এখানকার অবস্থা এমনই অস্বাভাবিক যে চিঠিটা এক হিন্দু ভদ্রলোক মারফত ভারতে পাঠালুম। ভদ্রলোক সেই পার্টিশনের সময় থেকে সবরকমের ঝড়ঝঞ্ঝা সয়েছেন, কিছুতেই দেশত্যাগ করতে রাজি হননি। কাল হঠাৎ এসে আমার মেয়েকে বললেন, তাকেও শেষ পর্যন্ত ভিটের মায়া ত্যাগ করতে হল। মেয়ে আশ্চর্য হল, কারণ আমাদের অনেকেই তো এখনও পুরো আশা ধরে আছেন, লীগ আর ইয়েহিয়াতে সমঝোতা হওয়া খুবই সম্ভবপর। অথচ একাধিকবার যখন হিন্দুদের চতুর্দিকে ঘোরঘুট্টি অন্ধকার, প্রায় সবাই পালাচ্ছে তখনও তিনি প্রতি সন্ধ্যায় এখানে এসে বৈঠকখানায় তোমার জামাইবাবুর সঙ্গে দাবা খেলে গেছেন। উপস্থিত হিন্দুদের ভিতর বিশেষ কোনও চাঞ্চল্য নেই, তবু তিনি বেবিকে বললেন, এতদিন বাইরের গুণ্ডা এসেছে মারপিট লুঠতরাজ করতে, তার হিন্দু-মুসলমান প্রতিবেশী, ইয়ার দোস্তের সাহায্যে তিনি তাদের ঠেকিয়েছেন। এবারে তাঁর স্থির বিশ্বাস স্বয়ং সরকার আসবে বেহদ্দ জুলুম করতে। জুলুম করতে আসে যে-সরকার তার জাত নেই, ধর্ম নেই। মুসলমান-হিন্দু কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারবে না। বেবি তার ইঙ্গিতের কিছুটা ধরতে পেরে ভয় পেয়ে শুধাল, মুসলমানদের উপরও জুলুম চলবে নাকি? তিনি ভালো-মন্দ কোনও উত্তর না দিয়ে বেবির হাতে চন্দনকাঠের একগাছি মালা দিয়ে চলে গেলেন। ভশচায় মশাই করিমগঞ্জ হয়ে কোথায় যাবেন সেটা এখনও স্থির করতে পারেননি। দাদার বন্ধু শ্ৰীযুত দেশরঞ্জন চক্রবর্তী, করিমগঞ্জ, কাছাড়, ঠিকানায় উত্তর দিয়ে। ভশচাষ আমাদেরই মতো সাদামাটা মানুষ; তাঁর দিব্যদৃষ্টি আছে এরকম কোনও খবর বা গুজব আমার কানে কখনও পৌঁছয়নি, ভবিষ্যদ্বাণী করতেও শুনিনি। তাই তার দেশত্যাগ শুধু বেদনা দিচ্ছে। এর মধ্যে আশা বা নিরাশার কোনও আভাসই নেই।
বাইরে যথেষ্ট। মিনিটে মিনিটে রকমারি খবর গুজব এখানে পৌঁছাচ্ছে আমাদের এই অজ পাড়াগাঁয়ে পর্যন্ত। কোনটা সুখবর, কোনটা দুঃসংবাদ সেটা পর্যন্ত সবসময় বোঝা যায় না কারণ তারই ফল আখেরে কী হবে, কেউ অনুমান করতে পারে না। সর্বোপরি বেবি আর তার বেতার। ঢাকা বলে এক কথা, পিন্ডি বলে উল্টোটা, লন্ডন মনস্থির করতে পারে না। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলুম, ইন্ডিয়া ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে কি? কলকাতা শুনে তো মনে হয় না। কিন্তু কে জানে? হয়তো দিল্লিই জানে সবচেয়ে বেশি কিন্তু উচ্চবাচ্য করাটা সময়োপযোগী বলে মনে করছে না।
চুপ করে শিপ্রা ভাবতে লাগল– বাকি চিঠি পড়া স্থগিত রেখে। একরাশ চিন্তা একটা আরেকটাকে ঠেলে ফেলে কোনওটাই তার শেষ সীমানা অবধি পৌঁছয় না। শুধু একটু বেদনাবোধ তার হৃদয়-মনের গভীর অতলে বসে আছে। তার কোনও পরিবর্তন নেই। ওয়ান জার্ট কার্ট থিংক ইট আউট– বহুকাল ধরে সে জানে বিকিদিদের পক্ষে দেশত্যাগ করে কলকাতা চলে আসাটা সম্পূর্ণ অসম্ভব। কতকাল হয়ে গেল, কতবার সে অনুরোধ করেছে একবার দেশ থেকে বেরিয়ে আসতে– দু দশ দিনের জন্য। সে নিজে যাবে স্থির করার সঙ্গে সঙ্গে যাওয়াটা হয়ে গেল বটে কিন্তু সেটা পাহাড়পুর নয়, সেটা স্কটল্যান্ডের পাহাড়পর্বত, নদী হ্রদ। তার পর দীর্ঘ নীরবতা। আলস্য, জড়ত্ব।
আবার চিঠিখানা পড়তে আরম্ভ করল, অন্য এক জায়গা থেকে। লিখছে, প্রকৃত বিশ্বাসযোগ্য দেশের খবর দেবার মতো কিছুই নেই। সব পরস্পরবিরোধী। এবং সবচেয়ে মারাত্মক যে পাপ বিষ প্রত্যেকের দেহমনকে আচ্ছন্ন করে তাকে নির্জীব, ক্লীব করে দিচ্ছে সেটা ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা। কেউ জানে না, কার কপালে কী আছে? কোনও সন্দেহ নেই, এখন, এই মুহূর্তে দেশের পনেরো আনা লোক– মেয়েছেলেরাও পিছিয়ে নেই–লীগপন্থি। সত্য বটে এরকম সর্বব্যাপী আন্দোলন আমি ইতোপূর্বে আর কখনও দেখিনি। তবু মনে ভয় জাগে- একাধারে ভাবালুতার উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে উদ্বিগ্ন জড়ত্ব– এ দুটোর ভিতর জিতবে কোনটা যদি কখনও পরীক্ষা আসে।
শেষ কথা। বেশিরভাগ লোকের বিশ্বাস, লীগ-ইয়েহিয়াতে যদি সমঝোতা না হয় তবে পূর্ববঙ্গবাসী যে আন্দোলন আরম্ভ করবে এবং সেটাকে আয়ত্তে আনার জন্য জুন্টা যে দমননীতি প্রবর্তন করবে তার আন্দোলনটা সেই স্বদেশী যুগ থেকে আরম্ভ করে যে-ধারা বয়ে ইয়েহিয়াতে এসে পৌঁছেছে সেই সনাতন ধারা বয়েই চলবে, সেই প্যাটার্নই যুগধর্মের বর্ণে রঞ্জিত হয়ে স্বপ্রকাশ হবে মাঝে মাঝে কখনও-বা ভাষার জন্য, কখনও-বা ইউনিভার্সিটির উচ্ছলতার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে কয়েকটি নিষ্পাপ যুবক আত্মাহুতি দিয়ে শহীদ হবে; এবং ইয়েহিয়ার দমননীতিও সেই আলিপুর মামলার ফলস্বরূপ কয়েকটা দ্বীপান্তর ধরনের শাস্তি, জনতা ছত্রভঙ্গ করার জন্য টিয়ার গ্যাস, হাঙ্গার স্ট্রাইকের সময় রবারের নল দিয়ে জোর করে গেলানো, কখনও-বা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ, গোপনে গোপনে কিছুটা উৎপীড়ন– এই প্রাচীন রাজকীয় পন্থাই অবলম্বন করবে এবং সঙ্গে সঙ্গে সে-পন্থার সমান্তরাল হয়ে চলবে সেই সনাতন তোষণ-নীতি মোমেন খানদের সংখ্যা বাড়ানো হবে অকাতরে, স্পাই পোষা হবে অগণিত এবং অধুনা যে ছাত্র-আন্দোলন দ্রুতবেগে উগ্র হতে রুদ্রতর রূপ ধারণ করছে সেটাকে করায়ত্ত করার জন্য বিস্তর ছাত্র-স্পাইকে অকৃপণ হস্তে বিতরণ করা হবে দেদার কাঁচা টাকা, মাসিক মাইনে, তাদের ককটেল পার্টির জন্য কাপ্তাই ড্যামাবদ্ধ পরিমাণ নিষিদ্ধ পানীয় এবং সমান্তরাল পন্থায় সঙ্গে সঙ্গে সানন্দে সসম্মানে এগিয়ে যাবে এতাবৎ সরকার কর্তৃক পদদলিত, সমাজ কর্তৃক লাঞ্ছিত ভাড়াটে গুণ্ডার পাল– যেসব ভ্ৰষ্টমতি, দুষ্টবুদ্ধি, রাষ্ট্রদ্রোহী, পঞ্চনদবৈরী সম্প্রদায় সরকারের মেহেরবানি কদরদানি তাচ্ছিল্যভরে উপেক্ষা করে সদাশয় সরকারের প্যারাদের বদনমণ্ডলে আপন গণ্ডদ্বয় পূর্ণ নিষ্ঠীবন বিচ্ছুরিত করে লাঞ্ছিত করেছে তাদের পৃষ্ঠস্কন্ধমস্তকে সরকারি ফরমান মাফিক লগুড়াঘাত করতে করতে।
