বেঙ্গল রেজিমেন্টের একমাত্র বাঙালি হিন্দু অফিসার মেজর দত্ত তখন ছুটিতে, হবিগঞ্জ থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে চিঠি পাঠালেন, সেই রাত্রেই, লোক মারফত, খবর জানিয়ে; তিনি পরদিনই না-পাক্ খানদের খতম করার জন্য সিলেটের দিকে রওনা হবেন। দত্ত যোগ দেবেন কি?
দত্ত উত্তরে জানালেন, কাল ভোরেই তাঁর কাছে পৌঁছবেন।
কীর্তি অনেকক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইল। চোখ মেলে তাকিয়ে আছে শূন্য দৃষ্টিতে, যেন স্মরণে আনতে পারছে না, ভুলে-যাওয়া কোনওকিছু। মাঝে মাঝে তাকায় শিপ্রার চোখের গভীরে যেন সেখানেই পাবে রহস্যের সন্ধান। শেষটায় প্রত্যেকটি শব্দ, মনে হল যেন বাছাই করে করে ধীরে ধীরে বলল, শিপ্রা, আমার বিস্ময়ের অবধি নেই, অত্যাশ্চর্য অলৌকিক এরকম একটা ব্যাপার যে আদৌ সম্ভবে তারই সামনে আমি দিশেহারা, সৃষ্টিরহস্যের চেয়েও ঘনতর রহস্য যেন সৃষ্টির এক নগণ্য অংশ, ওই ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র হবিগঞ্জে– যার নাম তুমি-আমি কেউই কখনও শুনিনি, শুনতুমও না– অকস্মাৎ কুয়াশার যবনিকায় বৃহত্তম, খুদ সৃষ্টিরহস্যকে ঢেকে ফেলতে পারে, এ যে সর্ব তর্কশাস্ত্রে, ন্যায় মীমাংসাকে অর্থহীন করে দেয়; অংশ কি কখনও পূর্ণের চেয়ে বৃহত্তর হতে পারে। সিন্ধু-বিন্দু কি কখনও সিন্ধুর চেয়ে বিরাটতর কায়া ধারণ করতে পারে? ২৫ মার্চের সন্ধ্যায় এই হবিগঞ্জের লোকটি কোন দুঃসাহসে একাই যুদ্ধঘোষণা করে দিল ইয়েহিয়া, তার ফৌজ এবং সবচেয়ে বাস্তব কঠিনতম শত্রু ওদের ট্যাঙ্ক, বমার প্লেন, সাঁজোয়া গাড়ি, বিরাট বিরাট কামানের বিরুদ্ধে? লোকটা তো গলির আধ-পাগলা পুচকে ছোঁড়াটার মতো নয়, যে নিত্যি নিত্যি রাস্তায় রাস্তায় চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে স্তালিন হিটলার মা কালী মৌলা আলির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম ঘোষণা করে। দুজনার কাছ থেকে আমি ওর কথা শুনলুম। দুজনাই একমত : লোকটা অতিশয় শান্ত প্রকৃতির, স্থির ধীর। তার দুর্দমনীয় চঞ্চলতা প্রকাশ পায় সুন্দুমাত্র তার ঘন ঘন ঠা ঠা উচ্চহাস্যে– যেন সে সর্বক্ষণ তক্কে তক্কে আছে ঠা ঠা করার সুযোগের তরে।… মেজর সে। সে কি জানে না, ইয়েহিয়ার শক্তি কতখানি? পুব-পশ্চিম উভয় পাকিস্তানে সৈন্যসংখ্যা কত, কোন কোন শহরে আছে ক্যান্টনমেন্ট, ট্যাঙ্ক বোমারু জঙ্গিবিমান সংখ্যা সব– সব তার নখদর্পণে, সে যে তাদেরই একজন; সে জানবে না? সব জেনেশুনে সে হয়ে পড়ল একা, একান্ত একা ছিটকে পড়ল সেই সর্বগ্রাসী অসংখ্যের মাঝ থেকে? যেন গ্রহচ্যুত নক্ষত্রের মতো ক্ষিপ্ত বেগে অদৃশ্য অজানার পানে ধেয়ে ধেয়ে জ্বলে পুড়ে ছাই-ভস্ম খাকধুলোতে–না– নিঃশেষ নাস্তিতে পরিণত হতে?
কোন মামদো-পিশাচ চাপল তার স্কন্ধে যে হঠাৎ উদোম ভূতের নৃত্য আরম্ভ করে দিল সে!
জানো শিপ্রা, বরিশালের খাজা বাঙাল আমার এক ক্লাসফ্রেন্ড বিপদে পড়লেই, মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করত,
কী কল পাতাইছ তুমি?
বিনা বাইদ্দে নাচি আমি।
হ্যাঁ, এ ভূতের বাদ্যের সঙ্গতও নেই। কোথায় মৃদঙ্গ, জগঝম্প, ঢক্কা-ডিড্ডিম? এমনকি একটা বাঁশের বাঁশি– অর্থাৎ একটা রাইফেলও নেই কারও কাছে।
বললুম না, অজানা অদৃশ্যের উদ্দেশে?
শেখ সায়েব, আওয়ামী লীগের নেতারা সব কোথায় কে জানে?
কোনওপ্রকারের নির্দেশ মেজর পাননি। ইনি যে পদক্ষেপ করলেন সেটা পরে ওঁদের সম্মতি পাবে কি যদি, অবশ্য, তাঁরা স্বয়ং কোনও নিরাপদ আশ্রয় পান।
বরিশাল-খুলনা থেকে সিলেট, কক্সবাজার থেকে দিনাজপুর এই বিস্তীর্ণ এলাকার মধ্যে এমন কোনও সংযোগ ব্যবস্থা নেই যে, সংবাদ আদান-প্রদান মারফত ইয়েহিয়ার বর্বরতার ফলে কোন জায়গায় কী প্রকারের প্রতিক্রিয়া দেখা দিল সে-সম্বন্ধে ওয়াকিফহাল হওয়া যায়।
তিন শ্রেণির বাঙালি রাইফেলটা অন্তত চালাতে পারে
(ক) বেঙ্গল রেজিমেন্টের যেসব অফিসার সেপাই বাঙালি
(খ) আধা-মিলিটারি বেঙ্গল রাইফেলস
(গ) পুলিশের বেশকিছু সংখ্যা
এরা কি মেজরের পন্থা অবলম্বন করবে? যদি না করে তবে যেসব কিশোর-যুবক তাঁর চতুর্দিকে জড়ো হবে, রাইফেল চালানোর ওই যৎসামান্য ট্রেনিংটুকুই-বা ওদের দেবে কে?
এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, উপর থেকে নির্দেশ না-পাওয়া সত্ত্বেও গ্রামের লোক সাড়া দেবে কি?
কীর্তি দম নিয়ে বললে, এরকম দফে দফে প্রশ্নের সংখ্যা অগুনতি। মোদ্দা কথা : অর্গেনাইজেশন নেই, নির্দেশ নেই, অস্ত্রশস্ত্র নেই।
আমার লেটেস্ট খবর দুই মেজর কয়েকশো রাইফেল নিয়ে এগুচ্ছেন শ্রীমঙ্গলের দিকে। সেখানে নাকি একঝাঁক খান রয়েছে।
তার পর কাল ২৭ মার্চ চাটগাঁ থেকে আমাদের এই মেজরেরই মতো সমস্ত দায়িত্ব আপন স্কন্ধে নিয়ে মেজর জিয়া স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম ঘোষণা করেছেন, চাটগাঁ বেতার মারফত। এখন দেখা যাক বাদবাকি দেশটা কীভাবে সাড়া দেয়।
শিপ্রা বলল, তুমি যেসব সমস্যার অসম্পূর্ণ ফিরিস্তি দিলে ঠিক ওইগুলোই নিয়ে মেজর বিব্রত হয়েছেন, এমনতরো না-ও হতে পারে। যারা তোমাকে বিবরণ দিয়েছে তারা পরিস্থিতিটা বিবেচনা করে তাদের যুক্তি বুদ্ধি অনুযায়ী এসব প্রশ্ন তুলেছে। এই সমস্যাগুলোকে মেজরকে বিব্রত করুক আর না-ই করুক, তাঁর অন্য সমস্যা থাক আর না-ই থাক, প্রশ্নগুলোর কিন্তু একটা বাস্তব মূল্য আছে। এগুলোতে প্রতিবিম্বিত হয়েছে, অন্তত হবিগঞ্জ অঞ্চলের সাধারণ জনের চিন্তাধারা, মনের অবস্থা। আমাদের কাছে তার মূল্য প্রচুর।
