বাঁ পায়ের ওপর ডান পায়ের বুড়ো আঙুল চাপিয়ে খুঁটতে থাকে আনু। বিস্ময় তার বাঁধ মানছে না। এ কী হয়ে গেছেন তার বাবা? আজ এরকম করছেন কেন? বাবা আবার চাপা গলায় ধমকে উঠলেন, এক গা পানি কাদা নিয়ে দৌড়ে আপিসে ঢোকা এই তোমার আক্কেল।
বৃষ্টিতে ভয় পেলে আমি কি করব। আমি কি করতে পারি?
ইয়াসিন।
ডাক শুনে ইয়াসিন দৌড়ে এসে হাজির হয়।
যাও, একে ছাতা করে দিয়ে এসো।
আনু বাসায় ফিরে এসেছে পাঁচ মিনিটও হবে না, বাবা এসে উপস্থিত। বারান্দায় চুপ করে বসে ছিল আনু। তাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকলেন বাবা। বৃষ্টি এখন অনেকটা কমে গেছে। পাশের বাড়িতে আপারা আটকে ছিলেন, ওরাও এসে গেলেন একটু পরেই।
ছবিটা, ছবিটা ভেঙেছে কে?
বাবা প্রশ্ন করেন অবাক হয়ে। মা–র গলা শোনা যায়, বাতাসে ছিঁড়ে পড়ে গেছে।
বাতাস? ও।
বাবা আর কোনো কথা বললেন না। বারান্দা থেকে আনু দেখতে পেল, বাবা ভাঙা ছবিটা তুলে আলমারির তাকে উঠিয়ে রাখলেন। বাইরে আকাশ শান্ত। আর ঘরের ভেতরটা চুপচাপ। কারো কোনো কথা শোনা যাচ্ছে না।
একটু আগেই বাবার ওপর খুব রাগ হয়েছিল আনুর, এখন যেন তা আর নেই। বদলে, কেমন লজ্জা করছে, অনুশোচনায় ভরে আসছে মন। সত্যি ওভাবে দৌড়ে যাওয়া ঠিক হয়নি তার। কতরকম লোক আসে বাবার কাছে, বাবা হয়ত জরুরি আলাপ করছিলেন। লোকটার চেহারা চোখের সামনে ভেসে ওঠে আনুর। কালো, চাপদাড়ি, গায়ে পাঞ্জাবি, হাতে আংটি। ছুরির মতো চোখ তার। লোকটার আঙুল দশটা সারাক্ষণ অস্থির হয়ে টেবিলে এটা নাড়ছিল, ওটা ঠেলে রাখছিল; লোকটা আনুর দিকে বারবার তাকাচ্ছিল। আনুর মনে হলো, তারই ভুল হয়েছে। বাবা রাগ করেছেন। নইলে কখনো বাবা তাকে বকেন না। আনুর কেমন ইচ্ছে হলো এখন বাবাকে একটু দেখতে। দরোজার কাছাকাছি সরে এসে চোর–চোখে আনু তাকাল ভেতরে। দেখল, বাবা একমনে বসে জুতোর ফিতে খুলছেন।
আনু জানে না রাত এখন কত। ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেছে তার। আজকাল রাতে এরকম হঠাৎ চমকে ঘুম থেকে জেগে যায় আনু। বুকের মধ্যে ভয় করতে থাকে। পানু ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। চোখের সামনে যেন দেখতে পায় রক্তাক্ত দু খণ্ড দেহটা। কাঠ হয়ে পড়ে থাকে আনু। ভারী তিয়াস পেল তার। চোখ মেলে দেখে পায়ের কাছে চৌকির নিচে হারিকেন জ্বলছে ছোট হয়ে। আনু বিছানা হাতড়ে উঠে দাঁড়াল। ঘুম জড়ানো চোখে দুএক পা এগিয়েছে সে, এমন সময় কী যেন চোখে পড়ল তার। ঘরের ও পাশটায় খানিকটা জায়গা নিকষ অন্ধকার। একটা কুকুর অবিকল মানুষের মতো কেঁদে উঠল বাইবে। শুকনো গলায় আনু জিগ্যেস করল, কে? অন্ধকারটা নড়ে চড়ে উঠল।
আমি আনু, আমি।
বাবা। বাবা কথা কয়ে উঠলেন। যেন কী একটা করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছেন তিনি। গলাটা তাই কেমন জড়ানো। আনু এক পা এগিয়ে এসে বলল, পানি খাব।
হুঁ।
পানি খেয়ে এসে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ল আনু। বাবা তো এত রাত অবধি কোনদিন জাগেন না। নির্জন অন্ধকার ঘরে চেয়ারে বসে বাবা কি ভাবছেন? সারাটা শরীর কেন যেন কাঁটা দিয়ে উঠল আনুর। বুকের ভেতরটা পাথরের মতো ভার হয়ে এলো।
বেশ খানিক্ষণ পরে আনু টের পেল বাবা উঠে দাঁড়ালেন। হারিকেনটা হাতে নিয়ে বড় করলেন তিনি। তারপর আনুর বিছানার পাশে এলেন। আনু চোখ বুজে নিঃসাড় হয়ে পড়ে রইলো।
অনেকক্ষণ তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন আনুর পাশে। তারপর তার গায়ের কথাটা ভালো করে টেনে দিলেন। মশারিটা গুঁজে দিলেন আবার।
ঘুমে জড়ানো গলায় মা ও ঘর থেকে বললেন, তুমি শোওনি এখনো?
বলতে বলতে মা এলেন এ ঘরে। বাবা গিয়ে শুয়ে পড়লেন বিছানায়। মা তাঁর পায়ের কাছে বসলেন। বাবা বললেন, ছেলেটাকে হঠাৎ তখন বকেছি, মেজাজ ভালো ছিল না। ভারী রাগ করেছে দেখছি।
মা কোনো কথা বলেন না। বাবা আবার বলেন, সন্ধ্যে থেকে মুখ ভার করে আছে। খারাপ লাগছে এখন নিজেরই। অমন করে না বকলেই হতো।
আনুর তখন ইচ্ছে হলো, উঠে গিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলে আমি একটুও রাগ করিনি।
মা হঠাৎ বললেন, তুমি কদিন হলো অমন ছটফট করছো কেন?
কোথায়?
তুমি না বললে কি হবে, আমার চোখ নেই?
বাবা তখন হাসলেন। ঢেউ ভাংগার মতো শব্দ হলো যেন। বললেন, ও তোমার চোখের ভুল।
রোজ এত রাত জেগে থাকলে, এত ভাবলে, কি থাকবে তোমার শরীরে? কি ভাবো এত? অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বা উত্তর করলেন, ভাবি, হাশরের মাঠে আল্লাহ, যখন ডাকবেন, গোলাম হোসেন। আমি তাকে মুখ দেখাবো কী করে?—- এবার আর ভাববো না পানুর মা। হাশরের মাঠে বলব, আমারে তুমি কি বাকি রেখেছিলে যে আমি তোমার রশি শক্ত করে ধরে থাকব। জীবনে পাপ করি নাই সজ্ঞানে, পানুর মা, তাই ঘুম হয় না।
আনু বুঝতেই পারে না, বাবা এ সব কী বলছেন? সব চেনা শব্দ, অথচ একসঙ্গে তাদের কোনো অর্থই স্পষ্ট হচ্ছে না তার কাছে। একটা ধাঁধার মতো লাগছে। কেবল এটুকু বোঝা যাচ্ছে, কী একটা ভাবনায় বাবা কদিন থেকে দিন রাত ডুবে আছেন। বাবা একটু পর বললেন, আবার বৃষ্টি আসবে বোধ হয় বাতাস বইছে।
মা তখন আস্তে আস্তে উঠে গেলেন।
পরদিন বাবা মফস্বল গেলেন। আনু স্কুল থেকে সবে ফিরেছে তখন। দেখে কাপড় চোপড় সব গোছানো হয়ে গেছে। ইয়াসিন সাইকেল পাম্প করছে।
বাবা শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সাইকেল হাতে নিলেন। পেছনে মা দাঁড়িয়েছিলেন। একবার তাকালেন শুধু। তারপর ধীরে ধীরে রাস্তায় গিয়ে উঠলেন। আনু তার পেছনে পেছনে চলল। খানিকটা পথ যাবার পর বাবা সাইকেল থেকে নেমে ডাকলেন, আনু।
