম দেবে। বিদ্বানের কত সম্মান, কত প্রতিপত্তি। রাজা পর্যন্ত বিদ্বানের কাছে মাথা নত করে।
বলতে বলতে বাবার মুখচোখ দিয়ে আলো ঝরতে থাকে। যেন সুদূর দেখছেন তিনি। আনুর মাথায় হাতটাও কখন থেমে যায়। আনু টের পায়, বাবার গলা ধরে এসেছে। তার নিজেরও কেমন ছমছম করতে থাকে বুকের ভেতর। ঠিক তখন ঘণ্টা পড়ে। ঢং ঢং করে বুড়ো সেপাই ঘণ্টা বাজায়। বটগাছটা থেকে কাকগুলো হঠাৎ উড়ে গিয়ে আবার একে একে বসতে থাকে। আনু বেরিয়ে আসে। এসে বঁধাকপিটা নেয়। খালি টিফিনকারি পায়ের সঙ্গে লেগে লেগে ঢ ঢন করতে থাকে। নবাবগঞ্জে এসে গ্রামোফন–ডিলার দাশ–কোম্পানির বেঞ্চিতে জিরোয় আনু। সন্ধ্যের সময় বুলুর বাবা এখান থেকে এসে তাকে নিয়ে যাবেন। বসে বসে গান শুনতে থাকে আনু। সেজ আপা গান শিখলে গলাটা এমনি মিষ্টি হতো। লোকে কত রেকর্ড কিনে নিয়ে যেত সেজ আপার। দাশ কোম্পানির আলমিরার মাথায় বাঁধানো থাকত সেজ আপার ছবি সবার সঙ্গে।
