কীর্তি বললে, ওরকম একটা গণ্ডমূর্খকে কোনও দেশ যে স্পাই করে পাঠাতে পারে, সেটা বেচারী অনুমান করবে কী করে? সে ভেবেছিল, একটুখানি ন্যাজ খেলানোর পর, ধরবে সাপের ন্যাজটা। কিন্তু পয়লা কোপেই বেরিয়ে এল সাপের বদলে কেঁচো। তবে মিঞা খুব একটা কাজে লাগতেন বলে মনে হয় না। ওকে হয়তো পাঠিয়েছিল জেনে-শুনে যে সে ধরা পড়বেই। ভারতের কদিন লাগে ওকে পাকড়াতে, পাকড়ে ওকে নিয়ে কী করে– অর্থাৎ ওর নাম করে, কিংবা ওকে বাধ্য করে বোগাস খবর পাঠায় কি না, ওকে কিনে ফেলে নিজেদের স্পাই করে পশ্চিম পাকের এমন জায়গায় পাঠায় কি না, যেখানে সে পরিচিত নয়, এবং আরও অনেক কিছু– এবং তার থেকে বিচার করবে ইন্ডিয়ান অ্যান্টি-শাই বিভাগ কতখানি চালাক, কতখানি আপ-টু-ডেট।
শিপ্রা : ঢাকা বেতার এখন খবর দেবে। কী বলে শুনি।
প্রধান খবর ছিল, হামিদুল হক বিবৃতি দিয়েছেন, এটা যুদ্ধ নয়, হত্যা নয়, বর্বরতাও নয়। সামান্য অপারেশন। তাতে দু চারজন লোক মরবেই–
কীর্তি : মাই গড!
–যারা আইন মেনে চলছে আর্মি তাদের কোনও ক্ষতি তো করছেই না, বরঞ্চ তাদের নিরাপত্তার জন্য সব ব্যবস্থা নিয়েছে। দেশ লীগ শয়তানদের গুণ্ডামি থেকে রক্ষা পেয়েছে। এখন যা লুট রাহাজানি খুন হচ্ছে সেসব করছে লীগের লোক। গ্রামের লোক ভারি খুশি, আর্মি অপারেশনের খবর শুনে আমার কাছে গাঁয়ের সব খবর আসে এবং সর্বপ্রকারের কটুকাটব্য, জলজ্যান্ত মিথ্যা ভাষণ। সংক্ষেপে বলতে গেলে আয়নার উল্টো ছবির মতো ইয়েহিয়া-টিক্কার সপক্ষে অনবদ্য একখানা মাস্টারপিস।
শিপ্রা স্তম্ভিত হয়ে শুনল। সে এমনি হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছে যে গ্যোবেলস্-এর তুলনা পর্যন্ত তার অবশ মনে সঞ্চারিত হল না।
কীর্তি অতখানি না। শুধাল, এই হটি কে চেন? ইনি বাঙালি মুসলমান। ইনি এবং একজন বাঙালি হিন্দু দুজনাতে পার্টিশনের পূর্বে বর্মা থেকে আগত শরণার্থীদের জন্য ফান্ড থেকে অন্তত লাখ তিরিশেক টাকা তছরূপ, চুরি, যা ইচ্ছে, বল করাতে– ওদের নামে গ্রেফতারির হুকুম বেরোয়। ঠিক ওই সময় পার্টিশন হল; হক ঢাকা অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচালেন। খুব সম্ভব এখনও তার নামে কলকাতায় এরেস্ট ওয়ারেন্ট জারি আছে; এই চব্বিশ বছরে তিনি ভারতে পদার্পণ করেননি। সেখানে রাজনীতির খেলাধুলোতে সুবিধে না করতে পেরে রাজনৈতিক বনবাসে চলে গেলেন– তখনকার মতো। বর্মার কড়ি দিয়ে একটা দৈনিক খবরের কাগজ কিনে রেখেছিলেন; সেইটে দিয়ে আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়াতে লাগলেন। অনেকটা–
থামলে কেন?
অল রাইট– অনেকটা গোয়িং ইনটু টেম্পরারি রিটায়ারমেন্ট লাইক এন ওড় প্রসটিটুট, বিকাম এ হোল-টাইম, প্রফেশনাল পিমপ অ্যানড় এওয়েট এ স্টেজ-ব্যাক অ্যাজ দি সো ওনার অব্ ফুল-ফ্লেজেড় ব্রথেলস্।
খানের প্রবেশ।
খান : চতুর্দিকে পুলিশ ছড়িয়ে পড়েছে; হুলিয়া বেরিয়েছে মিঞাকে পাকড়াবার জন্য।
কীর্তি : চতুর্দিকে কেন? ও তো এখন সিধে ধাওয়া করবে সবচেয়ে নিকটের পাক বর্ডারের দিকে। এবং যাবে চেরাপুঞ্জির ঘুরতি পথে। জিমিকে যে পই পই করে চেরাপুঞ্জির খবর জিগ্যেস করেছিল সেটা শুধু কামুফ্লাজ নয়। পশ্চাদপসরণ– লাইন অব রিট্রিট সম্বন্ধেও ওকিবহাল হওয়ার প্রচেষ্টা তাতে ছিল। এবং সে সোজা সরকারি সড়কও ধরবে না। খাসিয়ারা অতিথি-বৎসল। গ্রাম থেকে গ্রামান্তর হয়ে চেরাপুঞ্জি একপাশে রেখে কী একটা জায়গার নাম, কী যেন, উঠনি–মহাদেরে উঠনি না কী যেন সেটা অপরিহার্য কয়েকশো ধাপ সান-বাঁধানো সিঁড়ি দিয়ে চেরাপুঞ্জি অঞ্চলের উচ্চতা থেকে নামবে কী যেন একটা ছোট্ট খাসিয়া গ্রামে কী এক পুঞ্জি– সেখান থেকে কোম্পানিগঞ্জ, ভুলাগঞ্জ, জন্তিয়ার ওত্রাইটার পথ খুবই সহজ। চেপোস্টটার নাম বোধহয় ডাউঁকি। সে নিশ্চয়ই সেখানে যাবে না। ওখানেও পা-সিলেটে ঢোকার তরে বিস্তর চোরাবাজারের গুপ্তিপথ রয়েছে।… স্পাই মাস্টার যে রকম ভয় পেয়েছে আর অ্যাক্কেলটিও গুড়ম, সে তার বর্তমান মুক্ত-কচ্ছাবস্থায় দু কান-কাটার মতো সদম্ভে গৌহাটির অষ্টপ্রহর গগ করা সরকারি বে-সরকারি কোনও পথই ধরতে পারে না।
খান শুধাল, ম্যাপটি যোগাড় করলে কোত্থেকে?
কীর্তি, তৃপ্ত বদনে : হাজি সকল কাজের কাজী; নিজের থেকেই দিয়েছিল, টু মাইল টু এন ইঞ্চ ম্যাপগুলো।
খান : তার পর প্রশ্ন উঠল, লোকটা সবকিছু ফেলে রেখে সুদুমাত্র খালি সুটকেসটা নিয়ে গেল কেন? এমনকি ট্রানজিসটারও ফেলে গেল কেন? অন্তত ডাউঁকি বর্ডারের অবস্থাটা তো গৌহাটি স্টেশন থেকে শুনতে পেত।
কীর্তি : উত্তর অতি সরল। সুটকেসটাতে ছিল ফস বটম গুপ্তি-তলা। সেখানে আর কিছু না থাক, ম্যাপ-ট্যাপ কম্পাস এমনকি হোট ট্রান্সমিটার থাকাও অসম্ভব নয়। কামরার ভিতর সেগুলো নিশ্চিহ্ন করা অসম্ভব। অতএব পয়লা মোকাতেই ওটা সে ফেলে দেবে যে কোনও জঙলা একটা খাদে তার অভাব কী এখানে। তোকে যদি কখনও মার্ডার করি তবে শিলঙে ডেকয় করে এনে। লাশ গায়েব করার তরে আইডিয়াল প্রলোভিনী এখানকার খাদগুলো। লেকের পাশ দিয়ে যদি যায় তবে সেটা ব্যাড সেকেন্ড। কী মূর্খ লোকটা সেটা আরও বোঝা গেল ট্রানজিসটার সঙ্গে নেয়নি বলে।
শিপ্রা বললে, অনুমান করতে পারছি।
