লাউঞ্জে শিপ্রাদের সামনে দাঁড়িয়ে এবারে বাক্য সম্পূর্ণ করে বললে, যত-সব পেঁচি মাতালদের পাল্লায় পড়ে আমার চরিত্রটা ঝরঝরে হয়ে গেল!
জিমি এখন শিপ্রার প্রটেজে। জিমির ইংরেজি ব্ল্যাশুয়া হোক, আর নাই থোক, তার বাংলাটা খাজা ব্ল্যাশ মার্কা। শিপ্রা প্রথম তাকে বুঝিয়ে বললে, পাড় মাতাল অর্থাৎ কনফার্মড বুজার, আর পেঁচি মাতাল মানে, যারা আধ ফোঁটা গিলতে না গিলতেই ঘরের ভিতর আটটা পাঁচিল দেখতে পায়। তার পর খানকে শুধাল, পেঁচির সহবতে দুশ্চরিত্র হলে কোন অলৌকিক অধ্যবসায় এবং ইন্দ্রজাল-ভানুমতীর সমন্বয়ে।
খান হাহাকার সহকারে বললে, হায় হায়, এই সামান্য তত্ত্বটুকু পর্যন্ত জানো না, সুন্দরী। তাই বলছ ভানুমতীর খেল। ওই যে আমাদের পাড়স্য পাড় কেষনগরের ব্যারিস্টার গোসাঁই, তাকে লন্ডনে পুলিশ ধরে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে। অপরাধ? রাস্তায় মাতলামো করেছে রাত দুটো অবধি। পুলিশ যা প্রমাণপত্র পেশ করলে তার সামনে হাকিমের মনে কোনও সন্দেহের অবকাশ রইল না, ব্যাটা পাড়। তবু জানো তো, ব্রিটিশ জাস্টিস, অপরাধের পুরো বয়ান শোনার পর তবে তো স্থির করবে, দণ্ডটা গুরু না লঘু হবে। আসামিকে শুধালেন, এমন কি কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছিল, এমন কি কোনও বিপাকে পড়েছিলে যে ফলে বেহেড মাতলামোটা করলে?
গোসাঁই চিঁ চিঁ করে করুণ কণ্ঠে বললে, আমি দুজন অসচ্চরিত্র লোকের পাল্লায় পড়েছিলুম, ধর্মাবতার, ইওর অনার।
জজ উৎসাহ দিয়ে বললেন, খুলে কও।
গোসাঁই অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে, মি লাট, আমার সঙ্গী-দুটো যে এতখানি দুশ্চরিত্র জানা থাকলে আমি কস্মিনকালেও ওদের ছায়া পর্যন্ত মাড়াতুম না। দুই শয়ারই- বেগ পার্ডন, স্যর টি টি, টী টোটেলার। মদ্যস্পর্শটা মুসলমানদের চেয়েও হারাম বলে বিশ্বাস করে। ক্রিসমাস, আপন আপন জন্মদিনে পর্যন্ত মদ্যপান করে না।
প্রহেলিকাচ্ছন্ন দ্বিধাভরা কণ্ঠে জজ ফের বললেন, আরও খুলে কও।
আর ছিল, হুজর, একটা পুরো মেগনাম সাইজের হুইস্কির বোতল খাঁটি স্কচ, ছিপি পর্যন্ত খোলা হয়নি। সেই সমস্ত বোতলটা আমাকে একাই খতম করতে হল, পাষণ্ডেরা কিছুতেই হিস্যে নিল না। মেগনাম বোতলে নেশা হবে না তো কী হবে? ওই দুটো লোককে দুশ্চরিত্র বলব না তো কী বলব, কুসঙ্গ বলব—
কলকাতার স্মাট সেট-এর কায়দা-কেতা প্রটোকল-বাঁধা। কোন অঙ্গের রসিকতায় মুখে ফুটবে একটুখানি স্মিত হাস্যের ক্ষীণাভাস, কোন পর্যায়ের চুটকিলাতে শীতের ফাটা ঠোঁটের চেরা হাসি, মোনালিসা-স্মিতহাস্য করে করে স্তরে স্তরে সর্বশেষ রবীন্দ্রাগ্রজ বড়বাবুর ঠাঠা অট্টহাস্য। শিপ্রা কোনও প্রটোকল কখনও মানেনি, তার হাস্যমাত্রা কী হবে সেটা মেট-এর আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার সঙ্গে তুলনীয়। কিন্তু গাঁইয়া জিমি একহাতে মুখ চেপে অন্য হাতে পেট চেপে দু ভাঁজ হয়ে গিয়েছে।
শিপ্রা বললে, আমো সেই লন্ডনি জজের মতো রহস্যাচ্ছলা হয়ে শুধোই, এস্থলে কথিকাটি কীভাবে প্রযোজ্য।
আরে কও কেনে? আমি সদাই সাথীরূপে রাখি ছটা বিগ হুইস্কি, ছটা ব্রা জিন– তোমাদের এই প্যারা কংগ্রেস সরকারের মেহেরবানিতে এসব সুধা ভারতময় লুকোচুরি খেলে, কটকে রাজরাজমহেন্দ্ৰবরম বা তিরুচিরপল্লী কোনটা ড্রাই, কোনটা ওয়েট, কোনটা সঁতসেঁতে, সেটা আবার হঠাৎ এক লম্ফে বোফ্রাই হয়ে গিয়েছে কবে, তার নেই খবর– মরো গিয়ে সেখানে সুধার অভাবে। অতএব প্রকৃষ্টতম পন্থা ক্যাঙারু পদ্ধতি। আপন থলেতে আপন মাল নিয়ে চলা-ফেরা করা। আজ সঙ্গে ছিল ছটা বড়া জিন্ আর ছিল আন্দেশা, দুনো ইয়ারের তরে বাড়ন্ত হলেই তো সব্বোলাশ নাশ নয় লাশ আখেরে হল সর্বনাশই। ছটার সাড়ে পাঁচটা খেলুম আমি, ইয়ার খেলেন হাফ। চরিত্র নষ্ট হল না আমার, এই পেঁচি মাতালটার পাল্লায় পড়ে? বরঞ্চ গোসাঁইয়ের কপাল ছিল ঢের ভালো, তার প্রলোভন ছিল মাত্র সেই বোতলটা। কাউকে খেতে দেখলে, কিংবা যদি কেউ সঙ্গ দেবে বলে জানা থাকে তবে প্রলোভনটা হয় প্যারাডাইজে সেই প্রথম নর-নারীর মতো নজিরহীন, অভূতপূর্ব লালসাভরা আপেল। এক পেগ আপেল, নো, আই মিন একটা আপেল সেটা হাফাহাফি করে খেয়ে একে অন্যকে উৎসাহিত করল। বাবু কীর্তিনাশ আমাকে সঙ্গ দেবার লোভ দেখিয়ে চাটলেন তার জিন্টা, পেঁচি রাধুনী যে রকম আড়াই ফোঁটা ঝোল চেটোতে নিয়ে দেড় বার চেটে নুনটা পরখ করে নেয়। এখন বল, ভদ্রে শিপ্রা, সম্পূর্ণ মদ্যবর্জিত লোক এবং কীর্তি কে বেশি বিপজ্জনক দুশ্চরিত্র! তবে কি না, একটা সান্ত্বনার কথা, শুধু ওই ছটা জিন পেগ নয়– ছ বোতল স্কচ আর তিন বোতল স্কচ লুট করেছি ওই পাতি স্পাই পাঞ্জাবিটার ঘর থেকে।
ত্রিমূর্তি বাকহারা, স্পন্দনহীন। এলেফেন্টার প্রস্তর ত্রিমূর্তি এদের তুলনায় তখন মুখরিত বাঁচাল।
.
০৯.
পো; আলীগ্রাম
গ্রাম পাহাড়পুর, সিলেট,
২০/৩/৭১
দোয়া পর সমাচার এই,
স্নেহের শিপ্রা বোন–
শিপ্রা যেন বিজলির শক খেল। খামের উপর ছিল ভারতীয় স্ট্যাম্প। ঠিকানাও অচেনা হাতের। অলস অবহেলায় চিঠি খুলেছে, আনমনে পড়তে শুরু করেছে– হঠাৎ বুঝতে পারল এ যে বিলকিসের চিঠি! কত যুগ পরে! চিঠির ডান কোণে তাকালো- হ্যাঁ, সিলেটের ঠিকানা। খামটা তড়িঘড়ি বাস্কেট থেকে তুলে নিল ঠিকই তো দেখেছে। ভারতীয় স্ট্যাম্প। তারিখ বিশ। তখনও তো মানুষ পূর্ব বাঙলা ছেড়ে চলে যেতে আরম্ভ করেনি। পাঁচ সেকেন্ডের ভিতর আগাগোড়া চিঠিটায় চোখ বুলিয়ে ধরে ফেলল জায়গাটা যেখানে তার উত্তর আছে। লিখেছে :
