তাই তো, অবাক হয়ে ভাবল মনে মনে শিপ্রা, তাই তো, খ্রিস্টান-মুসলমান যাদের গোর দেওয়ার রীতি, তারা চায় তাদের হাড়গুলো যেন তাদের বাপ-পিতামোর হাড়ের কাছে স্থান পায়, কালক্রমে ধুলো হয়ে মিশে যায়। হৃদয় দিয়ে যারা এ দেশকে ভালোবেসেছে তাদের পক্ষে এদেশ ত্যাগ না করার বিরুদ্ধে এটা একটা অতিরিক্ত হৃদয়ের যুক্তি।
সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ল, বার্টন না ওপেন্হাইম্ কার লেখাতে সে-যেন পড়েছে, বসরা বন্দর থেকে ভারতাগত জাহাজ যেসব শত সহস্র মুসলমানদের ওষধি-রক্ষিত মৃতদেহ সাত-সমুদ্র পেরিয়ে নিয়ে এসেছে, তাদের বোঝাই করে এগিয়ে চলেছে মরুভূমির এক দিগন্ত থেকে অন্য দিগন্তে বিলীন শত সহস্র উষ্ট্র-গর্দভের কাফেলা পুণ্যভূমি কারবালার দিকে, যেখানে তাদের নেতাজি শহীদ ইমাম হোসেনের রক্তধারা কারবালা-মরুভূমির সহস্রাধিক বৎসরের শুষ্ক বালুকা সিক্ত, রঞ্জিত করেছিল, যেখানে তার অস্থি সমাহিত হয়েছিল তারই নিকটে একই মরুভূমিতে ভারতীয় অস্থি স্থান পাবে বলে, একই ধুলোয় ধূলি হবে বলে।
এবং এরই সঙ্গে তার মনে আরেকটি চিন্তা উদয় হয়ে তার দেহটা যেন বিষিয়ে দিল : জেনারেল ইয়েহিয়া অতিশয় গোঁড়া কট্টর শিয়া, এবং সম্প্রতি জানতে পেরেছে মিস্টার জুলফিকার আলি ভুট্টোও শিয়া– গোপনে গোপনে তিনিও ধর্মান্ধ, তার শিয়া মতবাদ ভিন্ন অন্য সর্ব বর্ণ সর্ব গোত্রের মুসলমানের প্রতি তার প্রতিটি লোমকূপ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ-হলাহলে জর্জরিত।
এবং সে সাম্প্রদায়িকতা এমনই বিশ্বব্যাপী যো বিশ্বং ভুবনমাবিবেশ–যে সে ধর্মান্ধতাকেও পরাস্ত করে ধর্মনিয়ন্ত্রিত পবিত্র মহরম মাসে, পুণ্য শুক্রের দিবসারম্ভে তাদের সর্ব পবিত্রতাকে কলুষিত করে শিয়াদের ধর্মবৈরী সুন্নি মূর্খ পাঠানকে উত্তেজিত নিয়োজিত করে তার ধর্মভ্রাতা পুব বাঙলার সুন্নি মুসলমানকে নিধন করতে, তার বধূভগ্নী কন্যাকে। তাদের শেখানো হয়েছে পূর্ব বাংলার মুসলমান কাফির। ইয়েহিয়া শুধু মদের নেশায় বলতে ভুলে গিয়েছিলেন শিয়ারা সর্ব সুন্নিকে, অতএব পাঠানকেও কাফের মনে করে।
ইয়েহিয়ার পরলোক ইরাকের কারবালায়, ইহলোক শিয়া ইরানে। তিনি ভুলতে পারেন না, ভুলতে চান না যে তার পূর্বপুরুষ কিজিলবা গোষ্ঠী এসেছে ইরান থেকে শুধু ভুলে গেছেন তারা ইরানে এসেছিল মূল মাতৃভূমি সুন্নি তুর্কোমানিস্তান থেকে। ইরানের সঙ্গে তাঁর দোস্তি; পুব বাঙলার সুন্নি তাঁর দুশমন। তার দোস্ত ইরান তাই তাঁর সুন্নী নিধন কর্ম সুসমাপ্ত করার জন্য শানিয়ে দিচ্ছে তার তলওয়ার, সওগাত পাঠাচ্ছে বোমারু বিমান।
হঠাৎ সংবিতে ফিরে এল শিপ্রা। জিমি সম্বন্ধে শেষ কথা তার যা জানার ছিল সেটা জানা হয়ে গিয়েছে। তার আনুগত্য ইংলন্ডে বা কানাডার প্রতি একস্ট্রা টেরিটরিয়াল নয়।
আমাদের মেয়েরা একদা অষ্ট অলঙ্কার দিয়ে প্রসাধন করতেন, ওষ্ঠরঞ্জন ইদানীং বহুস্থলে হোটেলে, ট্রামে-বাসে, থিয়েটারে তাদের একমাত্র অলঙ্কার। পক্ষান্তরে। গোরা রায় অদ্যাপিও অষ্টপদী ব্রেকফাস্ট খায়! তারই এক ঢাউস সংস্করণ বেয়ারা এনে রাখল জিমির সামনে।
শিপ্রা বললে, আজ এই খাও। এতদিন তোমার কর্তব্যের আওতায় না পড়া সত্ত্বেও তুমিই যে আমার খানার তদারকি করতে সে আমি জানি। একটু মৃদু হেসে বললে, আর কলকাতার বাড়িতে খাবে পুইশাকের চচ্চড়ি আর মোচা-ঘন্ট।
কিন্তু আপনি অর্ডার দিলেন কখন?
ওহে জনপদবাসী যুবক, আমি নাগরিকা। আমাদের টেকনিক ভিন্ন। আমার চেয়েও সুচতুরা, বিদগ্ধা নাগরিকার নাম বেয়াত্রিচে। আমাকে তুলে খেতে পারে। এসো কলকাতায়। এই এপ্রিলেই। ওই কথাই রইল– ডান?
ডান! অনার ব্রাইট। ওই কথাই রইল।
শিপ্রা সেন্টিমেন্টাল নয়। শব্দটি ইংরেজিতে স্থানবিশেষে সবসময় প্রশংসনীয় নয়। বাংলায় আমরা বলি ভাবাবেগে গদগদ হওয়া, উচ্ছ্বাসে আত্মহারা হওয়া কিংবা যে-রকম বলা হয়, পড়য়া প্রহ্লাদ যখন বর্ণমালার ক অক্ষরে এলেন, তখন কৃষ্ণ নামের স্মরণে ভাবাবেশে মূৰ্ছিত হয়েছিলেন। শিপ্রার অনুভূতি এস্থলে সে পর্যায়ে নয়। সে দেখতে পেয়েছিল জিমির ভিতর একাধিক চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য যেগুলোকে সাধারণ জন রিসেপ্সনিস্টের মামুলি কর্তব্যবোধ মনে করে তার দিকে আরেকবার ভালো করে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করত না। সব ভালো হোটেলেরই রিসেপসনিস্ট– এমনকি ক্লাব-চ্যাটার বসের সমগোত্রীয় হোটেল-সব হয়তো বলেই ফেলত, ছোকরার উচ্চারণ ট্যাঁশুয়া–চেষ্টা করে গেটের সেবা, কিন্তু সেবাই যে জিমির ধর্ম সেটা যত না বুদ্ধি দিয়ে ততোধিক অনুভূতি দিয়ে হৃদয়ঙ্গম করেছিল শিপ্রা। শিপ্রার সেন্টিমেন্ট আছে, কিন্তু সে সেন্টিমেন্টাল নয় কারণ তার সেন্টিমেন্টের পিছনে অহরহ জাগ্রত থাকে পর্যবেক্ষণশীল অন্তর্দৃষ্টি।
শিপ্রা আর জিমি লাউঞ্জে বসে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় একে অন্যকে যখন চিনে নিচ্ছিল, খান ততক্ষণে ঝপঝপ গোটা পাঁচেক জিন মোকামে পৌঁছিয়ে দিয়েছে, রেস্তোরাঁতে বসে কীর্তি সঙ্গ দিয়েছে বটে কিন্তু সে আধ গেলাসও শেষ করতে পারেনি।
মাইক্রোফোনে প্যাসেঞ্জারদের উদ্দেশে সমন জারি হয়েছে। খান খপ করে কীর্তির গেলাসটা তুলে নিয়ে বট আপ করে বললে, চ, যত সব দুশ্চরিত্র পেঁচি মাতাল!
