বুলুকে সংগে করে আনু পোস্ট অফিসে এলে। মাথার ওপরে বড় বড় করে লেখা পোস্ট ও টেলিগ্রাম অফিস। পানু ভাই যখন মরে গেল তখন টেলিগ্রাম এসেছিল একটা।
পোস্টমাস্টার বললেন, রেলকোম্পানি তোমার বাবাকে টাকা পাঠিয়েছে পানুর ক্ষতিপূরণ হিসেবে। কে নেবে টাকা? তোমার বাবা তো জেলে। তোমার মাকে নিতে হলে দরখাস্ত করতে হবে সাতদিনের মধ্যে। নইলে টাকা ফেরৎ যাবে।
বেরিয়ে এসে বুলু বলল, কী তুই। বুঝতে পারলি না? তোর ভাই ডিউটিতে মারা গেছে কিনা, তাই টাকা দিচ্ছে।
তবু আনু বুঝতে পারে না। ভাবে রেলের লোকজন খুব লজ্জা পেয়ে গেছে তার ভাই মরে যাওয়াতে, তাই টাকা দিয়ে ভাব করতে চাইছে। দরকার নেই তার টাকার। নেবে না সে টাকা। টাকা দিয়ে কী হবে?
বাবার খুব টাকার দরকার ছিল না। আনু যেন স্পষ্ট শুনতে পায়, একদিন মা রাতে খাওয়া দাওয়ার পর সব ভাইবোনকে নিয়ে দুধের গল্প করছিলেন। বাবার খুব টাকার দরকার ছিল? চিন্তায় চিন্তায় মাথা ঠিক ছিল না বাবার। বড় আপা, সেজ আপা, ছোট আপা সবগুলোকে বিয়ে দিতে হবে। তাই বাবা ঘুস নিয়েছিল। শুনে মুখ কাচুমাচু করেছিল আপারা। তাদের দেখাদেখি সালু আপা, মিনু আপাও—-ওরা বড় নয় তবু বাবা বলতেন, আনুকে বোর্ডিংয়ে রেখে পড়াবেন। তার দারোগার চাকুরি খালি বদলি আর বদলি। বোধ হয় আনুর বোর্ডিংয়ের। জন্যেও মেলা টাকা দরকার ছিল বাবার। মুখ ছোট করে আনুও মাথা নামিয়ে নিয়েছিল।
বাসার কাছাকাছি এসে গিয়েছিল এরা। দেখা যাচ্ছে বকশীদের বাড়ির মাঠে আনুদের ছাগলের বাচ্চাগুলো খুব লাফাচ্ছে। কোরবানির সময় বিক্রি করবেন বলেছেন। ততদিনে ওরা বড় হয়ে যাবে।
আনু কম্পিত গলায় জিগ্যেস করে, বুলু ভাই?
কিরে?
কত টাকা দেবে পানু ভাইয়ের জন্যে।
কী জানি।
বুলু ভাবতে থাকে। আনুর কাঁধে হাত রেখে আচমকা বলে, টাকা পেলে, এবার তোর সালু আপাকে ভালো জামা কিনে দিস।
আনু মুখ তুলে দেখে, বুলুর মুখটা হঠাৎ খুবই ঝকঝকে দেখাচ্ছে। চোখে চোখ পড়তেই চোখ ফিরিয়ে নিল বুলু। তাড়াতাড়ি বলল, তোর মা সেদিন আমার মাকে বলছিল ও নাকি কিছু চেয়ে নেয় না।
আনমনা হয়ে যায় আনু। কাল বিকেলে ওদের বাসার পেছনে সরু গলিটায় সালু আপাকে দেখেছিল কি যেন বলতে। বুলুকে বলতে। বুলুকে বোধ হয় জামার কথা বলেছে। আনু। বলল, ওর একটা ভালো শাড়ি ছিল। সাইত্রিশ টাকা দাম। বড় আপা সেদিন বেড়াতে যাবে, ওর ভালো শাড়ি নেই দেখে দিয়ে দিল সালু আপা। আর নেয়নি।
দরোজার পাট ধরে দাঁড়িয়েছিলেন বড় আপা। আনু কাছে আসতেই সে জিগ্যেস করল, কিরে?
আনু বলল, টাকা এসেছে।
কার?
পানু ভাইয়ের।
কী ভেবে আনু আবার বলল, আমাদের।
.
পাঁচ হাজার টাকা এসেছিল। বুলুর বাবাই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন পোস্টমাস্টারের সংগে দেখা করে। মাস্টার সাহেব নিজে এসে নিজে হাতে টাকা দিয়ে গেলেন আনুর মাকে। সইটা বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন, চশমা পরে দেখলেন, চশমা ছাড়া দেখলেন। তারপর বুলুদের বাড়িতে চা খেয়ে ছাতা খুলে মাথায় দিতে দিতে চলে গেলেন।
বুলুর বাবা গলা বড় করে ভেতর বাড়িতে আনুর মাকে বললেন, কাল পোস্টাফিসে একটা পাশ বই করেন। এত টাকা কাছে রাখা ঠিক না। আনু, সকালে দোকানে যাবার সময় আমাকে মনে করিয়ে দিও।
রাতে খেয়ে দেয়ে শুয়ে ছিল আনু। এই ঘরটাতে ও থাকে একা চৌকিতে। বাবার বড় পালংকে থাকে মা মিনু আপা আর সালু আপা। ওপাশের ঘরে বড় আপারা। আসলে ঘর একটাই, মাঝখানে হাত তিনেক পথ রেখে বেড়া দিয়ে পার্টিশন করা। ও ঘরে হারিকেন। এ ঘরটা অন্ধকার। শুয়ে পড়েছে সালু মিনু আপা। ও ঘরে মেজ আপার চুল আঁচড়ানোর শব্দ শোনা যাচ্ছে। সেজ আপা গুন গুন করছে, বোধ হয় মুখে সর মেখে শোবে। যেদিন রাতে ও মুখে সর মাখে সেদিন অমনি গুন গুন করে। আনু কতদিন মাছ ধরতে যায়নি। মা বকে, বলে, মাঝি পাড়ায় গিয়ে থাক, এ বাড়িতে আসিস কেন? হাত নিসপিস করতে থাকে আনুর। বুলুর বাবার দেওয়া সুতো বড়শি যে–কে–সেই পড়ে আছে। কাল যদি মাছ ধরতে যায় বুলুর বাবাকে অনেকগুলো মাছ দেবে। কাল যদি মাছ ধরতে যায়, আনু তাহলে কটা মাছ পাবে? তিনটে, না পাঁচটা জিয়োল, এক গণ্ডা বাচা, একটা বড় শোল, দুটো বেলে। বড় আপা বেলে মাছ ভালোবাসে। আর সবাই জিয়োল। মা, যেদিন শোল মাছ হয় খুব সুন্দর করে রাধেন। বাচা মাছ দেবে বুলুর বাবাকে। একটা রুই মাছের বাচ্চা যদি পাওয়া যেতো, হাত দেড়েক, ঝাল ঝাল মাখা মাখা করে রান্না হতো, মাছটা দিয়ে একটুখানি ডাল রান্না করত যদি মা। কিন্তু হাফিজ মিয়ার পুকুর ছাড়া রুই পাবে কোথায় আনু? দেখলে আর কথা নেই। জবাই করে ফেলবে আনুকে। আনুর ঘুম পায়। হাফিজ মিয়ার পুকুরে রুই মাছগুলো যেন দেখতে পায়; কাঁচের মতো পানির নিচে ছবির মতো সব মাথা গুঁজে পানির মধ্যে পড়ে আছে। মাথার পরে খুব রোদ উঠেছে কিনা!
লণ্ঠনের আলো সারমুখে টের পায় আনু। দ্যাখে, মা। মা লণ্ঠন তুলে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
ঘুমিয়েছিস?
না।
কিন্তু মা লণ্ঠন নামিয়ে নেন। যেন যাবার উদ্যোগ করেন। বলেন, থাক, তাহলে ঘুমো।
আনু কান পেতে শোনে, এখন আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। অনেক রাত হয়েছে নিশ্চয়ই। বড় আপাদের ঘরে বাতিটা নেভানো। আনু উঠে বসে। বলে, কি?
