খান বললে, আমি সদাই ওয়াটসন। রহস্য সমাধান হয়ে যাওয়ার পরও সে-সমাধানের কৈশলও তার কাছে রহস্যময় থেকে যায়।
কীর্তি বললে, নিয়ে গেলে পুলিশের হুলিয়াতে অন্তত থাকত সম্ভবত পলাতকের হাতে ট্রানজিসটার আছে। তোরই মতো পুলিশ ভাববে, ওই যন্ত্রটি ছাড়া ওর চলবে কী করে? ওদিকে সে সেটা সুটকেসে পুরলে সেটার ওজন বাড়বে। খাদের ঝোঁপঝাড়ে আটকা পড়বে না– তদুপরি পুলিশের অন্যতম শক্তিকরণ চিহ্নও তার হাতে নেই। পুলিশ কিছু বুদ্ধি খাটালে ও সামান্য তৎপর হলেই ওকে ধরতে পারবে সেই উঠনির নিচে। পকেটে যদি কিছু পায় তবে, কম্পাস আর ম্যাপ।
খান বললে, মিঞাকে নিয়ে দুর্ভাবনা করার কিছু নেই। তোকে ফারসি প্রবাদটি তো একাধিকবার বলেছি, আহাম্মুখ দোস্তের চেয়ে আক্কেলওলা দুশমন ভালো। কিন্তু ওই মিঞাটার মতো দুশমন যদি রাঁচির সার্টিফিকেট প্রাপ্ত ইম্বেসাইল হয়, সে সম্বন্ধে প্রবাদ নীরব।
শিপ্রা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলে, এরকম, একটু ভালো, আরও বোকা কত আসবে-যাবে, সে নিয়ে মাথা ঘামালে হবে বর্বরস্য বলক্ষয়– আর তুমি, খান, মাত্র অর্ধ বর্বর। চলো না কলকাতায়, তোমার মতো ধুরন্ধর চোখ না মেলেও দেখতে পাবে মার্কিন, রুশ, চীনা, বিশেষ করে উভয় পাকের চর কভু স্ববেশে কভু-বা ছদ্মবেশে আবজাব করছে।
কীর্তি বললে, তোমাদের সম্মতি থাকলে কালই কলকাতা রওনা হওয়া—
খান আশ্চর্য হয়ে শুধাল, এত ম্যাপ ঘাঁটাঘাঁটির পর ডাউঁকি যাবে না?
কীর্তি শান্ত কণ্ঠে বললে, করিমগঞ্জে যে দু একটি শরণার্থী দেখেছি, সেই প্যাটার্নই। তো ইছামতী থেকে পদ্মা ব্রহ্মপুত্র ডাউঁকি, সর্বত্রই একই রূপে দেখা দেবে।
খান বললে, অ-অ-অ! হাতে হাঁড়ির একটা ভাত টেপা ঝোঁপের দশটা পাখির সমান।
.
০৮.
জিমি!
ইয়েস, ম্যাডাম!
তুমি সত্যি ভেরি ভেরি ব্যাড় বয়।
আমার ড্যাডি, অনুমতি করুন ম্যাডাম, আমাকে এইটুকু হাইট থেকে (হাত দিয়ে দেখিয়ে) এই সত্য বাক্যটি বলেছেন। আমার মনে যেটুকু সন্দেহ ছিল, আজ থেকে সেটা একদম লোপ পেল
ফাজলামো করো না। সেই ভোর চারটে থেকে তোমাকে আমি খুঁজছি। সবাই বলে, তুমি অফ ডিউটি। সো হোয়াট? শেষটায় গৌহাটির পথে তোমার বাড়ি গেলুম। পথে দেখি, সেই জোয়ান বেয়ারাটা, ভ্যাক করে যে কেঁদে ফেলেছিল আমার সামনে, সে ছুটেছে টাটু ঘোড়ার মতো। জিগ্যেস করলুম, লিটু চাই। বললে, তোমার বাড়ি যাচ্ছে, তোমাকে খবর দিতে। সেখানে শুনলুম, ইয়োর বেড হ্যাঁজু নট বি স্লেপ্ট ইন এটোল। আই লাইক দ্যাট! কোথায় ছিলে সমস্ত রাত? আমি তোমার বাপ হলে এতক্ষণে আমার দুই উরুর উপর উপু করে ফেলে, উইদ দি রং সাইড অফ মাই ব্রাশ এমন প্যাদানি দিতুম–
হঠাৎ জিমিকে গৌহাটিতে পেয়ে এমন খুশি যে বহুদিন পরে অনর্গল বকর বকর করে যেতে লাগল।
জিমি সবিনয় বললে– ছোকরাকে এরকম বকাঝকার লাই ইতোপূর্বে কেউ কখনও দেয়নি অ্যান্ড বাই হোয়াট এ ড্রিমল্যান্ড ফেয়ারি! মাদার মেরি তুমি এঁকে সর্ব অমঙ্গল থেকে রক্ষা করো, মা!– ম্যাডাম, আমার ওজন ১৭০ পাউন্ড, তাই এই মাটিতে লম্বা হচ্ছি! আপনি– ছোকরা জীবনে এতখানি স্নেহ ইহজন্মে পায়নি। নইলে এরকম বাঁচালতা তার নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য ঠেকত। বাপের স্নেহ ছিল পুরুষের, পিতার স্নেহ।
চুপ করো। এই চেয়ারটায় বসো তো। তার পর হ্যান্ডব্যাগ খুলে সিল্কে মোড়া একটা কেস বের করল। বলল, খুলে দেখো। তুমি পরো। আর বিয়ের বউয়ের আঙুলে আংটি পরাবে তো, চার্চের ভিতর? বেরিয়ে এসেই এটি তাকে পরিয়ে দেবে- ইফ আই বি অন দি আদার সাইড
ম্যাডাম, প্লিজ!
শোনো। আমি বেঁচে থাকলে অন্য কথা। এখন সিরিয়াস হয়ে শোনো। এটা তোমাকে আমি ফ্রি দিচ্ছি না। আমি প্রতিদান চাই।
জিমি হাত তুলেছে শপথ করতে।
শুনে যাও, প্লিজ। তোমার হেল্প্ আমার দরকার হতে পারে, না, হবেই। হয়তো উইদাউট এনি নোটিস। হয়তো-বা দিতে পারব। তুমি না বললে আই শানট টেক ইট এমিস্ এটোল। সি হোয়াট আই মিন?
প্লিজ, ম্যাডাম। আমাকে মাত্র একটি কথা বলতে দিন। আমার ড্যাডির জীবনের আদর্শ তিনি নিয়েছিলেন কার কাছ থেকে আমি ঠিক জানিনে। বোধ হয় প্রিন্স কনসর্ট এলবার্টের এই মটো ছিল। জর্মনে দুটি শব্দ, ইষ ডিনে (Ich diene) আমি সেবা করি, আমি সেবার জন্য, আই এম হিয়ার টু বি যুজড়। আমিও সেই আদর্শে বিশ্বাস করি।
গুড। আমি তোমাকে এমন কোনও সেবা করতে বলব না, যেটা হীন কিংবা তোমাকে কোনও বিপদে পড়তে হবে। প্রথম সন্ধ্যাতেই আমি বুঝেছিলুম, পরের হিত করে তুমি আনন্দ পাও। তার পর যখন মি. খানের কাছ থেকে শুনলুম, পাঞ্জাবি গুপ্তচরের প্রতি তোমার ঘৃণা, এবং খানকে সবকিছু তুমি বলেছ যাতে করে সে খানের বা অন্য কারওর অনিষ্ট না করতে পারে তখনই– ওয়েল নেভার মাইন্ড– তুমি কবে কলকাতায় আসছ?
আপনি যখনই আদেশ করবেন।
আচ্ছা, তোমাকে শেষ প্রশ্নটা জিগ্যেস করি : তোমার পিতা এবং তুমি বড় হওয়ার পর, তোমার সম্প্রদায়ের আর পাঁচজনের মতো তোমরা ক্যানাডা বা অস্ট্রেলিয়ায় চলে গেলে না কেন?
ড্যাডি ছিলেন অতি এক্সপার্ট বয়লার ইনসপেক্টর। কাজেই তিনি আর পাঁচজনের তুলনায় ঢের ঢের ভালো অফার পেয়েছিলেন। এবং তিনি এটাও জানতেন, তার নিকট আত্মীয়স্বজন প্রায় সবাই মাইগ্রেট করার ফলে তাকে বৃদ্ধ বয়সে নিতান্তই নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে হবে। তবু তিনি যাননি। কেউ জিগ্যেস করলে উত্তরটা এড়িয়ে যেতেন। মাত্র একদিন একবার আমাকে, একান্ত আমাকেই বলেছিলেন, যারা যাচ্ছে, যাক্। আমি কখনো বলব না, তারা অন্যায় করছে। কিন্তু, মাই জিমি, আমি যে-দেশে জন্মেছি, যে-দেশকে আমি ছেলেবেলা থেকে ভালোবাসতে শিখেছি, সে-দেশ আমি ত্যাগ করতে পারব না। আমি এদেশেই মরতে চাই, যাতে করে আমার বাপ-পিতামোর হাড্ডির কাছে আমার হাড়িও ঠাই পায়– আই উয়ান্ট মাই বোস টু বি গেদার আনটু মাই ফোর ফাদার্স হোয়ার দে আর। ম্যাডাম, আমার বেলাও তাই সে হিয়ার। আমি চলে গেলে তার গোরে ফুল দেবে কে?
