পানু ভাই! চিৎকার করে উঠল আনু। সে চিৎকার বাইরে কেউ শুনতে পেল না। এক নিঃশব্দ, অন্ধ, তাড়িত পাখির মতো চিৎকারটা তার বুকের মধ্যে ফেটে পড়ল, ঘুরতে লাগল। মা তার মাথার ওপরে গাল রেখে আবার ফুঁপিয়ে উঠলেন। অনেকক্ষণ পরে যখন চেতনা হলো আনুর, দেখল তার সারা মুখ অশ্রুতে ভারী হয়ে ফুলে উঠেছে। বাবা চেয়ারে বসে কেবল মাথাটা এপাশ ওপাশ করছেন আর আঃ আঃ ধ্বনি উঠছে অস্পষ্ট।
পরদিন রাতের ট্রেনে কাঠের বাক্সে সিল করা লাশ এলো পানু ভাইর। একটা কোলের বাচ্চা রেলের ওপর পড়ে গিয়েছিল, আর তখন ট্রেন আসছিল হু-হু করে, বাচ্চাটাকে বাঁচাতে পেরেছিলেন কিন্তু তাঁর জীবন নিয়ে গেল ট্রেন।
ডাকবাংলোর পেছনে, ভোরে, ফজরের নামাজের পর দাফন করা হলো। আনু মাটি দিল দুমুঠো ইয়াসিন তার হাতে মাটি তুলে দিয়েছিল। বাবার হাত শক্ত করে ধরে হাফেজ সাহেবের পেছনে পায়ে পায়ে ফিরে এলো আনু। পেছনে পড়ে রইলো সদ্য ঢাকা কবরটা। তার ওপরে বড়ই গাছের একটা ডাল পোতা। ঝুরঝুরে ধূসর মাটিগুলো ভিজে ভিজে। পাশে। বাঁধানো ঘেরা কবর থেকে মিষ্টি ফুলের ভারী একটা সুঘ্রাণ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ডাকবাংলোর পাশে ঘুমটি ঘরে বুড়োটা বাঁশের মাচায় বসে হুঁকো টানছে। মুড়ি মুড়কির। দোকানে ঝপ উঠলো এইমাত্র। একটা গরুর গাড়ি যাচ্ছে খলিলগঞ্জের দিকে ক্যাচ–ক্যাঁচ কাঁচ–কাঁচ করতে করতে। পিড়িং পিড়িং করে শালিখগুলো উড়ে যাচ্ছে, বসছে, আবার উড়ছে। আর পানু ভাইকে দেখতে পাবে না আনু। শরীরটা একেবারে টুকরো টুকরো হয়ে। গিয়েছিল তাই ওরা বাক্সে সিল করে দিয়েছে। না হলে বাবা–মা–ভাই–বোনেরা যে দেখে কষ্ট পাবে! আনু আর কোনদিন দেখতে পারবে না।
মাস্টার সাহেব আনুর কাঁধে হাত রাখলেন। বাবা গিয়ে শুয়ে পড়লেন বিছানায়। দুদিনে যেন দশ বছর বয়স বেড়ে গেছে তার। শাদা চুলে মাথাটা ছেয়ে গেছে, খিলাল করেননি, এলোমেলো হয়ে গেছে সুন্দর একমুঠো তীব দাড়ি, চোখে কালি পড়ে গেছে, হাতের কবজি কত চিকন মনে হচ্ছে।
আনুকে মাস্টার সাহেব কোলের কাছে টেনে মুখটা মুছিয়ে দিলেন। তারপর তাকে বিছানার পাশে বসিয়ে চুপ করে রইলেন। যেন কিসের অপেক্ষা করছে দুজন।
তারপর থেকে গোটা বাসাটাই কেমন যেন বদলে গেল। কথা বলতে ভয় করে, হাসতে টান। পড়ে বুকের মধ্যে। আনু যেন কেমন একেলা হয়ে যায়। রোজ সকালে উঠে পড়তে বসে, ইস্কুলে যায়, ফিরে আসে, রাতে বিছানায় শুয়ে অন্ধকারে জেগে থাকে—- এ বাড়ির কারো সাথে যেন তার কোনো সম্পর্ক নেই। সে একটা ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায়। এখন একেকদিন ছিপ নিয়ে বেরোয় মাছ ধরতে, কেউ আর তাকে কিছু বলে না। এখন আনু ভালো মাছ ধরতে শিখে গেছে। মাছগুলো সে বাসায় আনে না। ফেরার পথে যদি রাস্তায় ভিখিরি ছেলেমেয়েরা ভিড় করে তাদের দিয়ে দেয়। নইলে সেপাই ব্যারাকে গিয়ে ইয়াসিনকে। আনু যখন ছিপ নিয়ে বসে পানির মধ্যে পানু ভাইয়ের চেহারাটা ভেসে ওঠে। মাথার চুল উলুটিয়ে সিথি করা, হা–হা করে হাসছেন।
একেকদিন ভোরে বাবা তাকে নিয়ে যান পানু ভাইর কবর জেয়ারত করতে। বাবা তাকে আগাছাগুলো তুলে ফেলতে বলেন। আনু উপুড় হয়ে পড়ে, দুহাতে বাজে গাছগুলো তুলে ফেলে। মাটি আর মৃতের একটা মেলানো ঘ্রাণ তার সমস্ত বোধ আচ্ছন্ন করে ফেলে। আনুর যেন কোনো জ্ঞান থাকে না আর।
মাঝে মাঝে মা এক কোণে বসে অঝোরে কাঁদেন। সেজ আপা সেলাই করতে গিয়ে কাঁদেন। হাতের সুই, সুতো নিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে পড়েন। বড় আপাকে যেন আর দিনের আলোতে দেখা যায় না। সারাদিন সবার আড়ালে আড়ালে তিনি ঘুরে বেড়ান।
বাবাকে আর কোনদিন আনু দেখেনি, ভোরে সেই হাসিভরা উজ্জ্বল মুখ নিয়ে শিউলি তলায় পায়চারি করতে। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে আর আনুকে ডাকেন না বাবা। আনু আর কুস্তি শিখতে যায় না ইয়াসিনের কাছে।
.
পুরো এক বছর হতে চলল আনুরা মহিমপুরে এসেছে। আবার শীত পড়ছে মন্থর গতিতে। গভীর রাতে গায়ে কাঁথা না দিলে গা কেমন শিন্–শিন্ করে ওঠে। হালকা কুয়াশা চাঁদরের মতো জড়িয়ে ধবে গাছগুলো। আর নিম গাছের ফাঁক দিয়ে একটু পরে যেটুকু রোদ এসে ছিটিয়ে পড়ে তাতে বসে থাকতে বেশ ভালো লাগে। গাছে গাছে পাতা ঝরছে। পাতা পড়ছে। কেমন যেন উদাসীন মনে হয় এবারের শীত।
এক সকালে বাবা আনুকে বললেন, ভাবছি, আনু তোকে সামনের বছর বড় স্কুলে ভর্তি করে দেব। বোর্ডিং–এ থাকবি।
কথাটা শুনেই মা প্রতিবাদ করে ওঠেন, হ্যাঁ, অতটুকুন ছেলে বাপ–মা ছেড়ে বিদেশ বিভুয়ে থাকবে।
কেন তাতে হয়েছে কী? বারবার স্কুল বদলাতে হয় আমার সাথে সাথে, তাতে লেখাপড়া কিসসু হয় না। তার চেয়ে বোর্ডিং–এ দেওয়া ঢের ভালো মানুষ হবে।
বোর্ডিং–এ থাকা সে তো ঢের খরচ। আনু (তা জানে, বাবা কত গরিব। তবু বাবা কেন তাকে বোর্ডিং–এ রেখে পড়াতে চান? বুক ঠেলে নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো আনুর। মাথা নিচু করে সে। নাশতা করতে লাগল। বাবা একবার আনুর মুখের দিকে তাকালেন। মা বললেন তাকে, তোমার চায়ে একটু দুধ দেব?
হ্যাঁ, দাও।
আনমনে উত্তর করলেন বাবা। তারপর আস্তে আস্তে চাটুকু খেয়ে বেরিয়ে গেলেন আর একটা কথাও না বলে। আনুর চুলে হাত রাখলেন মা। বুলিয়ে দিতে দিতে মিষ্টি করে জিগ্যেস করলেন, তুই বোর্ডিং-এ থাকবি আনু?
