বোন শিপ্রা, বুঝতেই পারছ, এটা আমার ভাষা নয়। আমাদের পাশের গায়ের এক সরল গোসাঁইজিকে সেই দেশত্যাগী ভট্টাচার্য যাত্রাকালে একখানা চিঠি লেখেন। বেচারী গোসাঁই সেই চিঠি তোমার জামাইবাবুকে কাঁদতে কাঁদতে পড়ে শোনান।
সর্বশেষে ভশচায ইতোপূর্বেই যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সেইটেই যেন প্রাণখুলে লিখেছেন, যেন গৌর গোসাঁইয়ের নরম বুকটি খান খান করার জন্য কিংবা যাবার বেলা সেটাতে হিম্মত ভরে দেবার জন্য। লিখেছেন, এক দরবেশ একদা আমায় বললে, খুদা-পাক্ সব শহরে এবং প্রতিটি জনপদখণ্ডে চার চারজন করে সাধুপুরুষ কুতুব (মিনার) বা স্তম্ভ রাখেন। সে দেশ, সে জনপদ তাদেরই দৃঢ়াত্মার ওপর নির্মিত। এ অঞ্চলে তুমি একজন, তোমার পিতা ছিলেন আর একজন। এঁরা স্বেচ্ছায় কদাচ, কুত্রাপি দেশত্যাগ করেন না। ভুবনেশ্বরের দৈবাদেশে যদি মাত্র একজনও দেশত্যাগ করেন তবে সে-দেশ, সে অঞ্চলের জনপ্রাণী কীটপতঙ্গ পর্যন্ত সমূলে বিনষ্ট হয়– সমূলস্তু বিনশ্যতি, মহতী বিনষ্টি–অন্য তিন মহাত্মা কুত্ত্বসহ। তুমি জানো– তোমাকে আর কী শেখাব সম্পূর্ণ গ্রাম যদিস্যাৎ খাণ্ডবদহনে ভস্মীভূত হয় তবে সর্বজনপূজ্য মহাকাল মন্দিরও নিষ্কৃতি পান না। দরবেশ ফারসিতে বলেছিলেন :
দাবানল যবে জনপদভূমি
দগ্ধদহনে দহে
কিবা মসজিদ, কবরসৌধ
প্রভেদ কিছু না সহে।
তুমি, গৌর, এ অঞ্চল ছাড়লে এর সর্বনাশ হবে।
তাই যাত্রারম্ভে তোমাকে সে-প্রস্তাব দিইনি।
গুরু সাক্ষী, তোমার আখড়া সাক্ষী, তার রাধামাধব বিগ্রহ সাক্ষী, আমি কস্মিনকালেও ভবিষ্যদ্বাণী করিনি। তবু একটা কথা বলে যাই, দীর্ঘ চব্বিশ বৎসর ধরে আমি নিরবচ্ছিন্ন পূর্ব পাকিস্তানে বাস করেছি, তার দৈনন্দিন পরিবর্তন, ক্রমবিকাশ, পতন-অভ্যুদয় সাগ্রহে লক্ষ করেছি। এরই ওপর নির্ভর করে আমার ভবিষ্যৎ দর্শন গণনা। এর সঙ্গে গণৎকারের ফলিত জ্যোতিষ গণনা পদ্ধতির কণামাত্র সাদৃশ্য সামঞ্জস্য তো নেই-ই, অপিচ ফলিত জ্যোতিষীর বাক্যাড়ম্বরসহ ভ্রান্তিমুক্ত ভবিষ্যদ্বাণী প্রচার করার মতো কোনওপ্রকারেরই শাস্রাধিকার আমার নেই।
জনসাধারণের বিশ্বাস, ঢাকার দরকষাকষি নিষ্ফল হলে পুব পাক রাজনীতি সেই প্রাচীন ধারা বেয়েই চলবে, হয়তো ঈষৎ দ্রুততর বেগে। সঙ্গে সঙ্গে দমন-নীতিও তার ধারা বেয়ে চলবে, হয়তো ঈষৎ উদ্দামতর বেগে, রূঢ়তর পরিমাণে। মোদ্দা কথা প্যাটার্নের পরিবর্তন হবে না।
সেখানে আমার বক্তব্য, না, অবশ্যই হবে।
প্রথম সম্ভাবনা : কলমের এক খোঁচাতে পুব পা যে ধরনের স্বায়ত্তশাসন চায় সেইটে রাতারাতি পেয়ে যাবে। এটা কিছু অভিনব ইন্দ্রজাল নয়। খুদ পাকিস্তানের জন্ম ও স্বাধীনতা কলমের এক খোঁচাতেই হয়েছিল। সে উদ্দেশ্যে কজন লোক, কী স্বার্থত্যাগ করেছে, শুনি? কজন নেতা কারাবরণ নির্বাসন গমন করেছিলেন বলতে পারো? এক সিলেটি খালাসি তার সরল ভাষায় বলেছিল, স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তান অর্জন করলেন জিন্না সাহেব তার পাতলুনের ভাঁজ–ক্রিজ সমুচা চো রেখেই, ফাইভ ফিফটি ফাইভ ফুঁকতে ফুঁকতে। তিনি যদি গাঁধী নেহরুর মতো জেলে-ফেলে যেতেন তবে গোটা হিন্দুস্তানটাই তার কজাতে এসে যেত। অন্তত একথা তো সত্য যে, ইংরেজ অকস্মাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে পাক রাষ্ট্র নির্মাণে সম্মতি দিল তখন হবু পাক নেতারা রীতিমতো সংবিৎ হারিয়ে ফেলেছিলেন।… তার পর গেল তেইশ বৎসরের মধ্যে কলমের এক খোঁচাতে কী রত্তিপরিমাণ স্বাধিকার অর্জন করতে পেরেছে? সে প্যাটার্ন সম্পূর্ণ ভিন্ন। অবশ্য বলতে পারো, সেটা ১৯৪৭-এর প্যাটার্ন। তাই সই। আমার প্রতিপাদ্য ছিল গত তেইশ বৎসরের প্রচলিত প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি আর হবে না। ইয়েহিয়ার কলমের এক খোঁচাতেই যদি স্বায়ত্তশাসন ভূমিষ্ঠ হয় এবং এ তথ্য সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য যে মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাঁর সে সদিচ্ছাই ছিল- তবে আর যা বল, আর যা কও সোঁদরী কাষ্ঠের লাঠি আপাদমস্তক নিষ্প্রয়োজন। আমার ইয়ার মৌলবি সাহেবের জবানে, বিলকুল বেকার, বেফায়দা ফজুল! এটা বললুম, নিতান্ত কথাপ্রসঙ্গে।
বিকল্পে যদি তা না হয়, তবে ঈশ্বর রক্ষতু। তখন যে দমননীতির বজ্রপাত হবে সেটাও সেই মান্ধাতার আমলি টিয়ার গ্যাস ছেড়ে হেথা হোথা বন্দুকের গণ্ডা কয়েক ফাঁকা আওয়াজ মেরে, দু দশ জনকে শহীদ পর্যায়ে উত্তোলন করে পুনরায় সেই প্রাচীন প্যাটার্নের অনুকরণ করবে না। (খুদাতালার দোহাই, এঁরা আমার নিত্যপ্ৰাতঃস্মরণীয়) এটা হবে সম্পূর্ণ অভিনব, অভূতপূর্ব, অবিশ্বাস্য, অতুলনীয়। যদিও-বা কলমের এক খোঁচায় স্বরাজ দানের উদাহরণ আমাদের কারও কারওর স্মরণ থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়নি, কিন্তু এই সিলেটে তথা পূর্ববঙ্গে দমননীতির চরমতম বীভৎস বিভীষিকার প্রকাশ তো আমাদের স্মৃতি মন্থনে প্রভাসিত হচ্ছে না। অম্মদেশীয় সাতিশয় নগণ্য সংখ্যক দু একজন মাত্র জানেন যে আমাদের সমসাময়িক কালেই বহু দূরের এক সভ্য দেশে অভূতপূর্ব এক নবীন প্যাটার্ন বুনেছিলেন বহু, বিচিত্র প্যাটার্নের সৃষ্টিতে পরিপূর্ণ ইতিহাসের এক অত্যুভূত অলিম্পন ডিকটেটর হিটলার। কজন জর্মন কল্পনা করতে পেরেছিল যে লুথার, কান্ট, গ্যোটে, বেটোফেনের মতো চিন্তাশীল, রুচিবান দেশে হঠাৎ এমন এক সৃষ্টিছাড়া কিং-নর আবির্ভূত হয়ে মাতৃভূমির সর্ব ঐতিহ্য সর্বসাধনার ধন লণ্ডভণ্ড করে এমন এক নৃশংস নিপীড়ন, সর্বব্যাপী নিধনযজ্ঞ প্রজ্বলিত করবে যে তার তুলনার জন্য মানুষকে এ যুগ ছেড়ে যেতে হবে চেঙ্গিস-আর্টিলার সন্ধানে
