আর ভুলো না গোসাঁই, হিটলার যুদ্ধজীবী ছিল না। তার উভয় কুল অসামরিক। সে নিজে চিত্রকর। এখানে ইয়েহিয়া, তার মন্ত্রণাদাতা, তার আদেশ বহনকারী সর্বভূতে আছে মাত্র একটি ভূত– তেজস, অগ্নি, রণাগ্নি। এদের প্রত্যেককে তুমি ফৌজাবতার নাম দিতে পারো। এমনকি ইয়েহিয়া হারেমের রানি, প্রধান রক্ষিতার জনসমাজে প্রচলিত আদুরে নাম জেনারেল রানি।
অতএব, যদিস্যাৎ কলমের খোঁচায় সমস্যার সমাধান না হয় তবে বিকল্পে কী হবে? সবাই ভাবছে সনাতন সঙ্গিনের খোঁচা। না। আমাদের সুদূর এই পাহাড়পুরেও খবর পৌঁছে গেছে ঢাকাতে কী পরিমাণ ট্যাঙ্ক জড়ো হচ্ছে এবং হবে। এবারকার প্যাটার্নে হিটলারের কীর্তিকে ইয়েহিয়ার বিস্ফোরক-চূর্ণ-ধূম্রে ম্লান করে দেবে, অষ্টাঙ্গ আচ্ছাদিত করে সম্পূর্ণ অদৃশ্য করে দেবে। ঈশ্বরের অভিসম্পাতে যদি এই বিকল্পই সাধিত হয়– আমি সন্ধ্যাহ্নিকের পর প্রতি রাত্রে আমাদের গুরু পির শাহজালালকে নতজানু হয়ে স্মরণ করিয়ে দিই, তিনি তার মাতৃভূমি আরব-ইয়েমেন ত্যাগ করে যেখানে এসে মুক্তিলাভ করলেন সে-দেশকে একমাত্র তিনিই রক্ষা করতে পারেন তবে আমি যে অনিশ্চিত আশ্রয়ের সন্ধানে যাচ্ছি, সেখানে হয়তো নিষ্কৃতি পাব না। তথাপি আমি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশা ছাড়ব না, সুদিনের প্রতীক্ষায় দিন গুনব।
মহাত্মাজি পদ্ধতিতে যদি দেশের মনস্কামনা পূর্ণ হয় তবে সোঁদরী কাঠের লাঠি বেকার!
বিকল্পে হিটলার পদ্ধতির ট্যাঙ্ক-কামানের সামনে সোঁদরী কাঠের লাঠি বেফায়দা।
তুমি, তোমার পিতা গোস্বামী সমাজের উজ্জ্বল নীলমণির পুত্র এবং শিষ্য। আমি জানি, তাই তুমি ওপারে যাবার জন্য নিত্যনিয়ত প্রস্তুত; এখন এপারে থাকার জন্য প্রস্তুত হও।
আমার শেষ অনুরোধ—
চিঠিটি অসমাপ্ত। বিস্তর দারুণ ইনটারেসটিং বইয়ের শেষ কখানা পাতা ছিল না বলে বালিকা শিপ্রা কতবারই না নিষ্ফল আক্রোশে গর্জন করেছে। প্লটটা কী সুন্দর সাজানো, ঘটনার ঘাতপ্রতিঘাত কী অদ্ভুত অথচ বাস্তব, চরিত্রগুলো রহস্যের কুহেলিকাচ্ছন্ন সত্ত্বেও পাত্র-পাত্রী সুস্পষ্ট পাতা কটির অভাবে অকস্মাৎ সবাই একসঙ্গে কর্পূর হয়ে গেল। কত কাল চলে গেল তার পর। এখন আর সে-অনুভূতির উদয় হয় না। মসিয়য়া পোওয়ারো বা দি সেন্ট অসমাপ্ত রেখেই, ফরাসি কায়দায় কাঁধে শ্রাগ্-এর সামান্য ছোঁওয়া লাগিয়ে বিলিয়ে দেয়।
জাল আবার এল সেই প্রাচীন দিনের অনুভূমি। অসমাপ্তির নিবিড়ঘন নৈরাশ্য– আক্রোশ দূরে থাক, ক্ষোভেরও শেষ রেশ সে-নৈরাশ্যে ঠাই পায়নি। যে লোকটি প্রতি শব্দে, প্রতি ছত্রে, প্রতি দরদি কথায় শিপ্রার চোখের সামনে জাজ্বল্যমান হয়ে স্বপ্রকাশ করতে করতে তার সম্পূর্ণ আপন-প্রিয় হয়ে গিয়েছিল সে হঠাৎ কোন অদৃশ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। এ যে মরণেরও অধিক মরণ। এ বড় অন্যায়, কঠিন অবিচার।… বিলকিসও এই আকস্মিক অসমাপ্তির ওপর কোনও মন্তব্য করেনি।…আজ কোথায় এই জনপদ স্পষ্টবক্তা, সত্যদ্রষ্টা! হঠাৎ শিপ্রার সর্বাঙ্গ ভয়ে শিউরে উঠল। হিটলারের আগমন ও ফলস্বরূপ শাশ্বত রাষ্ট্রাদৰ্শবৈরী শ্মশান-ধূম্রে গঠিত পৈশাচিক তৃতীয় রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন শিপ্রা জয়ী ভটচাযের মতো সামান্য যে কটি জর্মন বিধিদত্ত দিব্যদৃষ্টি দ্বারা দেখতে পেয়েছিলেন তাদের প্রায় সবাই প্রাণ দেন সূক্ষ্ম দৃঢ় তারে ঝুলতে ঝুলতে ক্রমে ক্রমে নিরুদ্ধ নিশ্বাস হতে হতে। কসাই যে রকম হুক-এ ঝুলিয়ে রাখে শূকর বাছুরের মৃতদেহ, এদের নগ্ন শবও হিমঘরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল দিনের পর দিন শত্রু-মিত্র সর্বজনের দর্শন ও শিক্ষা-দানার্থে।
প্রক্রিয়ার পূর্ণ ফিলম্ হিটলার প্রতি রাত্রে ডিনারের পর সবান্ধব আদ্যন্ত দেখতেন, আপন প্রাইভেট সিনেমা হলে।
.
১০.
নির্জীব কণ্ঠে কীর্তি বললে, শুনেছ, শিপ্রা?
শিপ্রা উঠে গিয়ে কীর্তির দু জানুর উপর কোলে বসে ডান হাত দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে, বাঁ হাত দিয়ে তার মাথা বুলোতে বুলাতে বললে, কিছু কিছু শুনেছি বইকি? আজকাল বিদেশি বেতারগুলো– কাপুরুষ, মিন, ইতর, কী গাল দেব ভেবে পাইনে,- একটু একটু সাহস সঞ্চয় করতে আরম্ভ করেছে। কিন্তু তোমার মুখে শোনা সে তো ভিন্ন–
দীর্ঘশ্বাস ফেলে কীর্তি বললে, শুনে কোনও আনন্দ পাবে না। সব খবরই দুঃখের। একটিমাত্র খবর আমাকে এই নৈরাশ্যের মধ্যে মাঝে মাঝে আশার আলোক দেখায়। সুন্দরবনের পাশ থেকে হাসনাবাদ, যশোর হয়ে সীমান্তের যতখানি কাছে যেতে দেয়– গিয়েছি ভগবানগোলা, পদ্মার ওপারে পুব বাঙলার সারদা পুলিশ কলেজ, আইয়ুব ক্যাডেট কলেজ- দুটো জায়গাতেই হারামিরা হানা দিয়ে পুলিশকে খুন করেছে। ভাগ্যিস, ক্যাডেট কলেজের বাঙালি প্রিনসিপ্যালে ঝাণ্ডু ঝাণ্ড পলিটিশিয়ানদের বহু পূর্বেই অশথ গাছের মগডালের কাঁপন থেকেই কালবৈশাখীর পূর্বাভাস ঠিক ঠিক ধরে ফেলেছিল বলে মিঞাজি ছেলেদের আপন আপন বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। এই বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরাই হারামিদের চার নম্বরি শিকার–
চার নম্বরি মানে?
অস্ত্র ব্যবহার যারা জানে, তারা ওদের শিকার। পয়লা নম্বর, বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি– এরাই ৬৫-র যুদ্ধে লাহোর বাঁচিয়েছিল এবং যত সব বড়ফাট্টাই করনেওলা পাঞ্জাবি পাঠান বলে তারা রণবীর, যোদ্ধার জাত, মার্শাল রেস, এদের সব্বাইকে ঢিড দিয়ে পেয়েছিল সবচেয়ে বেশি মেডল আর ডেকোরেশন। তার প্রতিদান স্বরূপ এইসব প্রাণরক্ষকদের যেখানে মেডলের ঝোলে সেখানে ঢুকিয়েছে বজ্র-বুলেট, ইয়েহিয়া মেডল– আইয়ুব মেডলের জায়গায়। দুই নম্বর : ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস্ এরা সশস্ত্র পুলিশ। রাইফেল চালাতে জানে, ব্যস। তিন নম্বর : সাধারণ পুলিশ, যাদের কেউ কেউ একটু-আধটু বন্দুক চালাতে পারে। এগুলোর কথা আমরা আগেই শুনেছিলুম। এবার এসেছে চার নম্বর : যে-কটি ক্যাডেট পুব বাঙলায় আছে তাদের ছাত্র এবং প্রাক্তন ছাত্র এরাও কিছুটা রাইফেল চালাতে জানে। এদের বেশকিছু ছেলে–কত আর বয়েস হবে, ষোল-সতেরো– পদ্মা পেরিয়ে মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে এসে এখানে ওখানে জড়ো হয়েছে। একটি ছেলে– কী বলব, শিপ্রা, সে কী লাবণ্যভরা মুখ, আর সর্বক্ষণ চোখে মুখে হাসি লেগেই আছে, আমার কান্না পেল, বয়স তার চোদ্দ হয় কি না হয়!
