শিপ্রা বলল, বাপ! একবার ভাবো তো মারওয়াড়, রাজপুতানার যারা এদেশে বসবাস করছে, তারা যদি মাছ-মাংস খেয়ে আমাদের সঙ্গে এক হয়ে যেত, তবে আমরা, বাঙালিরা কি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতুম না। পুব বাঙলায় যদি তারা মুসলমান হয়ে যেত, থাক। বল কী বলছিলে।
ভদ্রলোক বললেন, ভুট্টোর পিতা জমিদারির জোরে ক্রমে ক্রমে জুনাগড় স্টেটের প্রধানমন্ত্রী হলেন। দেশবিভাগের সময় মি. জিন্নার নির্দেশ অনুসারে তিনি নওয়াব সাহেবকে জুনাগড় যেন পাকিস্তানের সঙ্গে মিলিত হয় সেই মন্ত্রণা দেন। কিন্তু হিন্দু-মুসলমান প্রজারা রুখে দাঁড়াল। শেষ ফল তো জানেন। শাহ নাওয়াজ শেষ চিঠিতে জিন্নাকে লিখলেন,
জুনাগড়ের মুসলমানদের পাকিস্তান-প্রীতি নেই বললেও চলে।
কিন্তু আশ্চর্য, শাহ নাওয়াজ গোষ্ঠী শিয়া এবং অত্যন্ত গোঁড়া শিয়া। উভয় বাঙলায় শিয়ার যে ছিটেফোঁটার ভগ্নাংশ লোকচক্ষুর অন্তরালে বাস করে সিন্ধুতে তারও বাড়া–আছি-কি-না-আছি গোছ। তৎসত্ত্বেও।
শাহ্ নাওয়াজ খানের চারজন বিবি ছিলেন। জনৈক প্রাজ্ঞ সমসাময়িক ঐতিহাসিক কাম-সাংবাদিক এ প্রসঙ্গে বলেছেন, এই ধরনের পরিবারে এইটেই ছিল রীতি। সে-সিদ্ধান্তে তিনি পৌঁছলেন কী করে, সেটা আমি বুঝতে পারিনি– যদিও আমি পুব পাকের নিম্নতম স্তরের জজ ছিলুম বটে, তবু শুধু যে সেই দেশের মুসলিম আইনানুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন ব্যবস্থার গভীরে প্রবেশ করতে হয়েছিল তাই নয়, ভারতের ভিন্ন ভিন্ন। প্রদেশে মুসলমান, আধা-মুসলমান, সিকি মুসলমানদের ওপর সম্পত্তি বন্টন ব্যাপারে দেশাচার কতখানি প্রভাব বিস্তার করেছে তার গবেষণাও আমাকে করতে হয়েছে। কিন্তু এসব শপ শুনতে কি আপনার মন যাচ্ছে।
আমি সবিনয় বললুম, ধর্মাবতার, হুজুরই, বেগ পাৰ্ডন, মহামান্য আদালতই বিচার করুন। যদি অনুমতি দেন তবে নিবেদন, আমি খবরের কাগজের রিপোর্টার নই।
বাধা দিয়ে ছোট জজ বললেন, সেটা আর বলতে হবে না। সংবাদদাতা গুষ্টির নিতান্ত চ্যাংড়া ভিন্ন কোন বড়া সাব ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল বার, কলকাতায় তো জাত-বেজাতের এন্তের, ত্যাগ করে হোটেলের দুর্গম প্যাসেজ, বিপদসঙ্কুল বারান্দা পর্যন্ত বেরোন সন্দেশ সংগ্ৰহনার্থে? মাফ করবেন আপনি বলুন।
ও সে তেমন কিছু নয়, মোদ্দা কথা, ওদেরও অধম যারা তামাশা দেখবার তরে হাসনাবাদ থেকে করিমগঞ্জ-আগরতলা অবধি রোদ মারে, আমি তাদেরও কেউ নই, আর আপনাদের মতে, স্বয়ং আল্লাতালা দ্বারা নির্বাচিত শ্রেষ্ঠতম সৃষ্ট দেবদূতের কাছে এসে দাঁড়াবার মতো দম্ভ, হীন কৃপার পাত্র বাতুল আমি–
জজ জিভ কেটে ছি ছি, তওবা তওবা বলে কানে আঙুল দিলেন। এসব না-হক অভদ্রভাবে বন্ধ না করলে আল্লা পাক আমাকে আমার মায়ের কোলে ফিরে যেতে দেবেন না। কীর্তি বললে, ভাবালুতা, ক্ষুদ্র হৃদয়-দৌর্বল্য জজদের সর্বথা বর্জনীয়। তাই তাঁর আম্মাজানের কথাটা আপন অবিবেচনা মনে করে সেটা ঢাকবার জন্য তাড়াতাড়ি খেই তুলে নিয়ে বললেন, ভারতের যত্রতত্র ভূস্বামী, যত্রতত্র একদারনিষ্ঠতা– এটা মূল সূত্র, অবশ্য বাস্তবতর হবে একদারদাসত্ব। চারটে বিয়ে করে বারোটা ছেলে পয়দা করলে, ভাগ, তস্য ভাগের ফলে তিন পুরুষেই জমিদারি নিকুচি। অতএব রীতি চার স্ত্রী নয়, এক স্ত্রী এবং হারেমে জনাতিনা খাদেমা অর্থাৎ সেবিকা, কিংবা ওই জমিদার বিগ্রহের সেবাদাসীও বলতে পারেন। নিতান্ত যারা আল্লাকে বড্ড বেশি ডরায় তারা দু জন সাক্ষী সামনে রেখে বিয়ের একটা ভড়ং করে। তা সে যাক গে। মোদ্দা কথা, মি. জুলফিকার আলি ভুট্টোর মাতা শাহ নাওয়াজকে বিয়ের প্রাক্কালে হিন্দুধর্ম বর্জন করেন। পশ্চিম পাকিস্তানেরই একাধিক কাগজ একাধিকবার বলে, বিয়েটা নাকি আদৌ হয়নি। ভুট্টো-প্রেমীজন প্রমাণ স্বরূপ বলেন, বিবাহে গুলাম মহম্মদ, হিদায়েউল্লা ও উল্লেখযোগ্য কিছু লোক ছিলেন। নিন্দুক বলে, ওটা বিয়ের মজলিস্ ছিল না মোটেই। ইংরেজ যেটাকে বলে nautch বাইনাচ। প্রধান নর্তকী কে ছিলেন, সে আলোচনা ঐতিহাসিক-কাম-সাংবাদিকরা করবেন।
বিয়ে হয়েছিল কি না, সেটা তর্কাধীন। জানি যে, আপনার কী মত, কিন্তু সেটা আমার মনের ওপর কণামাত্র রেখাপাত করে না। তর্কাতীত সত্য, জুলফিকারের মাতা হিন্দুরূপে জন্ম নেন। তার ওপরও আমি কোনও প্রাধান্য আরোপ করিনে। এক হজরত আলি ছাড়া আমাদের পয়গম্বরের সব শিষ্যই তো মুসলিম হওয়ার আগে আরবদের বর্বর ধর্ম মেনে চলতেন।
কিন্তু যারা ফ্রয়েট পদ্ধতি দ্বারা মি. ভুট্টোর সর্বপ্রধান ধর্ম- ভারতের প্রতি এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব, হিন্দুদের প্রতি তার প্রতি লোমকূপে প্রোথিত বিদ্বেষ, দ্ৰজনবর্জিত ভাষায় সুযোগে, কুযোগে, অযোগে নিত্য নিত্য তাদের প্রতি কুৎসিততম গালিগালাজ, এই একটিমাত্র অটল অবিচল অপরিবর্তনীয় অবিমিশ্র ধাতু দিয়ে নির্মিত তার সত্তা। তবে কি তার দেহে যে হিন্দু রক্ত আছে সেইটেই অস্বীকার করার জন্য, লোকে যেন সেটা স্মরণেও না আনতে পারে সেই উদ্দেশ্যে এই হিটলার-প্রশংসিত নীতি, হিট হিট হিট, হাতুড়ি দিয়ে হানো, হানো, হানো যতক্ষণ না লোকে পুনরাবৃত্তির ফলে হিপনোটাইজড, সম্মোহিত অবস্থায় তোমার বাণী, সত্যই হোক মিথ্যাই হোক, গলাধঃকরণ করে?
