গাড়িতে উঠে একটা টাকা দিলেন তাকে পানু ভাই। তারপর ছাড়বার সময় হলে ইয়াসিনের সঙ্গে নেমে এলো সে। ইয়াসিন হাত তুলে বলল, সালাম খোকাবাবু, সালাম।
বাঁশি বাজল। হুইসিল পড়ল। শেষবারের মতো ঢং ঢং করে উঠল ঘণ্টা। হিস–হিস করে উঠল ইঞ্জিন। সরে যেতে লাগল পানু ভাইয়ের গলা বাড়ানো জানালাটা। আনু হাঁটতে লাগল সঙ্গে সঙ্গে। তারপরে দৌড়লো। তারপর হঠাৎ থেমে গেল প্ল্যাটফরমের শেষপ্রান্তে। গাড়িটা ঝক ঝক করতে করতে বেরিয়ে গেল। ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল দূরের বাকে। আনু চোখ ফিরিয়ে দেখে তার চোখ বরাবর ইস্টিশানের খাড়া সাইনবোর্ড মহিমপুর। বাংলা, উর্দু আর। ইংরেজিতে লেখা। লেখাটাই যেন কিছু পড়তে পারছে না সে। ইয়াসিন তার হাত ধরে বলল, চলিয়ে ছোটা খোকাবাবু। আপনি ভি এরকম কেতো যাইবেন নৌকরি লিয়ে। হাঁ, সাচ বোলছি। হাঁ, হাঁ।
০৭. ছিপটা নিয়ে সহজে বেরোনো হয় না
ছিপটা নিয়ে সহজে বেরোনো হয় না আনুর। মা যা রাগ করেন। প্রথমদিন যখন ছিপটা দেখলেন একেবারে খেপে উঠলেন, ও কি! ও আবার কি! পানুর এই আক্কেল। নিজে গোল্লায় গেছে, আবার ছোটটাকে ধরিয়ে দিয়ে গেছে।
আরেকটু হলেই ছিপটা নিয়ে মা দুখানা করে ফেলতেন। আনু ধা করে হাতে নিয়ে দে ছুট। ডাকবাংলোর পুকুরে ছিপ ফেলে বসেছিল আনু। মা–র জন্যে মনটা অশান্তি লাগে। সেদিন পানু ভাইয়ের সঙ্গে যেমন, তেমন একটুও মনে হয় না। শুধু সারাক্ষণ কেমন ভয় ভয়। একটা মাছ ধরতে পারল না আনু। যাঃ, মনটাই খারাপ হয়ে গেছে আনুর।
তারপর থেকে একেকদিন বিকেলে আনু ছিপটা বের করে যেত না কোথাও। বাইরের ঘরে মাস্টার সাহেবের বিছানায় বসে সারাক্ষণ হাত বুলোত, দেখত নাড়াচাড়া করত। তার চোখের ভেতরে ফিরে আসত সেদিন দুপুরের নদীটা, খা খা করা পাড়, নীলচে ধূসর রং রিঠা মাছটা। যা মজা হয়েছিল খেতে। আনুও ধরবে ও রকম। একদিন সে নদীতে যাবে।
মাস্টার সাহেব বলেন, ছিপের ইংরেজি কি বলোত?
আনু জানে না, এতো জানাই কথা। মিষ্টি মিষ্টি হাসেন মাস্টার সাহেব। শেষে বলে, ফিশিং রড। দিস ইজ এ ফিশিং রড।
একটা রুমাল দেখে চমকে ওঠে আনু। সেদিন না সে দেখল এই রকম একটা রুমালে ফুল তুলতে বড় আপাকে। মাস্টার সাহেব তাড়াতাড়ি পকেটে ঢুকিয়ে অপ্রস্তুত গলায় বলে ওঠেন, ইস্, কী গরম পড়েছে!
তা সত্যি। পানু ভাই চলে যাওয়ার পর কয়েকমাস কেটে গেছে। শীত আর নেই। জোর গরম পড়তে শুরু করেছে। শীগগীরই হয়ত কালবোশেখী শুরু হয়ে যাবে। এদিকে নাকি একবার ঝড় তুফান উঠলে আর থামতে চায় না।
আনুর এখন ফুটবল খেলায় ভারী নেশা পেয়ে গেছে। সেই মনিরদের ওখান থেকে এসে বিকেলে সে যেত ইস্কুলের মাঠে। প্রথমে খেলা দেখত ছেলেদের তারপর আস্তে আস্তে করে সে নিজেই একজন ভারী খেলোয়াড় হয়ে উঠল। এখন তাকে না হলে চলে না। এ দল ও দল টানাটানি করে। খুব ভালো গোল দিতে পারে আনু। একটা এমন ঝেড়ে কিক দিতে পারে গোলির বাবা পর্যন্ত টের পায় না কোথা দিয়ে কি হয়ে যায়। আর ইস্কুলের খেলা তো! নিয়ম কানুন কিছু নেই। যার পায়ের কাছে বল সেই রাজা। পিন্টু পর্যন্ত তাকে আজকাল সমীহ করে চলে। তার সাথে আজকাল খাতির হয়ে গেছে আনুর। পুরনো কথা ভুলে গেছে। সে। পিন্টুর সঙ্গে গলা ধরে একেকদিন যায় ওদের বাড়িতে। ওর মা কত কী খেতে দেন। গল্প করেন। একেবারে ঠিক তার মার মতো। তার মতোই পাঁচ বোন পিন্টুর। বড়জন ঠিক বড় আপার মতো বড়। বাসায় এসে পিন্টুদের কত গল্প করে আনু। মেজ আপা তার সঙ্গে ঠোনা দিয়ে বলেন, তো যানা, বকশীদের বাড়িতে গিয়েই থাক তুই।
তখন রেগে যায় আনু।
যাঃ আমি বুঝি তাই বলছি। যা, আমি অব কিছু বলবো না কোনদিন।
সেদিন পিন্টু খেলাশেষে ওদের বাসায় যেতে টানছিল। আনু বলল, না ভাই, রাত হয়ে যাবে, মা বকবে।
সত্যি বেলা একেবারে পড়ে এসেছে। আশটা কেমন লাল দেখাচ্ছে। পথের ধারে কেরোসিনের বাতিগুলো দৌড়ে দৌড়ে মই লাগিয়ে সাফ করছে চৌকিদার। পথ দিয়ে ফিরতে ফিরতে হঠাৎ কেমন গা ছমছম করে উঠল আনুর। বারবার পেছনে তাকাল, ডানে তাকাল, বামে তাকাল। কে যেন পাশে পাশে আসছে তার। পায়ের আবছা শব্দ শোনা যাচ্ছে যেন, অথচ চারদিকে কেউ নেই। আনু প্রায় দৌডুতে থাকে। বাসার কাছে এসে যখন পৌঁছায় তখন ভরসন্ধ্যে। দূরের মসজিদ থেকে আজানের ক্ষীণ করুণ ধ্বনি থেমে থেমে ভেসে আসছে। ঝোঁপঝাড়গুলো একেবারে আঁধার হয়ে গেছে। এরি মধ্যে জোনাকি বেরিয়েছে। একটা দুটো।
বাসার ভেতরে পা দিয়েই যেন বোকা হয়ে গেল আনু। এখনো বাতি জ্বালেনি কেন কেউ? কি হয়েছে? ও কি! মাথা ঘুরছে আনুর। বুকটা খালি লাগছে। আঁধার বারান্দায় ছায়ামূর্তির মতো দাঁড়িয়ে মা, আপারা ডুকরে কাঁদছেন। এত কাঁদছেন যে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, কাটা কবুতরের মতো ছটফট করছে রুদ্ধ আওয়াজ। এমনকি বাবা পর্যন্ত অন্ধকার ঘরে চেয়ারের ওপর গা এলিয়ে দিয়ে ছেলেমানুষের মতো ডেকে ডেকে কাঁদছেন। আনুর গলা যেন বুজে এলো। সেও যেন নিঃশ্বাস নিতে পারছে না আর। তার হাত–পা সব পাথর হয়ে। গেছে। স্থানুর মতো সে দাঁড়িয়ে রইলো উঠোনে। তখন বড় আপা ছুটে এসে তাকে বুকে। চেপে ধরলেন।
টেলিগ্রাম এসেছে, পানু ভাই রেলের নিচে কাটা পড়েছেন।
