আন্তর্জাতিক আইনে বিশ্বাস করো, আর নাই-বা করো ঘটিয়ু তার জন্মদাতা বলে আজ সর্বত্র স্বীকৃত। তাঁর যেসব বিধান তখনকার গুণী-জ্ঞানীদের স্তম্ভিত করে দিয়েছিল আজও সেগুলো বহুলোককে বিস্মিত করে, এবং নিশ্চয়ই বিগ ইয়েহিয়া এবং জুন্টার বিগার কর্ণে বদ্ধ উন্মাদের প্রলাপবৎ শোনাবে।
সর্বপ্রথম তিনি বলছেন, মানুষে মানুষে যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, নেশনে নেশনে তাই হবে। ব্যক্তিবিশেষ অন্য ব্যক্তির অনিষ্ট করলে যেরকম তাকে দমন করা হয়, ঠিক সেইরকম একই মাপকাঠি দিয়ে বিচার করতে হবে এক নেশন অন্য নেশনের অনিষ্ট করছে কি না, যদি করে থাকে তবে সে নেশনকে দমন করতে হবে। এ কথাগুলো নীতি হিসেবে অনেকেই মেনে নেবে। অবশ্য ভণ্ড মুচকি হাসিসহ।
কিন্তু এর পরই তিনি যে অভিমত প্রকাশ করেছেন, যে ব্যবস্থা অবলম্বন বাধ্যতামূলক করতে চেয়েছেন সেটা আজ যদি ইউনাইটেড নেশনসে কেউ প্রস্তাব করে তবে প্রভু খ্রিস্টের ন্যায় তাঁর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। দুই নেশনে যদি লড়াই লাগে তবে ছোট-বড় কোনও নেশনই নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না, সে হক্ক তার নেই।
শিপ্রা আশ্চর্য হয়ে বলল, সে কী? সব নেশনকে নামতে হবে লড়াইয়ে?
উৎসাহিত হয়ে কীর্তি বললে, ঠিক ধরেছ, গুরু। আমিও প্রথমটায় আমার চোখ দুটোকে বিশ্বাস করতে পারিনি। আমি তো বাংলায় বললুম নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না। আসলে এটিয়ুস ব্যবহার করেছেন, নন্-বেলিজারেট হতে পারবে না, অস্ত্র সংবরণ করে থাকতে পারবে না– তিনি সজ্ঞানে নিউট্রেল শব্দটি এড়িয়ে গেছেন, সে তো তিনি কাউকেই থাকতে দেবেন না। ওই যুদ্ধ আরম্ভ হওয়া বশত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যে নেশনের সামান্যতম ক্ষয়ক্ষতি হয়নি তাকেও দোষী নেশনকে সাজা দেবার জন্য অস্ত্র ধারণ করতে হবে।
সাজা দেবার জন্য!
হ্যাঁ, সুদ্দুমাত্র কড়া শাসনের শাস্তি দেবার জন্য। তাতে করে সে-রাষ্ট্রের গৌরব বৃদ্ধি পেল কি না, আখেরে তার ক্ষতির পরিমাণটা কী দাঁড়াবে– এ সমস্ত কুটিল অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা সম্পূর্ণ অবহেলা করে।
শিপ্রা ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। কীর্তির একটা হাত তুলে নিয়ে সেটা দিয়ে আপন কপালে থাবড়া মেরে বলল, হায় রে কপাল! সাড়ে তিনশো বছর হতে চলল ভদ্রলোকের কোন প্রস্তাবটা কে মেনেছে? কোন রাষ্ট্র আজ জানে না, পুব বাঙলায় আজ কী হচ্ছে? মাত্র ত্রিশ বছর আগে পৃথিবীর দ্বিতীয় বা তৃতীয় শক্তিশালী রাষ্ট্র বাকি দু জনা আগের থেকেই হাত গুটিয়ে আরাম করছিলেন তারই প্রধানমন্ত্রী ঘাড় ফিরিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলেন যখন হাহাকার রব উঠেছে অস্ট্রিয়ায়, তার কাতর আর্তনাদ ধেয়ে চলেছে লন্ডন পানে ধর্ষণ করছে তাকে গুণ্ডা হিটলার!… কে বলে নির্লজ্জতারও একটা সীমা আছে? বছরটা ঘুরলো কি না, পড়ি মরি হয়ে এবার ছুটল সেই সৌন্দৰ্যামোদী গোরা রাজ–চেকদের স্বহস্তে যূপকাষ্ঠে আবদ্ধ করার জন্য যাতে করে পিশাচ পূজোর পুরুত হিটলারের এক ঘা-তেই পটপট করে সারি বেঁধে সবকটা মুণ্ডই থাক।
কীর্তি একটু চিন্তা করে বলল, হিটলারের কীর্তিকাহিনী পড়লে শিউরে উঠতুম একদিন। এখন মনে হয় বেচারীর শেষ সান্ত্বনাটুকুও গেল।
মানে?
সাধনোচিতপ্রাপ্ত ধামে বসে সে অন্তত একটা গর্ব অনুভব করত যে, এ যুগে সজ্ঞানে তার মতো নিষ্ঠুরতা আর কেউ দেখাতে পারেনি। পঁচিশের পৈশূন্য-রাত্রে, ইতোমধ্যে বাঙালির মরণকামড় খেয়ে সেখানে ইয়েহিয়ার বেশ কটি চেলা হিটলারের সঙ্গ পেয়ে হাইল হিটলার পাকিস্তান জিন্দাবাদ সম্ভাষণান্তে দু দণ্ড রসালাপ করতে বসে গেলেন। যথাভ্যাস, হিটলার কাউকে মুখটি খোলর মোকামাত্র না দিয়ে তাঁর গৌরবময় দিনের মনিকি কায়দায় বলে যেতে লাগলেন, গ্যাস চেম্বার তার চেয়েও সস্তায় মানুষ খতম করার ইনজেকশন আবিষ্কার, ইহুদি রমণীদের কুন্তলদাম দিয়ে মোলায়েমতম তাকিয়াকুশন নির্মাণ, লাশের নীল উল্কিতে চিত্রবিচিত্র চামড়া দিয়ে তৈরি ল্যাম্পশেড– ওহোহো! সেগুলো কী অপূর্ব আলো-ছায়ার আলিম্পন ঘরের সর্বত্র বিচ্ছুরিত করে দিত।
বাধা দিয়ে এক পাঠান বললে, খাবসুরত নয়ি নয়ি চিজের বাই যদি তুললেন, তবে, আমার মনে হয়, হুজুর, গৃহস্থঘরের উচ্চ কুচ বিশিষ্টা… হঠাৎ কীর্তি থেমে গেল।
শিপ্রার তিক্ত মুখ কীর্তি ইতোপূর্বে আর দেখেনি। বললে, এখনও লজ্জা! ভয় তোমার গেছে, জানি, কোনওকালেই খুব-একটা ছিল না। ঘৃণাটা আমাদের কখনও যাবে না। তোমার সম্মুখে যে কঠোর কর্তব্য উপস্থিত সেখানে সহকর্মী সংগ্রহ করার জন্য তোমাকে লজ্জাশরম সম্পূর্ণ বর্জন করে স্ত্রী-পুরুষ সকলকেই বলতে হবে হীনতম অশ্লীলতম আচরণের কথা।
কীর্তি নীরস কণ্ঠে : পাঠান বললে, আমরা জনাদশেক একটা কলেজের মেয়েকে ধর্ষণ করার পর মেয়েটা আমারই নিচে খাবি খেতে লাগল। বেহুশ হওয়ার আগে পানি পানি বলে গোঙরাচ্ছিল, আধমরা গলায় আস্তে আস্তে ইয়া আল্লা! ইয়া রসূল! আরও কী কী সব বিড়বিড় করছিল, আমি জানিনে ওসব, কিন্তু ডেরা ইসমাঈল খানের মৌলবি সাহেবের জবানে শুনেছি। তার পর হাত-পা খিচতে খিচতে হঠাৎ চোখদুটো ইয়াব্বড়া তাম্বুর মতো খুলে গেল। দেখি, চোখের কালো মণিটনি কিচ্ছু নেই, একদম সাদা চোখদুটো জড় ছিঁড়ে ফেলে সমুচা উল্টে গিয়ে ভিতরের দিকটা বাইরে বেরিয়ে এসেছে আমাদের সর্দারকে ফাঁসি দেওয়ার পর লাশে অ্যাসা চোখ দেখেছিলুম– মার্বেলের মতো ধবধবে সাদাতে কিন্তু রক্তের ছিট গোলাবি রঙ ধরে তার পাকা আপেলের গোলাবি গালের মতো হয়ে গিয়েছিল। তখন গালদুটো হলদে রঙের পুঁজ মাফিক–আলবৎ তখন না, যখন সে ছাদের উপর থেকে লাফিয়ে পড়েছিল আপন জান নেবার জন্য আর আমরা নিচে তখন তৈয়ার ছিলুম ওকে পাকড়াবার জন্য। আরও কত পড়ল, আমরা গপাগপ পড়ার আগেই ধরে নিলুম। জ্যায়সাকে পাক্কা মেওয়া। হিটলার সাহেব, কী বাতাই আপকো। সবসে খাবসুরত দেখলুম, লাল খুন তার দুধের মতো সফেদ উরুর উপর– ওয়াহ, ওয়াহ্। সবকুছ আমার পির সাহেবের মেহেরবানিতে।… কিন্তু, হুজুর, জওয়ান ঔরটা বড়া বেতমিজ ছিল। কুছ না– অচানক দম বন্ধ— ছটসে মরে গেল। আমাদের শের দিল খান গয়রহ তিন বেরাদর তখনও বাকি। লেকিন ওরা পাক্কা মর্দ। জিন্দা-মুদাতে ফরক করনেওয়ালা পাঠানকা বেটা ওরা নয়। জঙ্গি খান একটা চোচির ডগা কামড়ে মুখে পুরল। আমি ছোরা দিয়ে দুসরাটা কেটে- অ্যাসা বড়া কভিভি দেখবার খুশ-কিস্মাৎ আমার জিন্দেগিতে হয়নি– পুরা সমুচা হাড্ডিতক কেটে আমার সঙিনের ডগায় খোঁচা দিয়ে সঙিন উঁচা করে ধরলুম। তার পর সব ভাই-বেরাদরের তালে তালে হাততালি শুনতে পেয়ে সঙিন উঁচা করে জুড়ে দিলুম মহরম মিছিলের নাচ আপনি, জনাব-ই-আলা হিটলার-সায়েব হয়তো জানেন না, মহরম আমাদের সবৃসে খাস, সসে পা মাস
