থানার হুকুমে একদিন এ বাসা ছাড়তে হলো। পানু ভাইয়ের কবর আছে বলে মা কিছুতেই মহিমপুর ছেড়ে যেতে রাজি হলেন না। মাস্টার সাহেব আর আনু গিয়ে বাসা ঠিক করে এলো—- একটা বড় ঘর আর রান্নাঘর, বাইরে শনের একটা ছোট্ট ঘর, ভাড়া আঠারো টাকা। কেমন নোংরা আর নির্জন। আনুর মনটা খারাপ হয়ে যায় বাসা দেখে। কিন্তু এরচেয়ে বেশি ভাড়া দেবার সাধ্য যে তাদের নেই। থানার কোয়ার্টার ছেড়ে আসবার সময় মা আরেকবার কেঁদে উঠেছিলেন। দেয়ালে একদিন পেন্সিল দিয়ে আনু বড় বড় করে লিখে রেখেছিল, বাবার সেই কথা আর্লি টু বেড, আর্লি টু রাইজ, মেক্স ম্যান হ্যাঁপি অ্যাণ্ড ওয়াইজ—- আসবার সময় ঘষে ঘষে মুছে দিয়ে এসেছে।
সকালে বাসা বদল হলো। বিকেলে মাস্টার সাহেব আনুকে বললেন, আনু, চলো নদীর পাড়ে বেড়িয়ে আসি।
তার সঙ্গে বেড়াতে গেল আনু। বিকেল পড়ে এসেছে। আকাশটা দেখাচ্ছে কেমন কোমল। নদীর ওপারে নীল হয়ে এসেছে গাছপালা, গ্রাম। একটা নৌকা পাল তুলে ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে। ঝাউবনে সরসর করছে বাতাস। এক জায়গায় নারকোল আর গুড়ের নৌকাগুলো গলাগলি ধরে ঢেউয়ের তালে তালে নাচছে যেন। মাঝিরা কেউ ছইয়ে বসে, কেউ নিচে নেমে গল্প করছে, মশলা পিষছে, হুঁকা টানছে। হাঁটতে হাঁটতে কতদূর চলে এসেছে ওরা।
একটা ফাঁকা জায়গায় বসলো মাস্টার সাহেব। আনুও বসলো। দুজনে চুপ করে দেখতে লাগল নদী। নদীটা কেমন নীল আর লাল মেশানো রং নিচ্ছে—-আয়নায় আঁকা ছবির মতো মনে হচ্ছে। সেদিকে চোখ রেখেই মাস্টার সাহেব ডাকলেন, আনু।
জি।
আনু তাকালো তার দিকে। কিন্তু তিনি ফিরে তাকালেন না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর আস্তে আস্তে বললেন, আনু, তুমি এখনো ছোট। তোমাকে এই কথাগুলো বলা এখন ঠিক হবে না। তবু যদি না বলি, তাহলে বড় হয়ে অনেক প্রশ্ন তোমার মনে আসবে, তুমি উত্তর পাবে না। বড় হলে বুঝবে, আজ আমি এ সব তোমাকে বলে ভালোই করেছি।
অবাক হয়ে যায় আনু। কিন্তু চমকে ওঠে না। মনে হয়, স্বপ্নের ভেতর থেকে কথা বলছে মাস্টার সাহেব। মনে হয়, এই তো আনু বড় হয়ে গেছে। বন্ধুর মতো দুজনে পাশাপাশি বসে আছে। কথা বলছে। সে অপেক্ষা করে। সে যেন জানেই কী বলবেন উনি।
আনু, আমি বড় গরিব। মাস্টার সাহেব বলতে থাকেন, বড় কষ্ট করে লেখাপড়া করছি। তোমার বাবা জায়গির না রাখলে হয়ত বি.এ. পড়াই হতো না আমার। দ্যাখো না, কতদূব। রংপুর, রোজ ট্রেনে যাই কলেজে। তোমার কাছে লজ্জা কি? বিনা টিকিটে যাই। হাতে বই খাতা দেখে, আমার মুখের দিকে দেখে, চেকাররা কিছু বলে না। বুঝলে?
হ্যাঁ।
আবার চুপচাপ হয়ে যায় দুজন। আবার মাস্টার সাহেব বলেন, আনু, তোমার বড় আপাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। আমি বিয়ে করতে চেয়েছিলাম মনে মনে। শুধু আমি আর তোমার বড় আপা জানি। আর কেউ জানে না। তোমার বাবার বিপদ, আমি আর ভার হয়ে থাকতে চাই না।
কেন?
অবাক হয়ে আনু জিগ্যেস করে। বড় আপাকে বিয়ে করতে চান মাস্টার সাহেব, সেটা তাকে একটুও লজ্জিত করে না। বরং সে উদ্বিগ্ন হয়ে আবার শুধায়, আপনি চলে যাবেন?
হ্যাঁ আমার যাওয়াই ভালো। জানো আনু, তুমি যখন বড় হবে তখন বুঝবে আমি যা কবছি, রুঢ় হলেও দরকার ছিল। আমি চলে যাচ্ছি। তাতে একটা লোক কমবে সংসারে, তোমাদের এমনিতে অভাব, কিছুটা সুবিধে হবে। তাছাড়া তোমার বড় আপাকে আমি যতই ভালোবাসি, এখন যদি থেকে যাই, কেউ নেই তোমাদের সংসারে যে বড়, তাতে লোকে মন্দ বলবে, তোমার আপাদের নামে কুৎসা ছড়াবে। আনু তুমি যখন বড় হবে তখন বুঝবে আমি ভালোই করেছি, তোমাদের ভালোর জন্যেই আমি চলে যাচ্ছি। তোমার বড় আপা বোঝে না। তুমি বড় হলে বুঝবে। তোমাকে বলে যাচ্ছি।
বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন মাস্টার সাহেব। আনু তাকিয়ে দেখে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে। চোখে হাত দিয়ে দেখে, পানি। পানি মুছে দেখে সন্ধ্যায় কালো হয়ে গেছে নদী। তার কুলকুল আস্তে আস্তে বাড়ছে। দূরে নৌকা থেকে মাঝি আজান দিচ্ছে। একটা তন্দ্রার ঘোরে যেন ঝাউগাছগুলো এখনো একটু একটু নড়ছে।
সে রাতে মাস্টার সাহেব চলে গেলেন।
.
আনু একদিন শুনলো বাবাকে মহিমপুর হাজতে কয়েকদিনের জন্যে নিয়ে এসেছে। সেদিনই সে খোঁজ নিতে গেল। ছোট দারোগা তাকে দেখে নিয়ে গেলেন বাবার কাছে। আনু যেন চিনতে পারে না তাকে। চোখের কোলে কালি পড়ে গেছে, পরনের জামাটা আধময়লা, কেমন এক শূন্যতা তার চারদিকে। তিনি ব্যগ্র দু চোখ মেলে দেখলেন আনুকে। আনু মাথা নামিয়ে রইলো।
প্রত্যেকদিন আনুরা সবাই যেত বাবার সঙ্গে দেখা করতে। শেষদিন যখন বাবাকে ওরা এখান থেকে নিয়ে যাবে, সেদিন একটু আগেই এলো আনু, আপারা, মা। আনু ছিল সবার পিছনে। কিন্তু বাবা তাকেই ডাকলেন প্রথমে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বারবার ডাকলেন।
আনু, ও আনু, আনু, বাবা।
উঁ।
সংক্ষেপে জবাব দেয় আনু। কী জানি যদি কান্না পেয়ে যায় তার। বাবা তখন তার কানের কাছে মুখ রেখে মাথার ওপর গলাটা ঠেকিয়ে বললেন, তুমি আমার একমাত্র ছেলে। তোমাকে নিয়ে আমার কত আশা, কত ভরসা। ভালো করে লেখাপড়া করবে। লেখাপড়া শেষ হলে কত বড় চাকুরি করবে। কিছুরই অভাব, কিছুরই ভাবনা থাকবে না তোমার। তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা কোরো। আমি শীগগীই ফিরে আসব।
