খান যদিও শিপ্রাকে বার বার বলেছিল, সবাই তখন কীর্তি যে আন্ডার ডগ-এর তরে মালিককে চড়, সরকারকে জরিমানা দিল, তার জন্য পঞ্চমুখে প্রশংসা করেছিল, তবু শিপ্রা লক্ষ করেছিল ঘটনার অন্য আরেকটা দিক– সেটা কীর্তির ধৈর্য। ক্ষণতরে উত্তেজিত হয়ে চড় মারা, জরিমানার খেসারতি দেওয়াটা বিরল নয়, কিন্তু দিনের পর দিন ধৈর্য ধরে স্বেচ্ছায় একটা রুটিন মেনে চলা বঙ্গসন্তানের পক্ষে যে কী গব্বযন্তনা সেটা শিপ্রা জানে– নইলে যে-বাঙলা সাহিত্যে সবকিছু আছে সেখানে নিত্যদিনের সহজ কর্ম ডাইরি-লিখন এবং তার থেকে যে ডাইরি-সাহিত্য গড়ে ওঠে– ইয়োরোপে যার ছড়াছড়ি– সেটা একদম নেই কেন?
আজ পূর্ব বাঙলার সাহায্যে দেবার মতো যে বিল ধাতু কীর্তির আছে, সেটা তার ক্লান্তিহীন, নিরবচ্ছিন্ন, অতন্দ্র ধৈর্য। সবুর সে করতে জানে; মেওয়াও সে চায় না।
কীর্তির চেয়েও আরও শান্ত কণ্ঠে শিপ্রা বললে, কোনওপ্রকারের অত্যাচারই তুমি বরদাস্ত করতে পারো না, সেটা আমি অনেক আগেই জানতুম আর আমাকেও এটা কতখানি পীড়া দেয়, সেও তুমি জানো। এছাড়া তোমার অন্য কোনও কারণ আছে?
কীর্তি খানিকক্ষণ চুপ করে ভেবে নিয়ে বললে, পুর্ব বাঙলার পাশে গিয়ে পশ্চিম বাঙলার দাঁড়ানোটা আমার কাছে এতই স্বতঃসিদ্ধ যে নিজের জন্য আমি কোনও যুক্তি, ঐতিহাসিক নজির বা আন্তর্জাতিক আইন-কানুনের সমর্থন খুঁজিনি। তবে সেদিন খানের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার মনে পড়ল একজন লোকের কথা। কপাল আমার মন্দ; একদা বাধ্য হয়ে অধ্যয়ন করতে হয় আমাকে, আন্তর্জাতিক আইন। এ বিষয়ে বহু দেশের বহু আইনজ্ঞ বিস্তর গ্রন্থ লিখেছেন; তদুপরি ছিলেন জিনিভা কনভেনশন, সাধনোচিত ধামে গত, লিগ অব নেশনস্, আছেন জীবতের চেয়েও অধম সংযুক্ত রাষ্ট্রপুঞ্জ–
ডাক্তারেতে বলে যখন মরেছে এই লোক,
তাহার তরে মিথ্যা করা শোক,
কিন্তু যখন বলে জীবন্ত
সেটা শোনায় তিতো।
এবং এমনই নোংরারকমের তিতো শোনায় যে কবি স্বয়ং পুস্তকাকারে ছাপার সময় এ লাইন কটি বাদ দেন। সে-কথা থাক্। আন্তর্জাতিক আইন শব্দদুটো শুনলেই আমার তেতো হাসি পায়। বড়ম্বরপূর্ণ স্ফীতোদর-এর ধারাগুলো নির্মিত হওয়ার বহু আগের থেকেই হোমরাচোমরা রাষ্ট্রগুলো সেগুলো তো ভেঙেছেই, নির্মিত হব-হচ্ছি হব-হচ্ছি। যখন করছে, তখনও এগুলো মদমত্ত উদ্ধত পদাঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে বার বার প্রমাণ করেছে এর ভারিক্কি ভারিক্কি ধারা-উপধারা সব পেপার টাইগারস, এগুলোতে বিশ্বাস করার ভান, ভক্তির ভণ্ডামি দেখায়, একমাত্র নপুংসক, পদলেহী, গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল কতগুলো রাজনৈতিক যারা আপন আপন দেশের জনসাধারণের স্বীকৃতি না পেয়ে ওইসব অস্তিত্বহীন আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দিয়ে অনেকটা নেই-ভূত খেদানেওলা ওঝার আগড়ম-বাগড়ম বিড়বিড় করে ইউনাইটেড নেশন্সের পবিত্র জর্ডনজলে বাপ্তিস্ম হয়ে আপন আপন দেশে ফিরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট, ডিকটেটররূপে স্বৈরতন্ত্রের অবাধ অত্যাচার-অবিচার চালায়– সুন্দুমাত্র টিকে থাকার জন্য। তাদের জন্য প্রতি মাসের টায় টায় পয়লা তারিখে আসে বন্দুক কামান, রোক্কা #পেয়া তনখা বৃহৎ-বৃহৎ রাষ্ট্রের কাছ থেকে যারা এইসব রাষ্ট্রপ্রধানদের মারফত তাদের দেশগুলোকে শোষণ করে প্রতি মাসের পয়লা তারিখে, বাড়িউলি ও ভাড়াটিনীদের কাছ থেকে এতখানি টায়-টায় তার অতিশয় হক্কের পাওনা অষ্ট-গণ্ডা, ন-সিকে পায় না। পুতুল রাজার পাল আর তাদের মনিব দু দলই প্রতিদিন দুই কায়দায় দুনিয়াটাকে শুনিয়ে দিচ্ছে, আন্তর্জাতিক আইন –ফোঃ! ছোঃ!
শিপ্রা জানালা দিয়ে শূন্যদৃষ্টিতে পার্কের নিরস ঘাসের দিকে তাকিয়ে নির্জীব কণ্ঠে বললে, আমারও সেঁতো, তেতো হাসির সঙ্গে বেরিয়ে আসছে সেই প্রবাদপ্রায় তত্ত্বকথাটি, তোমারই ভূতের মতো উল্টো পা চালিয়ে, কাদম্বিনী বাঁচিয়া প্রমাণ করিতেছে, সে বাঁচে নাই।
কীর্তি বললে, তাই সুর মিলিয়ে গাইতে প্রাণ চায়, মাধবী, বাঁচিবে কি মরিবে কি? দ্বিধা কেন? কিন্তু নিদারুণতম তত্ত্ব, মানুষের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে নিরাশ হতে হয়, শিপ্রা, যখন সেই লোকটির কথা স্মরণে আসে, যার কথা খানকে বলছিলুম। হল্যান্ডের হুগো গ্রটিয়ুস, একাধারে বহুবিষয়ে পণ্ডিত, বিশেষ করে ধর্মশাস্ত্র ও নীতিশাস্ত্রে অর্থাৎ জুরিসপ্রুডেনসে অসাধারণ প্রভাবশালী ব্যক্তিটির সম্বন্ধে কমিয়ে-সমিয়ে বলতে গেলেও আস্ত একটা দিন কেটে যাবে। ভাবো দিকিনি সেই কোন ১৬২৫-এর কাছাকাছি একসময়ে এই লোকটি নির্বাসনে, প্যারিসে প্রকাশ করেন যুদ্ধ ও শান্তিবিষয়ক আইন-কানুন। সেই আমলে লোকটি স্বাধীন মতবাদ প্রচার করার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন স্বদেশে। পাণ্ডিত্যের সঙ্গে তাঁর ছিল আর একটি লুকনো গুণ, যে-সম্বন্ধে কড়া দণ্ডধর জেলার এবং অন্য সর্বজন ছিলেন তিমিরান্ধকারে তাঁর নিপুণ চতুরতা। তাই দুই বছর যেতে না যেতে এটিয়ুস হল্যান্ডের জেল থেকে পালিয়ে, যখন, সে-দেশময় হুঙ্কার উঠেছে, ধরো ধরো পাকড়ো পাকড়ো তারি মাঝখান দিয়ে, নিজস্ব চতুরতা প্রসাদাৎ দিব্য স্বচ্ছন্দে বেরিয়ে প্যারিসে পৌঁছিলেন। ফ্রান্সের রাজা সসম্মানে তাকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে রাখেন। আজও সে-রাজা গুণীজনের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেন।
