চিড়িয়া সোৎসাহে খানের সঙ্গে জোর ঝাঁকুনি দিয়ে হ্যান্ডশেক করে আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুশি হলুম। আমার নাম রহমান কুরেশি
জিমি বিস্মিত হল, খান তখখুনি নিজের পরিচয় দিল না কেন– যেটা স্বাভাবিক এটিকেট।
খান তখন কুরেশিকে বলছে, বা শ্যোরলি আই মেট ইউ এট লাহোর, প্রেসক্লাবে– এই ফেব্রুয়ারি, না জানুয়ারিতে অর্থাৎ হাইজ্যাকিঙের আগে। আপনার গলায় ছিল ভারি মজার একটা টাই।
এক মিলিমিটারের শতাংশের এক অংশ টাক লোকটা যেন বেসামাল হল। একটু জোর গলায় বললে, অসম্ভব। আমি কখনও পাকিস্তান যাইনি। আরও সামান্য গলা চড়িয়ে আমি ইন্ডিয়ার সিটজেন বাই বার্থ। উত্তরপ্রদেশ।
খান প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বললে, আই এম স্যরি, অত্যন্ত দুঃখিত…, অতঃপর তার এক্কেবারে নিজস্ব উর্দুতে–বেয়াদবি মাফ করেংগাহৈ।
কুরেশি উর্দুতে তুফান তুলে টর্নেডোতে পৌঁছবার পূর্বেই খান ইংরেজিতে ফিরে গিয়ে বলল, আমি উর্দু জানি না তাই বলে কি কোনটা লক্ষ্ণৌয়ের উর্দু আর কোনটা লাহোরের উর্দু তার তফাত জানিনে! আমি মুগ্ম মুসল্লম বানাতে জানিনে, তাই বলে কোনটা সুখাদ্য হয়েছে আর কোনটা রদ্দি তা-ও জানিনে! লাহোরের কারও মুখে এমনকি স্যার ইকবালের ভাতিজার মুখেও এমন চোস্ত উর্দু শুনিনি।
থ্যাঙ্কু, খুদা হাফিজ বলে কুরেশি ঈষৎদ্রুতপদেই স্থান ত্যাগ করলেন। জিমি একটু গলা চড়িয়ে বললে, আমি কি বড়ুয়াকে ফোন করব আপনার ট্রানজিসটার বিষয়ে?
কুরেশি শুনেও শুনল না।
.
খান একরকম জোর করে দুই ইয়ারকে নিয়ে গেল মরেলল্লাতে। বললে, এ দোকানের প্রতিষ্ঠাতা আমাদের বেয়াত্রিচের দেশ-ভাই, কিন্তু আভিজাত্যে বেয়াত্রিচের হেঁটোর বয়সী। মানুষের হাতে তৈরি অপ্রাকৃতিক লোকটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য শিপ্রার খুবই পছন্দ হল। এমপরিয়ামে যদিও শিপ্রা গেল অনিচ্ছায় তবু আসামের পাত সিল্ক জীবনে সে এই দেখল প্রথম। খান শব্দতত্ত্ব ঝেড়ে বলল, আমার চেয়েও যারা অগা তারা বলে পট্টবস্ত্র– সিল্ক- পাট থেকে তৈরি হয়। আমার মনে হয় এই পাত শব্দটা অনেক অহমিয়া পাট উচ্চারণ করে বলে ওটার শুদ্ধি করে পণ্ডিতেরা ওর নাম পট্টবস্ত্র দিয়েছেন।
বড়বাজারও দেখাল খান, বললে, এই দেখ, মাতৃক সভ্যতার পূর্ণ বিকাশ! তাবৎ দোকানিই খাসিয়া মেয়েছেলে। ব্যাটাছেলেগুলো বিড়ি ফোঁকে, জুয়ো খেলে আর প্রতি সন্ধ্যায় মদ খেয়ে মাতলামো করে, বউয়ের পয়সায়। তবে হ্যাঁ, বউ যদি কোনও ইয়ারের সঙ্গে রাত্রিবাস করে আসে– কত পার্সেন্ট করে জানিনে, আমার অতি সোহাগের খাসিয়া মেয়েদের সম্বন্ধে আমি অপ্রিয় কোনও কথা বলতে চাইনে– তবে স্বামীটির টু ফাঁ করার সামাজিক হক্ক নেই। অত্যুত্তম ব্যবস্থা।
শিপ্রা বললে, স্ত্রী-পুরুষের সম্পর্ক বাবদে আজ পর্যন্ত কোনও সামাজিক ব্যবস্থারই প্রশংসা তো করা যায়ই না, গুণী-জ্ঞানীরা স্বীকৃতি পর্যন্ত দেননি। তাই বিশ্বজনের মতে পৃথিবীতে মাত্র যে একটি সর্বজনগ্রাহ্য প্রবাদ আছে সেটি বিবাহ একমাত্র জুয়োর বাজি খেলা (গ্যামলিং) যাতে দু পক্ষই হেরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যুধিষ্ঠির তো জুয়ো খেলায় সর্বস্ব হারালেন। এর পর তার জুয়ো খেলা বন্ধ– বাজি ধরার স্টেক একটা কানাকড়িও নেই। দুর্যোধন ছোকরা চালাক। সে দিয়ে দিল দ্রৌপদীকে ফেরত– সব জুয়ো যখন বন্ধ তখন চলুক ওই মোক্ষম জুয়োটি, যেখানে দুই পক্ষই হারে। এখানে একদিকে একজন দ্রৌপদী, অন্যদিকে পাঁচজন।
খান শুধল, পাঁচজন কেন? আমি তো শুনেছি, তিনি অর্জুনকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, যে কারণে তার পতন হল। অর্জুন অন্তত লুজার নন।
শিপ্রা বললে, আর অন্য মতে তিনি যে গোপনে কর্ণকে ভালোবাসতেন সেটা জানো না? যে মোটর ড্রাইভারের ছেলে কর্ণ (তখনও কুন্তী ছাড়া কেউই জানে না, কর্ণ আসলে যুধিষ্ঠিরেরও অগ্রজ) প্রকাশ্য রাজসভায় ডাচেস্ বল, এমপ্রেস বল, দ্রৌপদীকে সক্কলের চেয়ে এমনকি দুঃশাসনের চেয়েও বেশি অপমান করেছিল রূঢ় চণ্ডালের ভাষায়। বাকর্ষণ করাতে দুঃশাসনকে বলা যেতে পারে বর্বর, কিন্তু ভাষা দিয়ে অপমান করাতে কর্ণ ইতর, মিন। ভাষার মার মোক্ষমতম মার। অতএব দ্রৌপদীও লুজার। এবং সবচেয়ে বেশি লুজার। কারণ দ্রৌপদী পঞ্চপাণ্ডবকে কস্মিনকালেও অপমান করেননি।
এবারে কীর্তি মুখ খুলল, বিস্ময়ের ভান করে বললে, অতাই বুঝি কেউ কেউ বিয়ে গ্যাম্বলটাকে ডরায়!
.
০৭.
টোকা দিয়েই কটেজে ঢুকেছিল। কিন্তু হাবভাব দেখেই বোঝা গেল বিলক্ষণ উত্তেজিত।
শিপ্রা বলল, এক কাপ চা?
থ্যাঙ্কু মাদাম। খানের দিকে তাকিয়ে বলল, মি. কুরেশি মিসিং।
খান ইচ্ছা করেই শিপ্রাদের কিছু বলেনি– কুরেশির সঙ্গে তার প্রেমালাপ সম্বন্ধে। জিমিকে বলল, দাঁড়াও, এঁরা ব্যাকগ্রাউন্ডটা জানেন না। বলে নিই। বলা শেষ হলে কীর্তি মন্তব্য করল, মিসিং নয় এবসকভিই— পালিয়েছে।
জিমি বললে, সেই যে আপনার সঙ্গে কথা প্রায় শেষ না করে কুরেশি ঘরে চলে গেলেন তার পর লাঞ্চ, টিতেও এলেন না। তা সে মেলাই টুরিস্ট আকছারই দু-তিনটে খাবার পর পর মিস্ করে যান। টির সময় বেয়ারা অনেকক্ষণ ধরে টোকা দিল– সাড়া দিল না। ডিনারে এল না। সন্ধ্যা থেকে দুটো কামরাই অন্ধকার। রাত এগারোটায় কিন্তু একটা বেয়ারা দেখতে পেল ঘরে আলো জ্বলছে। টোকা দিয়ে সাড়া পেল না। সমস্ত রাত কিন্তু আলো জ্বলল। সংক্ষেপে বলছি, আজ সকাল দশটায় বেয়ারাদের সন্দেহে ম্যানেজার পুলিশ ডেকেছেন। দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখা গেল সুট মুট শার্ট টাই শেভিঙের জিনিস সব বিছানার উপর ছড়ানো, ট্রানজিসটারও রয়েছে। তখন কে যেন লক্ষ করল, নেই মাত্র একটি জিনিস– সুটকেসটা, অর্থাৎ শূন্য সুটকেসটা মাত্র নিয়ে লোকটা দুপুররাতে উধাও হয়েছে। কাল রাতে আমার ডিউটি ছিল না। তাই পুলিশ আমাকে কিছু শুধোয়নি। শুধোলে কী বলব, মি. খান?
