আনু বুঝতে পারে, মা তাকে যেতে দিতে চান না। তখন মার জন্যে খুব মায়া করে আনুর। উত্তরে কিছুই বলতে পারে না সে। ম্লান একটুখানি হাসে শুধু। মা তাকে আরো আদর করতে থাকেন।
শীতকালের আকাশ আয়নার মতো পরিষ্কার। কখনো সখনো এক আধ টুকরো সাদা মেঘ খেয়ালির মতো ভেসে বেড়াতে দেখা যায়। আর মাঝে মাঝে উত্তরে মেঘের ঝাঁপটে ধোঁয়াটে মেঘ আকাশ ভরে তোলে। শুকনো হিম–হিম বাতাস হু–হু করে বয়।
পড়তি বিকেলে বাইরের ঘরে বসে একটা কাগজ থেকে ছবি কাটছিল আনু। এমন সময় দমকা এক হাওয়া ঘরের ভেতরে ঢুকে আনুর হাত থেকে কাটা ছবিটা উড়িয়ে নিয়ে গেল আচমকা। ছবিটার পেছনে ধাওয়া করে বাইরে এসে আনু দেখে আকাশ জুড়ে কালো মেঘ, মেঘের ওপর মেঘ জমেছে। অন্ধকার হয়ে আসছে দিনের আলো, রাস্তায় লোকেরা দৌড়চ্ছে, বাতাস বইছে এলোমলো। এক্ষুণি বোধ হয় ঝড় উঠবে।
ঝড় উঠবে কি, ঝড় উঠে গেছে ততক্ষণে। আকাশ চিরে ঝলক দিয়ে উঠল বিদ্যুৎ–এর আগুন। একবার, দুবার, বারবার খোলা দরজাটা আছড়ে দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল। স্তব্ধ হয়ে গেল আনুর হৃদস্পন্দন। দৌড়ে গিয়ে যখন দরজাটা বন্ধ করল সে, তখন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।
শোবার ঘরে মা একেলা রয়েছেন। ভাবতেই ভেতরটা হিম হয়ে গেল আনুর। ঝড় বৃষ্টিকে মা–র যা ভয়। সামান্য একটু বৃষ্টি নামলেই সারাটা শরীর তাঁর থরথর করে কাঁপতে থাকে। সবাইকে বুকের কাছে নিয়ে ঘরের এককোণ ঘেঁষে বসে থাকেন। আর বিড়বিড় করে আল্লাকে ডাকেন আল্লা, বৃষ্টি থামিয়ে দাও। ভয়, এখুনি হয়ত ঘরদোর সব ভেঙে পড়বে মাথার ওপর। সয়লাব হয়ে যাবে দুনিয়া। আর আজ যা ঝড় বৃষ্টি নেমেছে, না জানি একেলা অন্ধকার ঘরে বসে মা কী করছেন।
প্রবল বাতাসের মধ্যে একবার যেন আনু শুনতেও পেল, আনু, বাবা আনু।
এত ক্ষীণ সে ডাক যে আনু ভালো করে বুঝতেও পারল না, তার আগেই মিলিয়ে গেল ডাকটা। কান পাতলো আনু, আবার ডাকছেন বুঝি। আনু এখন বাতাস ভরে কেবল মা–র কণ্ঠই শুনতে পাচ্ছে।
আনু, ও আনু।
মা ডাকছেন। বাতাসে একটা অনবরত হুইলের মতো আওয়াজ। আর তারই ভেতর থেকে উঠে আসছে ডাকটা। আনু চঞ্চল হয়ে ওঠে। কিছুই সে বুঝতে পারে না কী করবে। তার ভীষণ প্রস্রাব পায়।
এমন সময় শোবার ঘরে ভারী কী যেন একটা ঝনঝন করে পড়ে গেল। আর সেই সঙ্গে রক্ত জমানো চিৎকার। বৃষ্টির মধ্যে একলাফে বেরুলো আনু। বেরিয়ে ছুটে শোবার ঘরে গিয়ে। ঢুকলো। এই টুকুতেই সারা গা তার ভিজে গেছে। কিন্তু সেদিকে চোখ নেই তার। তাকিয়ে দেখে মা চৌকির এককোণে বসে গোঙাচ্ছেন, নিঃশ্বাস ফেলছেন জোরে জোরে। এক মুহূর্ত আনু বোকার মতো তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর চিৎকার করে ডাকে, মা, ও মা, মা। মা কোনো কথাই বলছেন না। হাঁপাচ্ছেন। কাঁদছেন। আনুর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছেন না। আনু পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে, মেঝের ওপর একরাশ ছোটবড় ভাঙা কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে আছে। তার মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে সেই বড় ছবিটা, সব্বাইয়ের গ্রুপ ফটো, আনু তখন কোলে, মিনু আপা তখন হাফপ্যান্ট পরে। আর দেয়ালের যে জায়গাটায় ছবিটা ঝোলানো ছিল সে জায়গাটা বিশ্রী রকমে ফাঁকা। দুএকটা ঘেঁড়া মাকড়শার জাল হাওয়ায় কাঁপছে। আনু চোখ ফিরিয়ে আনে। দুহাতে মাকে ধরে আবার ডাকে, মা, মাগো।
তখন আনুর হঠাৎ ভয় হলো। ভীষণ ভয় হলো। মা চোখ বড় বড় করে হাঁপাচ্ছেন। আনুর মনে হলো, মা এক্ষুনি পড়ে যাবেন।
কী করবে ভেবে না পেয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল আনু। তারপর নিঃশ্বাস নিয়ে বৃষ্টি মাথায় করে প্রাণপণে ছুটে চলল থানায়, বাবার কাছে। তীরের মতো বৃষ্টির ফলা বিধছে শরীরে, মাথায় মুখে। জামাটা বুকে পিঠে লেপটে গেছে। চোখ আবছা হয়ে আসছে পানির ঝাঁপটায়। আনু তবু পাগলের মতো দৌড়ুচ্ছে! যখন থানার কাছে গিয়ে সে পৌঁছুলো তখন যেন তার মধ্যে সে আর নেই।
বাবা একটা অচেনা লোকের সঙ্গে নিচু গলায় কথা কইছিলেন। আনুকে হঠাৎ এসময়ে এভাবে দেখে চমকে উঠলেন যেন।
আনু!
শীগগীর বাসায় চলো, মা কেমন করছে।
কেন, কী হয়েছে?
বাবা তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। কিন্তু আনু কি বলবে? কি জবাব দেবে এর? মা র কী হয়েছে কি করে বোঝাবে সে? কিছুই বলতে পারল না সে। অচেনা লোকটার জন্যে আরো লজ্জা করল। লোকটা কেমন ছুরির মতো চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আনুর বিশ্রী লাগছে। কথ জড়িয়ে এলো তার। কোনোরকমে সে বলল, বৃষ্টিতে না ভয় পেয়েছে। আর সঙ্গে সঙ্গে বাবা চিৎকার করে উঠলেন, আর তুমি তাই বাসা ছেড়ে এসেছ? বৃষ্টিতে ভিজেছ?
চমকে উঠল আনু। যেন উনি তার বাব; নন। বাবাকে এরকম চিৎকার করতে, বকতে, কোনদিন শোনেনি আনু! এ কি হয়েছে তার বাবার? ভয়ে কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে গেল আনু। ঠকঠক করে বৃষ্টি ভেজা ঠাণ্ডায় সে কাঁপতে লাগল। বাবার চোখের দিকে তাকাতে তার প্রবৃত্তি হলো না।
ভারী রাগ হলো তার। এত রাগ হলো যে কোনো কথা না বলে সে বাবার কামরা থেকে বেরিয়ে এলো। এতো রাগ হলো, ইচ্ছে হল, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে একটা অনর্থ করে বসে আনু।
পেছনে কার পায়ের আওয়াজ পেল সে। তাকিয়ে দেখে, বাবা। তিনি খপ করে তার হাত ধরে টান দিয়ে বললেন, বৃষ্টিতে আবার ভিজে চলেছ কোথায়? দিন দিন বখাটে হয়ে যাচ্ছ, না? একদিন ধরলে মেরে লাশ বানাবো।
