একদৌড়ে কাছে গিয়ে দাঁড়াল আনু। হড়বড় করে ভাঙা গলায় তিনি বললেন, আমার হাতঘড়িটা ফেলে এসেছি টেবিলের ওপর। শীগগীর যা।
বাবার কপালে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। ঠোঁট দুটো যেন কাঁপছে। আর এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন শুধু শুধু। বাসা থেকে দৌড়ে ঘড়িটা এনে তার হাতে দিল আনু। ঘড়িটা হাতে বাঁধতে বাঁধতে বাবা বললেন, বাসায় থেকো। বাইরে যেও না খেলতে। কেমন?
আনু ঘাড় কাৎ করে সায় দেয়। তার চোখ পানিতে ভরে আসে। যতদিন বাবা মফস্বলে যান, আনুর খুব খারাপ লাগে। আজ যেন আরো। কদিন থেকে বাবা কেমন অস্থির, সেদিন তাকে বকেছিলেন, রাতে মার সঙ্গে কথা—- এসব আলাদা মনে করে নেই; সব মিলিয়ে একটা অবোধ মমত্ব শুধু, সেটাই তাকে আজ অভিভূত করে ফেলে। সে যতদূর দেখা যায় তাকিয়ে রইলো। বাবা একবারও তাকালেন না ফিরে। সঙ্গে ইয়াসিন। দুটো সাইকেল দেখতে দেখতে নদীর দিকে বাঁক নিয়ে মিলিয়ে গেল।
তখন ছিপ নিয়ে বেরুলো আনু। একটু আগেই বাবা বারণ করে গেলেন, তবু। জানে এখন বিকেল ফুরিয়ে আসছে, এখন আর কোথায় মাছ ধরতে যাবে, তবু। তবু সে ছিপ নিয়ে বেরুলো। বেরিয়ে গেল না কোথাও। কালভাটের পাশে ছিপটা হাতে করে ঠায় বসে রইলো। একটা গানের মতো কোথা থেকে সুর উঠছে। আনু ভালো করে কান খাড়া করে শোনবার চেষ্টা করে। ছোট দারোগার বউ আবার হারমোনিয়ম টিপছে। একটা ঝিমোনো সুর বেরুচ্ছে। সেই সুর লতিয়ে চিনচিনে গলা শোনা যাচ্ছে–আমি যাবো না, যাবো না সই। সেই গানটা তার মনের মধ্যে রাগ এনে দিল। হঠাৎ সে টান অনুভব করল বাড়ির জন্যে। বড় বড় পা ফেলে বাড়িতে এসে সে ছিপটাকে তেল খাওয়াতে লাগল।
.
পরদিন মাস্টার সাহেব কোথা থেকে ছুটে এসে চড়া গলায় ডাকতে লাগলেন। ডাকতে ডাকতে আজ প্রায় বাসার মধ্যেই ঢুকে পড়েছেন তিনি।
আনু, আনু।
কী?
তোমার মা–কে ডেকে দাও তো শীগগীর।
কেন?
আনুর সারাটা শরীর শির শির করে উঠল শুনে। মাস্টার সাহেব এরকম গলায় কথা কইছেন কেন?
দরকারি কথা আছে।
মা এসে দরোজার পাশে দাঁড়ালেন। মাস্টার সাহেব একবার তাকে দেখলেন, একবার আনুকে, তারপর অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, আম্মা, থানায় খবর এসেছে দারোগা সাহেব অ্যারেস্ট হয়েছেন।
চকিতে মুখ তুলে তাকালেন মা। কথাটা যেন তার বিশ্বাস হচ্ছে না। আর আনু অবাক হয়ে গেছে। অ্যারেস্ট! মানে হাতকড়া লাগিয়েছে? তার বাবাকে? যেন এরচেয়ে অসম্ভব আর কিছু হতে পারে না। আনু আর দুকানে কিসসু শুনতে পায় না। হা করে তাকিয়ে থাকে। মাস্টার সাহেব রীতিমত হাঁপাচ্ছেন, যেন এক দু মাইল দৌড়ে এসেছেন তিনি। কথাটা শুনে মা–র চোখ ছলছল করে উঠল, মুখখানা বিষ হয়ে গেল, কিন্তু শান্ত কণ্ঠেই জিগ্যেস করলেন, কার কাছে শুনেছ?
ছোট দারোগা সাহেবের কাছে।
ক্রমে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ল কথাটা। বড় দারোগা সাহেব এক খুনের মামলায় চার হাজার টাকা ঘুস নিয়েছিলেন। কিন্তু ধরা পড়ে যান। আনুর কেন যেন মনে হয়, সেদিন বৃষ্টিতে দৌড়ে থানায় গিয়ে যে দাড়িওলা পাঞ্জাবি পরা লোকটার সঙ্গে বাবাকে কথা বলতে দেখেছিল, সেই ঘুস দিয়েছিল। কিন্তু কথাটা কাউকে জিগ্যেস করতে পারে না। ছোট দারোগার বউ গায়ে পড়ে এসে মিষ্টি কথা বলে যায় আর মুখ টিপে টিপে হাসে। আবার বলে, বাবা, আমার সাহেবের এ সব নাই। নামাজ রোজা করে না ঠিক, কিন্তু দিল সাফ। আবার কেউ কেউ যাচ্ছে তাই বলে। মুখের ওপর কথা শোনায়।
ছি,ছি, অমন দাড়িওলা পরহেজগার মানুষ। তার এই কাণ্ড?
টিটকিরি দেয় কেউ ঘরে সেয়ানা মেয়ের হাট। তা বুড়ো করবেই বা কী? জন্ম দেবার সময় হুশ ছিল না যে।
আশ্চর্য, কারো ওপরে একটু রাগ হয় না আনুর। বাবার ঘুস নেবার কথা শুনে একটুও ঘৃণা হয় না তার জন্যে। বরং মনটা খারাপ করে। বাবার সঙ্গে যেন এক হয়ে যায় আনু। বাবা তো গরিব। বাবার টাকা দরকার। মনিরের বাবার কাছে টাকা চাইলেন, দিল না। বাবা কী করবেন: আনু যেন বুঝতে পারে, বাবা কত অসহায়। বাবার জন্যে তার আরো মায়া করে। তখন। সে আপন মনে হাঁটতে থাকে। বশিদের মেয়েরা সব সেজে গুঁজে রাস্তায় বেড়াচ্ছে। সেখান থেকে সে পালিয়ে যায়। এত একা লাগে নিজেকে। মনে হয়, বাবাকে যদি ওরা ছেড়ে দিত, তাহলে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ত আনু।
আর বাসায় পানু ভাইয়ের এন্তেকালে সকলে যা না কেঁদেছে, এবার একেকজনে তাই কাঁদল। মা রাধতে গিয়ে কাঁদেন। খাওয়াতে গিয়ে কাঁদেন। আনুর মনে হয়, ঘুমের ঘোরেও কাঁদেন তিনি। বড় আপা কেঁদেছেন সবচেয়ে বেশি। কেঁদে কেঁদে তিনি দরিয়া করে ফেলেছেন। তখন আনুও আর থাকতে পারেনি। তার বুকের ভেতরে একতাল জমাট কান্না বড় আপার কোলে এক সময় ঝরঝর করে গলে পড়ে।
কোনো রাতে সার ভালো ঘুম হয় না অনুর। ছবির মতো মনে পড়ে সেই রাতে তার গায়ে বাবার কথা টেনে দেয়া। পানু ভাইয়ের লাশ এলো। ভোর সকালে বাবার সঙ্গে গোরস্তানে গিয়ে কবর থেকে আগাছা তুলে ফেলা! পথের ওপর দাঁড়িয়ে বাবা হাতঘড়ি বাঁধছেন। মাস্টার সাহেবের পকেট থেকে চেনা রুমালটা বেরিয়ে পড়ল হঠাৎ। সকাল বেলা ঘুম থেকে আধো জেগে উঠে কতদিন কান পেতে দেখেছে আনু, যেন এখুনি সে শুনতে পাবে বাবা সুরা পড়তে পড়তে পায়চারি করছেন। পর মুহূর্তেই ভুল ভেঙ্গেছে তার, আর বুক ঠেলে উঠেছে কান্না।
