সত্যি কথা বলবে। সে যেসব প্রশ্ন করেছিল আর তোমার উত্তর যতখানি স্মরণে আনতে পার বলবে। তোমার মনে কী সন্দেহ হয়েছিল অথবা নিজের কোনও মন্তব্য প্রকাশ করবে না, পুলিশ সরাসরি জিগ্যেস না করলে। সর্বশেষে বলবে, তোমার যতদূর জানা মি. খানের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর আর কেউ তাকে দেখেনি। পুলিশ আমার কাছে আসবে। আমিও সরাসরি যে কটি কথা হয়েছিল বলব। আমাকে জিগ্যেস না করলেও আমি আমার সন্দেহের কথা বললে বলতেও পারি। তুমি কোনও চিন্তা করো না, জিমি। আমি আমার ওয়ার্ড অব অনার দিচ্ছি তোমাকে, তোমার কেশাগ্রটুকুও কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। এখন তুমি নিশ্চিন্ত মনে ডিউটিতে ফিরে যাও।
জিমি চলে যেতেই খান বললে, জিমিকে বলিনি, এখন বলি, আমি লাহোরের প্রেস ক্লাবে কখনও যাইনি। ওটা প্যোর ব্লাফ।
শিপ্রা : তা হলে ঠিক ওইটেই বললে কেন?
কীর্তি : সোজা উত্তর : প্রেসক্লাবে যায় নুজ-মেন এবং খবরের সন্ধানে বিস্তর পাই। নেটিভ লাহোরের পাঞ্জাবি স্পাই যায় বিদেশি সংবাদদাতাদের পাম্প করতে। লোকটা যদি সত্যই স্পাই হয় তা হলে, তা হলে হয়তো সামান্য একটু বেসামাল হবে।
শিপ্রা : কিন্তু মজাদার টাই?
খান : ওর গলায় ছিল যে টাইটা সেটার মতো বিকট টাই আমি কখনও বাস্তবে বা ফিল্মেও দেখিনি। শিলঙের মতো আন্ডার ডেভেলাপড় শহরের হোটেলে-ক্লাবে অর্ধসভ্য ইংরেজ এখনও পরে এডওয়ার্ডিয়ান সোলেস টাই। সেটা দেখার পরও যে খলিফে ওরকমের আচাভূয়া টাই পরে, তার স্টকে পাদ্রি সায়েবদের পানসে টাই থাকার কথা নয়। এটাও ব্লাফ, আগের ব্লাফটা জোরদার করার জন্য।
কীর্তি : তার প্রতিক্রিয়ায় সে তার ন্যাশনালিটি নিয়ে চেল্লাচেল্লি করতে লাগল। আর তুই তখন নিশ্চয়ই খুব বেকুব বনে গেলি? না?
শিপ্রা : এ কী কথা। সে তো তখন খুশি যে তার টেসট সফল হয়েছে।
খান : না, কীর্তির অনুমানটাই ঠিক। এরকম একটা থার্ড ক্লাস টেস্টের মুখে নেহাত কাঁচা স্পাইও বিচলিত হয় না। সে যে স্পাই এটা আমি তখন আদৌ ধরে নিইনি। রোমান্টিক জিমি হয়তো ঘামের ফোঁটায় কুমির দেখে ধরে নিয়েছে লোকটা স্পাই আর যখন সর্বত্র পা স্পাই ম ম করছে। তাই ব্যাটার চেল্লাচেল্লি শুনে আমি প্রথমটা বেকুব বনে গিয়েছিলুম। তখন বুঝলুম, একমাত্র গাড়ল পাঞ্জাবিদের মধ্যে গাড়লস্য গাড়লই কল্পনা করতে পারে, সে পার্ফেক্ট স্পাই এবং শুধু তাই নয়, আর পাঁচটা, জাতভাই, গাড়লের মনে বিশ্বাস জন্মাতে সমর্থ হয় যে, সে স্পাইরানি মাতাহারির জারজ সন্তান কারণ তার উর্দু অ্যাসন চোস্ত লখুনওয়ি যে এখনও বাপের সে-সুপুত্ত্বর পয়দা হয়নি যে ঠাহর করতে পারবে, সে আম্মাজানের গব্ব থেকে তেড়ে পাঞ্জাবি বুলির ফোয়ারা ছুটিয়েছে শালিমার বাগ-এর বেবাক ফোয়ারা এক জোট করে।… খান নিজের রসিকতায় নিজেই খিলখিল করে হাসতে আরম্ভ করেছে। শেষটায় সামলে নিয়ে বলল, লোকটা যেই না আমার ইচ্ছাকৃত বিকৃততর খাস কলকাত্তাই উর্দুর দুটিমাত্র লজো শুনেছে অমনি ছোটাল তার উর্দু- সে যে উত্তর প্রদেশের প্রকৃত সন্তান সেইটে সপ্রমাণ করার জন্য। আর বলব কী দিদি, সেটা শুনলে আমাদের পাড়ার পর্দানশিন কুলীন ঠাকরুন পদিপিসি পর্যন্ত বলে উঠত, এ ম্যা– ভদ্রলোকের ছেলে, মাইরি, কতা কইচে ডাইভার সদ্দারজির মতো নোকের সামনে লজ্জা করে না! অতিশয় নির্ভেজাল অমৃতসর-লাহোর-মার্কা পাঞ্জাবি উর্দু-প্লাস্টিকের পাতর-বাটি! সুনীতি চট্টো রেকর্ডে তুলে রাখতেন। আমাদের পাড়াতে এক বাঙাল ভদ্রলোক আছেন–তুই তো চিনিস রসরাজ ভশচায–ত্রিশ বছর ধরে। প্রায়ই বলতে শোনা যায় রারী (রাঢ়ী) দ্যাশে মাক্যা থাকা দ্যাশের আপন ব্বাসাটা (ভাষাটা) এক্কেবারে পাউরি গেছি, (ভুলে গিয়েছি, পাসরি গেছি)। এমনই আবেস্তা (অবস্থা) ওংকা (এখন) গিরিনি (গৃহিণী) পইরজন্ত (পর্যন্ত) আমার বিসুর্দ রারী ধ্বসা (বিশুদ্ধ রাঢ়ী ভাষা) বুস্তা পারইন না (বুঝতে পারেন না)। মি. কুরেশি উর্দু বলার সময় হুবহু ভশচাযের আত্মপ্রত্যয় নিয়ে আপন উত্তর প্রদেশীয়ত্ব সপ্রমাণ করার জন্য লেগেছিলেন ব্যাঘ্রাচার্য বৃহল্লাঙ্গুলের চর্বি খেয়ে।
এমন সময় জিমি এসে বললে, পুলিশ আপনার কাছে আসতে চায়, না আপনি যাবেন।
খান বললে, আমিই যাচ্ছি। থাকত আজ আই জি তালেবর দত্ত, :, আমাকে কেন, কাউকে কোনও প্রশ্ন না শুধিয়ে, দ্যাখ তো না দ্যাখ, ক্যা করে আপন হাতে পাকড়াত হারামিকে।
খান চলে গেলে শিপ্রা শুধাল, খান লাহোরিটাকে টেস্ট না করে অগাটার চেয়ে অগা সেজে, ধীরে ধীরে খাঁটি মুসলমানত্ব জাহির করে সেটা করতে পারত সে কোনও ভান না করে, এবং অতি অনায়াসে, কারণ তুমিই বলেছ, সে ইসলামের ইতিহাস বহু বৎসর ধরে পড়েছে এবং মুসলমান মুসলমান ভাই-ভাই, তাই ইয়েহিয়া তার বড় ভাই সাহেব মির্জা সেটা সত্যি সত্যি বিশ্বাস করে। তার পর লাহোরের মিঞাজিকে সাপ্লাই করত ইন্ডিয়া সম্বন্ধে রগরগে বোগাস ইনসাইড় ইনফরমেশন, এবং পাম্প করত তার পেট থেকে পশ্চিম পাক সম্বন্ধে যতখানি মাল বের করতে পারে, এবং সবচেয়ে ইমপর্টেন্ট কনটাক্ট রাখার নাম করে ভারতে পাকিস্তানি ও হিন্দুস্তানি স্পাইদের যে-কটা নাম সংগ্রহ করতে পারে। দুচ্ছাই, ওসব আবার বলি কেন?– লারি কোম্পানিকে সে যে-উদ্দেশ্য নিয়ে তেলিয়েছিল।
