আর তখনও চলছে মহরম। মেজর আসন খান আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, বড়া বড়হিয়া খেদমত করেছ পূরব-পাকিস্তানের কাফির লেড়কিকে খতম করে পাক্ মহরম মাসে। সোনার মেডেল পাবে। আমি সুপারিশি চিঠঠি আজই ভেজ দেব।
হিটলারের লাল গাল তখন হলদে। সর্বাঙ্গে কম্পন।
এমন সময় কে একজন কঠিনদর্শন অপরিচিত, ইউনিফর্ম-পরা অফিসার এসে উপস্থিত। সেটা হিন্দুর নরক, মুসলমানের দোজখ, খ্রিস্টানের হেল, ইহুদির গেহানেম, গ্রিকদের কলাসিস কোনও মুলুকেরই উর্দি নয়। পাঠানরা ঠাহর করতে পারছিল না, তারা কোথায় এসেছে। তবে এটা যে বেহেশত বা দোজখ কোনওটাই নয় সেটা বুঝে গিয়েছিল। হিটলার ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছিলেন অত্যন্ত বিষণ্ণ বদনে।
অফিসার ডান হাত তুলে হাইল হিটলার সম্ভাষণ জানিয়ে শুধাল, আপনি চলে যাচ্ছেন কেন? এ প্রতিষ্ঠানের দ্বারোদ্ঘাটনের সময় আপনিই ছিলেন প্রথম এবং একমাত্র সদস্য– যাকে বলে ফাউনডেশন মেম্বার। আপনি তকলিফ করে অন্যত্র যাবেন কেন?
হিটলার বিষণ্ণতর বদনে বললেন, আমি বিখ্যাত জর্মন গোষ্ঠীর একজন; কিন্তু আজ বড়ই লজ্জা পেয়েছি কতকগুলি আকাট, পাড় বর্বরের কথায়। আপনারা আমার সাধনোচিত ধাম নির্ণয় না করতে পেরে এই নবীন প্রতিষ্ঠানের পত্তন করেন। আমার কোনও আপত্তি নেই– কারণ ইহুদিদের জন্য আমিই এক নয়া নিধনাগার গ্যাস চেম্বার নির্মাণ করি। কিন্তু এই পাঠানদের সামনে আমাকে নিত্য নিত্য লজ্জা পেতে হবে, এটা আমার সইবে না। আমাকে বরঞ্চ ডিমোট করে নিম্নাঙ্গের যে কোনও অগ্নি পূরীষ কুণ্ডে পাঠান।
অফিসার বিস্মিত হয়ে শুধালেন, লজ্জাটা কিসের? আমি অতিশয় প্রাচীন সর্বাভিজ্ঞ অফিসার। আদম-ইভের প্রথম পাপ থেকে আরম্ভ করে হেন কোনও অতিশয় উর্বর মস্তিষ্কধারীর অচিন্ত্যনীয় কল্পনা-প্রসূত কোনও আচরণ দেখিনি– অপরাধ নেবেন না– যেটা আপনাকে লজ্জা দিতে পারে।
হিটলার বললেন, থ্যাঙ্কু! আমি গর্ব অনুভব করছি। কিন্তু শুনুন, আমি ফ্রানসকে পদানত করেছি, আরেকটু হলে আমার চেয়ে ঢের ছোট ক্যালিবারের চার্চিলকেও ঘায়েল করতুম, গ্যাস চেম্বার, অনেক নতুন নতুন উৎপীড়ন পন্থা আবিষ্কার করেছি সে নিয়ে আমার কোনও অহমিকা নেই। গর্ব, আত্মপ্রসাদ, দম্ভ, ঔদ্ধত্য ছিল আমার মাত্র একটি সামান্য, সঙ্কীর্ণ বিষয়ে যেটাকে হোমরা-চোমরা পলিটিশিয়ান, মিলিয়নের, রাজারাজড়া, বীরবীরেন্দ্র কেউই কণামাত্র সম্মান দেন না, বস্তুত অবহেলা, তাচ্ছিল্য করেন, এমনকি কৃপার চোখে দেখেন– সে বিষয় আর্ট। এ তাবৎ আমার দৃঢ়তম বিশ্বাস ছিল, কলানৈপুণ্যে আমি কল্পনা পরীর পাখায় ভর করে যে সর্বোচ্চ গগনে উড্ডীয়মান হয়ে নব নব সূক্ষ্মতর, সূক্ষ্মতম উল্কট উৎকট দৈহিক মানসিক যন্ত্রণাদায়িনী পদ্ধতি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিলুম, সেগুলো মহাপ্রলয় পর্যন্ত মহামানবের অভাবনীয় গৌরব, বিশ্বমানবের অকল্পনীয় বৈভব হয়ে মহাপ্রলয় পর্যন্ত উচ্চৈঃস্বরে আমার জয়ধ্বনি গাইবে। এই মাত্র আমার সে-বিশ্বাস নস্যাৎ হল। এখন শুনছি, দিক-দিগন্তব্যাপী টিঢিক্কার।… মহামূর্খ যে-পাঠানের না আছে সাহিত্য না আছে নাট্য, যাদের সঙ্গীত শুনে শিবাশগাল সোল্লাসে উপযুক্ত শিষ্যপ্রাপ্তির পরিতুষ্টিতে চিৎকারিয়া নব নব কর্ণপটহ বিদারিণী রাগ-রাগিণী দ্বারা বনস্পতি মরুভূমি প্রকম্পিত করে সেই পাঠান আজ আমাকে সর্বজনসমক্ষে, নিপীড়ন কলাশাস্ত্র ও তজ্জনিত সঙিনাগ্রে স্তন সম্বলিত নৃত্যে প্রথম ভাগের প্রথম ছত্র শিক্ষা দান করল! যে-লোকে আছি তার অন্ত নেই তাই সেখানে অন্তিম বাসনাও নেই, নইলে এই মুহূর্তে বাম করতল নিষ্ঠীবনপূর্ণ করে সেই কুণ্ডে নিমজ্জিত হয়ে সর্ব অবসান ঘটাতুম। আমি চললুম।
কীর্তি বললে, এটা এক ভদ্রলোক আমাকে রসিয়ে রসিয়ে শোনাচ্ছিলেন যে-জায়গার একটা লজ্রঝড় ছাউনিতে তার নামটাও বিকট- ফাঁসি দেওয়া না কী যেন। সেই বাগডোগরা যেখান থেকে তুমি হিমালয় দেখেছিলে, তারই কাছে। ভদ্রলোক নিষ্ঠাবান মুসলমান। পুব পা থেকে এপারে এসে ছেলে-ছোকরাদের জড়ো করে বন্দুক চালাতে শেখাচ্ছিলেন। কথায় কথায় তার মুখে গড়ে নতুন নতুন হাসির গল্প, কিংবা হাসি-কান্নায় মেশানো। আমি একটা খাঁটিয়ায় শুয়ে শুয়ে অধোমুখে দেখছিলুম সেই হাস্যমধুর লোকটি খোলা আকাশের নিচে, জায়নামাজ পেতে প্রায় দুপুররাত অবধি নামাজ পড়লেন, দু হাত তুলে প্রার্থনা করার সময় গুনগুন করে গীত গাইলেন। তিনিই তার আপাতদৃষ্টিতে স্রেফ গুলতানি শেষ করে আমাকে বললেন, আচ্ছা, চৌধুরী সায়েব, বলুন তো হিটলার ইহুদিকুলকে নির্মূল করার সময় কি খুব বেশি ইহুদি স্পাই, স্যাদি-এর মদদ পেয়েছিল? আমি যদূর জানি খুব অল্প কয়েকজন মাত্র।
আমি বললুম, স্পাই স্যাদি আদৌ পায়নি। যেটুকু যে-কজন করেছে সেটা হিটলার-হিমলারের সেপাইদের গুলিভরা বন্দুকের সঙিনের খোঁচা খেয়ে খেয়ে।
অথচ দেখুন, মাতাল লম্পট ইয়েহিয়া ওদিকে আবার কট্টর শিয়া। ভুট্টোর বাপ স্যার শাহ নাওয়াজ খান ভুট্টোকে খাঁটি সিন্ধি মুসলমান বলা চলে না। সিন্ধু দেশের অধিকাংশ লোক ইসলাম গ্রহণ করে খুদ আরবদের হাত থেকে অষ্টম শতাব্দীতে। পক্ষান্তরে ভুট্টোর হিন্দু পূর্বপুরুষ ইসলাম গ্রহণ করেন রাজপুতানাতে সপ্তদশ শতাব্দীতে। পরে সিন্ধুদেশে চলে আসেন এবং ক্রমে ক্রমে বিরাট বিস্তীর্ণ, আল্লা জানেন কত লক্ষ বিঘের জমিদারি গড়ে তোলেন।
