আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, নিঃশব্দে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল আনু। দৌড়ে ছুটে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে হলো, হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করলো অনেক দূরে। বাবা তার মাথাটা আরো কাছে টেনে নিলেন। আরো আদর করতে লাগলেন তিনি। চোখ তুলে তাকালে আনু দেখতে পেত তিনিও কাঁদছেন।
০৮. আনু এখন বড় হয়ে গেছে
আনু এখন বড় হয়ে গেছে। এই খবরটা কেবল আনু ছাড়া সবাই জানে। কেবল আনু জানে না, সবাই জানে, আনু এখন বড় হয়ে গেছে।
আগে বেলা করে উঠতে ইচ্ছে করত না তার। সালু আপা একদিন যদি ডাকতে দেরি করত, তাহলে সেদিন সারাদিন তার বেণি আস্ত থাকত না। এখন সালু আপা বেণি করে না, মা–র মতো খোঁপা করে। আনু এখন ভোরে ওঠে।
ভোরে উঠে আর ফুল কুড়োতে ছুটে বেড়ায় না। সবার আগে উঠে, কেবল মা–র পরে উঠে, আনু বড় বড় পা ফেলে বাসা থেকে বেরোয়। মা তখন কুয়োতলায় ওজু করছেন, তার সংগে। একটা কথা পর্যন্ত হয় না!
পথটা ভারী নির্জন হয়ে পড়ে থাকে। যেন কালরাতে কার গা থেকে ছাই–রং একটা শাল পড়ে গেছে, আর ভোলা হয়নি—- আকাশটা তেমনি। যেন মোটা আম গাছটার আড়ালে থেকে বাবাকে এখুনি দেখা যাবে পায়চারি করতে করতে আনুর দিকে আসছেন। তার সমস্ত মুখ সূর্য ওঠার লাল রংয়ে ছবির মতো। তার হাসির ভেতর থেকে যেন সূর্য উঠেছে।
খুব গম্ভীর হয়ে একা একা হাঁটতে থাকে আনু। ডাক বাংলোর পুকুরে এসে পদ্ম দেখে, পাতায় পাতায় একটুও পানি দেখা যাচ্ছে না। একটা দুটো পাতা সরিয়ে অনেকক্ষণ ধরে মুখ ধোয় আনু। রাতভর ঠাণ্ডা হয়ে আছে। ঠাণ্ডা পানিতে চোখের ভেতরটা যেন কাটতে থাকে।
কোনো কোনো দিন আনু সেখান থেকে আসে নদীর দিকে। ধরলার দিকে। ধরলার পাড়ে দাঁড়িয়ে কোনো কোনো দিন হিমালয় দেখা যায়। একেবারে সারা আকাশ জুড়ে নীল মেঘের মতো। তারপর, কখন যেন, একটা মেঘের চূড়া ঝকঝক করে ওঠে। আনুও তখন হাসতে থাকে। তার মনের মধ্যে আর কিছুই মনে থাকে না। না বড় আপার ছায়ার মতো মুখ, মেজ আপার কান্না, সেজ আপার এটা নেই ওটা নেই বলে মুখ ভার, মার রাত জেগে জেগে নামাজ, মিনু আপা বখাটে হয়ে যাচ্ছে, সালু আপার জামা ছিঁড়ে শাদা কাধ বেরিয়ে পড়েছে, বাবাকে জেলে নিয়ে গেছে, পানু ভাই রেলে কাটা পড়ে মারা গেছে, কিছুই মনে থাকে না। সব ভুলে গিয়ে সে দেখতে থাকে —-ঝকঝক করছে, হাসছে।
তারপর দপ্ করে নিভে যায়। বাবা বলতেন, সূর্য একটু উঠে গেলেই আর রোদ পড়ে না, তখন কাঞ্চনজংঘা আবার নীল হয়ে যায়। সেটাও মজা লাগতো। দপ্ করে নিভে যেতেই বাবার হাত ধরে আনন্দে লাফিয়ে উঠত আনু। দৌড়ে বাসায় এসে বাকুম বাকুম করে সেই গল্প শোনাতো। মিনু আপা যদি ঠোঁট উলটে বলত, যা, আমিও দেখেছি তাহলে মনটা ভারী ছোট হয়ে যেত আনুর। বাবা সেটা লক্ষ্য করে মুড়ি চিবোতে চিবোতে বলতেন, মিনু আর কি দেখেছে? আজকের মতো কোনদিন হয়নি। কি বলিস আনু?
এখন আনু কাঞ্চনজংঘা নিভে যাওয়া পর্যন্ত আর দাঁড়ায় না। তার আগেই চলে আসে। এসে আর গল্পও করে না।
আসবার পথে দেখতে পায় ইস্টিশানের দোকানগুলোয় ডালপুরি বানাচ্ছে গরম গরম। ভারী ইচ্ছে করে একটা কেনে। পকেটে হাত দিয়ে দেখে হয়ত চারটি পয়সাও আছে। কিন্তু কেনে না। পকেটের মধ্যে হাত দিয়ে শক্ত করে পয়সাটাকে অনুভব করতে থাকে, ঘোরাতে থাকে, হাতের তেলো ঘামতে থাকে। কিন্তু কেনে না। বাসায় এসে শুধু এক পেয়ালা চা খেয়ে নাশতা করে। বারান্দায় বসে বসে দেখে, রান্নাঘরে গতরাতের বাসি ভাত নিয়ে বসেছে মেজ আপা, সেজু আপা; বড় আপা বড় এক গেলাসে পানি খাচ্ছেন। কেউ তাকে পড়তে বলে না। একটু পর আনু নিজেই পড়ার বই নিয়ে বসে। আবৃত্তি করে পড়ে না। মনে মনে, মাথা নিচু করে, বারান্দার থাকে ঠেস দিয়ে এক্সিমোদের কথা পড়ে আনু।
সেদিন হঠাৎ অফিস থেকে পিয়ন এসে বলল, আনু মিয়া মাস্টার সাহেব আপকো বোলায়া।
মাস্টার সাহেব? কে মাস্টার সাহেব? আনু জানে না পোস্টমাস্টারকেও মাস্টার সাহেব বলে। তাদের বাসায় জায়গির থেকে পড়ত মাস্টার সাহেব, বাবা যখন জেলে গেলেন, তিনি চলে গিয়েছিলেন। যাবার সময় তাকে সব সাদা খাতা, দুটো গল্পের বই, একটা টাকা, কাঁচের দোয়াত দান, পেতলের একটা ছোট্ট বক দিয়ে গিয়েছিলেন। আনু এখন বুঝতে পারে–বাবা যে নেই, তারা খেতে দিতে পারবে না, তাই চলে গিয়েছিল মাস্টার সাহেব। পানু ভাই বুঝি আগেই টের পেয়েছিল ঘুস নিতে গিয়ে ধরা পড়বেন বাবা, জেলে যাবেন, তাই রেলে কাটা পড়ে ফাঁকি দিয়ে গেল। পানু ভাইয়ের কী? বড় হয়েছে, বি,এ, পাশ করেছে, ঢাকা দেখেছে, ভালো ভালো জামা আর জুতো কিনেছে, বড় বড় জংশনে কাজ করেছে। তার মরে যেতে কী। মরতে একটুও দুঃখ নেই তার।
পিয়নের ডাক শুনে মা এসে দাঁড়িয়েছিলেন দরোজার ওদিকে। নিচু গলায় তিনি জিগ্যেস করলেন, আনু জিগ্যেস কর, ওরা ডাকছে কেন?
পিয়নটা উত্তর করে, মা–জি হামারা মালুম নেহি।
আনু ভেতরে আসে। একটা কথাও বলে না! আলনা থেকে বেছে একটা শার্ট বের করে গায়ে দেয়। সুন্দর করে শার্ট ধুয়ে রাখেন মা! নোখ দিয়ে দিয়ে কালারে, বোতামের জায়গায় কুচিগুলো সমান করে রাখেন।
মা বললেন, বুলুকে নিয়ে যা।
বুলু পাশের বাড়ির ছেলে। এবার নাইনে পড়ে। বুলুর মাকে খুব ভালো লাগে আনুর। বুলুর বাবাকেও, বুলুকেও। বুলুদের সবাইকে ভালো লাগে আনুর। বুলুরা কেউ কখনো বলে না, আনুর বাবা ঘুস খেয়ে জেলে গেছে। সারা শহরে শুধু বুলুরাই বলে না। আর সবাই বলে। বলে, আর দাঁত বার করে হাসে। কেবল বুলুরা বলে না। আর বলে না ইয়াসিন সিপাহী। বাবা যখন এখানে দারোগা ছিল, তখন ইয়াসিন বাজার করে দিত। ইয়াসিন এখনো মাঝে। মাঝে হাট করে দিয়ে যায়। ইয়াসিন আনুকেও বলত, দারোগা সাহেব। বলত, আনু যখন দারোগা হবে তখন তার ঘে৷ রাখবে ইয়াসিন। আনু দারোগা হবে না। আনু হবে গার্ড সাহেব। পানু ভাই তো ছিল অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেশন মাস্টার। সে হবে গার্ড। রাত দুপুরে ঝক ঝক ঝিক ঝিক করতে করতে তার গাড়ি বানার পাড়া ছাড়িয়ে ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকা চলে যাবে। বুলুব বাবা মাসে দুমাসে রোজ ঢাকা যান। দোকানের জিনিস কিনে আনেন। পিন, কলের গান, রেডিও, রেকর্ড, কাঁচে বাঁধানো বিলেতের রাস্তা ঘাট সমুদ্রের ছবি। একটা ছবি খুব ভালো, যেটাতে দুটো ছেলে বসে মাছ ধরছে। আনুও মাছ ধরে। আনুর জন্যে বুলুর বাবা গেল মাসে এক সেট বড়শি আর মুগা সুতো এনে দিয়েছেন। আনু কাল যখন মাছ ধরতে যাবে বুলুর বাবাকে অনেকগুলো মাছ দেবে।
