কীর্তি মুগ্ধ হয়ে বললে, মিতা, আমি কি বৃথাই বলি তুমি তুলনাহীনা। আমি শুধু সমস্যা আর প্রশ্নগুলোকে নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলুম, তোমার অন্তর্দৃষ্টি গিয়েছে সেগুলোর পটভূমির দিকে তীক্ষ্ণতম ক্ষুরধার নিয়ে।… বেচারী রবি কবি! তাঁকে যেতে হয়েছিল তুলনাহীনার সন্ধানে সাতসমুদ্র পেরিয়ে আর্জেনটিনা না কোথায় যেন।
সুনীল সাগরের শ্যামল কিনারে
দেখেছি পথে যেতে তুলনাহীনারে।
আর আমি কী অবিশ্বাস্য ভাগ্যবান।
শিপ্রা হেসে বললে, আর আমি যদি বলি, আমি ভাগ্যবান, আমিও দেখেছি সমুদ্র না পেরিয়ে–
অদ্যাপিও সেই খেলা খেলে গোরা রায়।
মধ্যে মধ্যে ভাগ্যবানে দেখিবারে পায়।
এমন সময় ঘরটাকে দাপটে খান খান করে খান সাহেবের প্রবেশ।
গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললে, মদ্যাদি যখন আরেক কদম এগুলেই সম্পূর্ণ বর্জন করে ফেলবে। তখন মুসলমান ধর্মে দীক্ষা নিয়ে নাও না, এই বেলাই? আমার মতো সরু পাবে না। খুদ আরব মুলুকেও না। পাকি একটা ঘণ্টা আমি বেতারযন্ত্রটার কান মলে মলে, বিবিসি কলোন ভিয়েনা ছুঁ মারার সঙ্গে সঙ্গে সাপটে দিলুম আধা বোতল গর্ডন। আর হেথায় হেরি, ফুলবাবু মশাই আর পটের বিবিটি কড়ে আঙুল পরিমাণ গেলাসটি শেষ করতে পারেননি। একেই কি বলে সভ্যতা? হায় শ্রীমধু!… শোনো আমি এসেছি তোমাদের বাইরে নিয়ে যেতে। সত্যি বলছি এরকম বন্ধ ঘরের অবশ বাতাসে গুজুর গুজুর করতে তোমাদের গুজুর গুজুরের উদ্দেশ্যই সফল হবে না। মুক্তি সংগ্রামের জন্য তৈরি হতে হলে চাই মুক্ত আকাশ, মুক্ত বাতাস। আরেকটা তত্ত্বকথা বলি, তোমরা মদ ছেড়ে দিলেই বাঙালিরা রাতারাতি পাঞ্জাবিদের হাইকোর্ট দেখাতে পারবে না, আর মাত্রা বাড়ালেও লীগ তাদের আশা ভরসা বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে না। অ্যাব্বড়া যুদ্ধটা যখন চার্চিল চালালো সে কি তখন নির্জলা উপবাস করেছিল? হ্যাঁ, নির্জলা অতি অবশ্য বটে; নির্জলা হুইস্কি ওই সময়েই মাঝে-মধ্যে সে টেনেছিল। রাধে মেয়ে কি চুল বাঁধে না? তৈরি হও এখখুনি।
ঘর থেকে বেরুতেই দেখে জিমি দাঁড়িয়ে আছে।
খান তার গতানুগতিক সম্ভাষণ করার পূর্বেই জিমি নিচু গলায় বললে, সব কথা বলতে গেলে এখানে দাঁড়িয়ে হয় না। কাল একজন নতুন গেস্ট এসেছে হোটেলে। আমাকে অ্যাংলো জেনে ড্রিংক অফার করল, দোস্তি জমাবার তরে। তার ইংরেজি উচ্চারণ থেকে হানড্রেড পার্সেন্ট শ্যোর লোকটা পাঞ্জাবি। কিন্তু কোন পাঞ্জাবের? অথচ হোটেলের খাতাতে লিখেছে, মিরাট। আমার কীরকম যেন ধোকা লাগছে। কারণটা হয়তো আপনার কাছে এপিল করবে না, তবু বলি। লোকটা যদি আর পাঁচটা টুরিস্টের মতো আমাকে সোজাসুজি শুধাত, ইন্ডো-পাক বর্ডার কতদূরে, কদুর অবধি যাওয়া যায়, রেফুজিরা ভিড় লাগায়নি তো রাস্তায়, তা হলে আমার মনে ধোকা লাগত না। দিস জনি সোজা পথ না ধরে বিস্তর বিটিং এবাউট দি বুশ করে করে পৌঁছল চেরাপুঞ্জিতে– কী তার আগ্রহ, কত বৃষ্টিপাত, বছরে কদিন বৃষ্টি হয়, আর যত সব রাবিশ প্রশ্ন। তার পরও বর্ডারের পথ ধরল না। ফের আশ-কথা পাশ-কথা। তার পর এল বর্ডারের টপিক। আমি ইচ্ছা করেই ভাসা ভাসা উত্তর দিতে লাগলুম। কখনও-বা রহস্যময় উত্তর ফিসফিস করে। স্পষ্ট দেখলুম তার ক্যোরিসিটি দারুণ উত্তেজিত হয়েছে। মুখোশ খসে গেছে। হুস হুস করে একটার পর একটা প্রশ্ন শুধাতে লাগল। মাঝেসাঝে বাজে প্রশ্নের ভেজাল দিয়ে আসল উদ্দেশ্য কামুক্লাজ করতে ভুলে গিয়েছে। তার প্রশ্নের রকমারি থেকে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলুম ব্যাটা এখানে আসার আগেই সবকিছুর সন্ধান নিয়ে এসেছে। এখন শুধু লেটেস্ট অবস্থাটা জানতে চায়।
আরেকটা কথা : এখানে নেবেই চেল্লাচেল্লি, পথে তার ট্রানজিস্টার খোয়া গিয়েছে। মুজিক ভিন্ন সে দু দণ্ড বাঁচতে পারে না। আকে সক্কলের পয়লাই শুধাল, এখানে ট্রানজিসটার পাওয়া যাবে তো, দোকান কোথায়? ছুটল টি না খেয়েই। সঙ্গে সঙ্গে আমি বড়য়াকে ফোনে আমার সন্দেহের কথা জানালুম। বড়য়া তো একদম শ্যোর, লোকটা ওয়েস্ট পাঞ্জাবের। এবারে শুনুন মজাটা। যতবার আমি তার কামরার বারান্দা দিয়ে গিয়েছি কান পেতে শুনেছি, নো, নো, নো মুজিক এটোল। লো ভলুমে শুনছে নজ। এনি উয়ে, টক্। মুজিক ককখনও না।
আজ আমাকে শুধাচ্ছিল, অত উঁচু অ্যারিয়েল কার? তবে কি বেতারকর্মী? তবে
হঠাৎ জিমি থেমে গেল। বললে, ওই আসছে চিড়িয়াটি। আপনি পরিচয় না করতে চাইলে, স্যার কেটে পড়ন। ও সক্কলের সঙ্গে গায়ে পড়ে আলাপ জমাতে চায়। দু একবার স্নাবড়ও হয়েছে। অভ্যাস বদলায়নি।
চিড়িয়া এসেই অতিশয় যৎকিঞ্চিৎ বিরক্তির সুরে বললেন, বাজে ট্রানজিসটার। আচ্ছা, ওই মি. বড়য়া, সে এটার দাম কেটে একটা পুরো পাক্কা রেডিয়ো সেট দেবে না, ওইরকম স্কাই হাই এরিয়েলসহ?
আমার তো মনে হয় না, মি. কুরেশি। (বাজে কথা। কিন্তু জিমি বড়ুয়ার স্বার্থ দেখছে)
কেন? হোটেল বলতে পারে না, আমি রেসপেকটেবল গেস্ট? ওর মেশিন বিগড়োইনি।
আমি পাতি রিসেপশনিস্ট। বরঞ্চ ম্যানেজার পারেন। (জিমি জানে, বেটা আখেরে বড় রেডিয়ো কিনবেই।)
খান মাঝখানে নাক গলিয়ে বললে, আপনাদের কথার মাঝখানে বাটু ইন করছি বলে অপরাধ নেবেন না। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, আপনি টুরিস্ট। হেথা হোথা ঘুরে বেড়াবেন। ট্রানজিসটারটা কাজে লাগবে আজকাল প্রতি বুলেটিনে গরম গরম খবর দিচ্ছে। আর বাড়ির বড় সেটটা দিয়ে শুনবেন রাত্রে ফরেন, দুবলা স্টেশন।
