শিপ্রা কেমন যেন অজান্তে কীর্তির কোল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার মনে পড়ল, ভট্টাচার্য তার বন্ধু গোস্বামীকে লিখেছিলেন, এবারকার প্যাটার্ন যাই হোক না কেন, সেটা হবে সম্পূর্ণ অচিন্ত্যনীয়। নইলে চোদ্দ বছরের বাচ্চা–? না তো, অভিমন্যুর বয়স কত ছিল? মনে আনতে পারল না শিপ্রা।
কীর্তি যে ছিন্নালিঙ্গন হয়েছে সেটা সে লক্ষই করেনি। গলাতে একটু জোর দিয়ে বলে যেতে লাগল, তোমাকে শক্ত হতে হবে শিপ্রা, এ ছাড়া অন্য গতি নেই। এখন শোনো। আমরা সেই চোদ্দ বছরের ছেলেটিকে মোটরে তুলে নিয়েছিলুম। কথায় কথায় বললে, যেন তেমন বলার মতো কিছু নয়, জাসটু এমনি, কে যেন কাকে খেয়া নৌকোয় বলছিল, ২৫শে ছিল বিষ্যুৎবার–।
শিপ্রা বললে, হ্যাঁ, ২৭শে মুহররম্ ছিল ওইদিন। পরদিন অমাবস্যা। ইসলামি পঞ্জিকা পড়ে পড়ে তার সবকিছু সড়গড় হয়ে গিয়েছিল। এমনকি মুহরর যে শুদ্ধ উচ্চারণ সেটাও শিখেছে ওই পঞ্জিকার মেহেরবানিতে। বললে, পরে বুঝিয়ে দেব।
কীর্তি বললে, শনিবার দিন সকালে ঢাকাতে কারফু ছিল না। এক ভদ্রলোক বেরিয়েছেন তার বন্ধুর সন্ধানে। সে বন্ধু থাকেন যে-পাড়ায় তার পাশের বাজারটা আগের দিন ভোরে হারামিরা পুড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে তার সন্ধান না পেয়ে তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন সেই পোড়া বাজারের একপাশে। এমন সময় একটা ছোট্ট বাচ্চা, মা, মা বলে ডেকে কাঁদতে কাঁদতে রাস্তা পার হতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছে– এমনিতেই সে ভালো করে চলতে শেখেনি তার ওপর দু চোখ জলে ভরে যাওয়াতে কিছুই ঠিক ঠিক দেখতে পারছিল না। রাস্তার ওপার থেকে এক বুড়ি ভাঙা গলায় ডাকছে, ওরে দুলাল, ও দুলু, আয় এদিকে আয়। দেশের স্বাভাবিক অবস্থায় ভদ্রলোক হয়তো কিছুই লক্ষ করতেন না। এখন কিন্তু শুধালেন, কী হয়েছে? বুড়ি, পরশুদিন ওর বাপ রিকশা চালাতে বেরিয়েছিল; এখনও ফেরেনি। রোজ রাতদুপুরে ফেরে। সে-রাতেই তো চাদ্দিকে গোলাগুলি চলল। ভোরের দিকে বাচ্চাটার মা রাস্তা পেরোচ্ছিল জল আনতে, এমন সময় কোত্থেকে একটা মিলিটারি গাড়ি এদিক দিয়ে জোর হাঁকিয়ে যাচ্ছিল। থমকে দাঁড়াল। বউটাকে গোটা তিনেক সেপাই একটানে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে গেল, আমি রাস্তায় পৌঁছতে না পৌঁছতে। দেখলাম গাড়ি বোঝাই অল্পবয়সী অনেকগুলি মেয়েছেলে। মোল্লাজির কাছে গিয়ে কেঁদে পড়লুম– আমার ছেলে-বউয়ের খবর নেবার তরে। তিনি বললেন, মেয়েগুলোকে ছাউনিতে নিয়ে গিয়েছে। ওরা আর ফিরবে না–
শিপ্রা এতক্ষণ কীর্তির মুখোমুখি টান টান খাড়া হয়ে সব শুনছিল। আস্তে আস্তে ডান হাত মুঠো করে, শক্ত– আরও শক্ত চাপ দিতে লাগল। নখগুলো বুঝি তেলোতে ঢুকে যাবে। বাঁ হাত দিয়ে ডান মুঠো জোরে চেপে ধরল। ডাইনে-বাঁয়ে সে অল্প অল্প টাল খেতে শুরু করেছে। মাথাটা একদিকে কাত হয়ে গিয়েছে, মেলে যাওয়া চোখ দৃষ্টিহীন, কীর্তির চোখের মণি ভেদ করে মহাশূন্যে বিলীন। কীর্তি দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি তার কোমর ধরতে গেছে। শিপ্রা তাকে নিরস্ত করে শুধাল, তুমি মনস্থির করেছ তুমি কী করবে?
অতিশয় শান্ত কণ্ঠে কীর্তি বললে, সে তো আমি আগরতলাতেই করেছি, তুমি জানো। তবে হয়তো আমার অজান্তে লারির কুচক্রের ব্যাখ্যান শুনে আমার মন বিরূপ হয়ে বিদ্রোহ করেছিল। এ কী ঔদ্ধত্য! নিরীহ পুব বাঙলার লোককে নিয়ে তোমরা বন্দুকের জোরে যা-খুশি করতে পারো?
শিপ্রার চট করে মনে পড়ল, বহুদিনকার ভুলে যাওয়া একটা ঘটনা। খান তাকে বলেছিল, ওই যে আমার ক্যাবলা শান্ত কীর্তিকান্ত– ওর মতো নিঝঞ্ঝাটে প্যালারাম এ দুনিয়ায় খুঁজতে হলে শকুন্তলার আশ্রমে-ফাশ্রমে যেতে হয়। মাত্র একটিবার একটা ব্যত্যয় ঘটেছিল– কেউ যদি দোসরা একটা বলতে পারে, আমি হাজার টাকা দিতে রাজি। বার আসিয়াতিকের টাকার কুমির মালিক খোট্টা ফোট্টা হবে– খামখা, অন্তত কীর্তির বিশ্বাস, বিলকুল বে-কারণ, খামখা, ঠাস করে চড় মেরেছিল এইটুকুন একটা বয়কে। কীর্তি প্রথমটায় কিছুক্ষণ ধরে চিন্তা করল। তার পর আমাদের কিচ্ছুটি না বলে মালিকের সামনে কী যেন ফিসফিস করল। মাইন্ড ইয়ু–আগাপাশতলা সাদা চোখে। মালিক ব্যাটাও কুল্লে দুনিয়ার মতো জানত, কীর্তিকান্ত সাতিশয় কর্মে ক্লান্ত শান্তশিষ্ট প্রাণী। সেই হল তার ব্যাকরণে ভুল। যেমন গুণ্ডাকে ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করা যায়, তেমনি শান্ত স্বভাবকে বস করতে হয় শান্ত স্বভাব দিয়ে। সে কীর্তির দিকে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে কী যেন একটা বলল। সঙ্গে সঙ্গে কীর্তি ঠাস ঠাস করে মালিককে মারল দুটো চড়। হৈহৈ রৈরৈ। পুলিশ এল। মালিকের বক্তব্য, হোটেল বার-এ যে কোনও ব্যক্তি আইন প্রয়োগ করার ভার আপন স্কন্ধে নিয়ে টেকিং ল ইন হিজ ঔন হ্যান্ড ভায়োলেন্ট অ্যাকশন নেয় তাকে সে বার-থেকে বের করে দিতে পারে। কীর্তির বক্তব্য, বয় যা করে থাকুক না কেন, মালিক আইন প্রয়োগ করার ভার আপন স্কন্ধে নিয়ে ভায়োলেন্ট অ্যাকশন করেছে– প্রথম– কীর্তির আগে। অতএব সে বার ছেড়ে বেরিয়ে যা। কে যেন মাফ চাইবার প্রস্তাব করাতে কীর্তি তাকে লাগায় তাড়া।… শেষটায় মোকদ্দমায় কীর্তির জরিমানা হয়। আর মালিককে জজ ভবিষ্যতে সাবধান হওয়ার জন্য ওয়ার্নিং দেন। পরদিন থেকে কীর্তি তিন বেলা ওই বারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়। এশিয়ান বার-এ কীর্তির প্রবেশ নিষেধ এ হুকুম আদালত দেননি। হনুমান লঙ্কায় ন্যাজ পুড়িয়েছিলেন বলে তাকে কি আর ফিসে সেখানে যেতে দেওয়া হয়নি? কীর্তি মালিকের ওপর কড়া চোখ রাখে, আর মাঝে মাঝে নোটবুকে কী সব টোকে। মালিকের প্রাণ অতিষ্ঠ। তার শেষ আশা, কীর্তি এ কর্ম কতদিন চালাবে? ধৈর্যেরও তো একটা সীমা আছে। উঁহু। ঠিক উল্টো। প্র্যাকটিসের ফলে অভ্যাস। অভ্যাস হয়ে যাওয়ায় সে তিন বেলার ম্যাদ আরও বাড়াতে লাগল। মালিক বেয়ারা বয়কে ভালো করে শাসন করতে পারে না, মালিক চোখ রাঙালেই দেয়ালঘড়ি থেকে টাইমটা নোটবুকে কীর্তি টুকে নেয়– চড় মারার বাসনা মালিকের মাথায় উঠেছে। চাকরবাকরের পোয়াবারো। তাদের শাসন করলেই তারা এক ঝলক কীর্তির দিকে তাকায়। কীর্তি নোটবুক খোলে।… শেষটায় মালিকই হার মানল। মাফটাফ কী যেন, মনে নেই।
