লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ান পানু ভাই। চমক ভাংগে আনুর। তাকিয়ে দেখে, তিনি একহাতে ছিপটা ধরে আছেন শক্ত করে, সরসর করে হুইল থেকে সুতো খুলে, নদীর অতলে চলে যাচ্ছে। আনুও উঠে দাঁড়ায়। চঞ্চল হয়ে একবার পানু ভাইর দিকে একবার নদীর দিকে তাকায়। দ্রুত কণ্ঠে জিগ্যেস করে, কি? মাছ?
কোন জবাব দেন না পানু ভাই। তার কপালে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ফুটে উঠেছে। নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরেছেন তিনি। মাথার ফিনফিনে চুলগুলো বাতাসে ঝিরঝির করে উড়ছে। সুতো নাড়া বন্ধ করে আস্তে আস্তে বায়ে কয়েক পা হেঁটে গেলেন পানু ভাই চোখ তাঁর নদীর পানিতে। আনু কিছু বুঝতেই পারে না, কি ব্যাপার। তার ভারী গর্ব হয। মুগ্ধ চোখে পানু ভাইকে সে দেখতে থাকে।
আস্তে আস্তে সুতো গুটোতে থাকেন পানু ভাই। তারপর একসময় থেমে যান। নিস্পন্দ দাঁড়িয়ে থাকেন। পানিতেও কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। হঠাৎ আবার টান পড়ে সুতোয়, সরসর করে খুলে যেতে থাকে, ট্রিং ট্রিং শব্দ করতে থাকে হুইল, পানু ভাই বলেন, জোর গোত্তা মারছে রে। সের পাঁচেক হবে।
কী?
মাছটা।
সুতোর টানেই ওজন বুঝতে পারেন পানু ভাই? অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন এক স্বপ্নরাজ্যের মানুষ মনে হয় তাঁকে আনুর। মিনিট দশেক এরকম খেলা চলে পানির অতলে মাছটার সঙ্গে ডাঙায় দাঁড়ানো পানু ভাইয়ের। একসময়ে হঠাৎ এক ঝটকায় ছিপটা তুলে ফেললেন তিনি। গোড়ালির ওপর ঘুরে একেবারে উলটে মুখ হয়ে যান। শূন্যে ধনুকের মতো লেজ বানাতে থাকে। আনু দৌড়ে যায় ধরবার জন্যে।
রিঠা মাছ! কেমন নীলচে ধূসর রং, আবার গোঁফ আছে দ্যাখো{ বশীটা গিয়ে গেঁথেছে নিচের ঠোঁটে একেবারে এ ফেঁড় ও ফোড় হয়ে। আনু সন্তর্পনে হাত রাখে মাছটার গায়ে। কী ঠাণ্ডা, একেবারে বরফের মতো। মাথার ওপরে খসখসে, পাখনা নড়ছে এখনো, মসৃণ। আনুর খুব ইচ্ছে হয়, সে যদি এরকম মাছ ধরতে পারতো, অবাক হয়ে যেত সবাই। পানু ভাইকে বলে, বাবা রিঠামাছ যা ভালবাসে।
তাই নাকি রে?
দেখো তুমি।
পানু ভাই পকেট থেকে ছুরি বের করে মাছের পেটটা চিরে ফেলেন। বের করে দেন আতুরিটা। তারপর খালুইয়ের ভেতরে রেখে দিয়ে আবার ছিপ নিয়ে বসেন। আনু জিগ্যেস করে, কেন?
তাহলে আর পচবে না। এসব মাছ আবার তাড়াতাড়ি নরোম হয়ে যায়, বুঝলি? কিরে তোর ছিপে এখনো কিছু পড়ল না যে!
ছোট ছিপটা আনুকে দেখতে দিয়েছিলেন। তার ফান্য এখনো স্থির। একটু একটু দুলছে কেবল স্রোতের দোলায়। পানু ভাইর ফানাটা আবার ঝাঁকুনি দিয়ে তলিয়ে গেল।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে গেল। ফেরবার পথে পানু ভাই চা খাবার জন্যে বসেছিলেন ইস্টিশানের দোকানে।
ওহে, আমাকে একটা কড়া চা দিও! আর একে মিষ্টি, কি আছে?
অমিরতি দেই?
দাও, দুটো দিও। কিরে দুটো খেতে পারবি না আনু?
দোকানে যারা বসেছিল তারা শুধালো মাছের কথা। কেউ কেউ বলল, বাহু, ছিপে আপনার গুণ আছে যাহোক! বাজারে সাত আট টাকার মাছ হবে। তাও তাজা পাবেন কোথায়?
আপশোষ করতে কবতে তারা মাছগুলো দেখল আঙুল দিয়ে নেড়ে চেড়ে। আনুর খুব বাহাদুর মনে হচ্ছে নিজেকে। সেও তো ছিল পানু ভাইর সঙ্গে।
মা দেখেই বলে উঠলেন, সারাদিন চরে–চরে ঘুরে চেহারা কী করেছে দুজন। এ বদ নেশা তোর কোত্থেকে এলো পানু? ওখানে এই করে বেড়াস নাকি?
হ্যাঁ, তাহলেই হয়েছে। রেল কোম্পানির জামাই কিনা আমি।
আনু যেন চুপসে যায়। মা যে কী একটা! মা তাকে ধমকে ওঠেন, এখন পড়তে বসো গে। আর ঝিমিয়ে কাজ নেই।
উঃ, আনুর সারা গা এমন মটমট করছে, একটু শুতে পেলে ভারী ভালো হতো। তার কি উপায় আছে? রান্নাঘর থেকে তার পড়বার টেবিল যে দেখা যায়। আনু গিয়ে বই নিয়ে বসে। মন বসে না বইয়ের পাতায়। চোখের সামনে বারবার ফিরে ফিরে আসে দুপুরের রোদে জ্বলা নদীটার ছবি। যেন জীবনে আর কখনো সে যেতে পারবে না সেখানে। আস্তে আস্তে বইয়ের ওপর কখন ঘুমিয়ে পড়ে আনু তা নিজেও জানতে পারে না। প্যাচা–মুখ ঘড়িটা তার চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে টিক–টি–টিক করে চলে অবিরাম।
.
যাবার দিন সকালে তনুকে ডেকে ছোট ছিপটা দিয়ে দিলেন পানু ভাই। আর দুটো বশী, দু রকম। বললেন, মা–কে বলিস না কিন্তু। আর শোন, ছুটির দিন ছাড়া খবরদার যাবি না। যেতে হলে ইয়াসিনকে সাথে নিয়ে যাস।
আচ্ছা।
যা বলবে, তাতেই রাজি আনু। এত খুশি হয়েছে সে ছিপটা পেয়ে। পানু ভাই যে কেন একটা আস্ত ছিপ তাকে দান করে দিলেন, ভেবে কিসসু কুলকিনারা করতে পারে না। ভারী অবাক লাগে তার। বিশ্বাসই হতে চায় না। ছিপটা সে লুকিয়ে তুলে রাখবে ঘরের চালে, কেউ দেখতে পাবে না। মাঝে মাঝে বার করে দেখবে। আবার তুলে রাখবে।
মা–বাবাকে সালাম করে বাড়ি থেকে বেরুলেন পানু ভাই। মা দরোজার কাছে দাঁড়িয়ে যতদূর দেখা যায় তাকিয়ে রইলেন। আপারা বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। সেই টমটমটা এসেছে আজ। ইয়াসিন মাল তুলে দিয়ে জোর–পায়ে চলল ইস্টিশানের দিকে। আনুও উঠে বসলো টমটমে। বাবা ভেজা গলায় বললেন, পৌঁছে চিঠি দিস পানু।
তারপর মৃদুস্বরে উচ্চারণ করলেন, খোদা হাফেজ। আল্লাহু গফুরুর রহিম।
আপাদের দিকে তাকিয়ে পানু ভাই ছবির মতো হাসলেন।
আসিরে।
টমটম চলতে লাগল। সারা রাস্তায় একটা কথা হলো না দুজনের। পানু ভাই যদি দেখে ফেলেন আনুর চোখে পানি টলটল করছে। সে বসে বসে ছিটের নকশী খুঁটতে থাকে; মনটাকে জোর করে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু আর বুঝি পারা যাবে না। বুকের মধ্যে হু–হুঁ করছে আনুর।
