.
০৬.
এবারে আর কম্পন শিহরণ নয়। এবারে কেমন যেন আড়ষ্ট আড়ষ্ট ভাব। খান তাকে সোজা নিয়ে গিয়েছে পাশের কটেজে। খাটে শুইয়ে বলল, তুমি শিপ্রার সঙ্গে কথা কও তো, ভায়া। কিন্তু দোহাই আল্লার, সবটা বোলা না কেটে-হেঁটে। আমার এখনও পিলে চমকাচ্ছে। আমি চললুম জিমিকে শুধোতে লেটেস্টটা কী? ওর গায়ের প্রত্যেকটা লোম বেতার এনটেনা।
শিপ্রা বললে, জিমি এখন অফফ ডিউটি।
ওই আনন্দেই থাকো। আমি আসছি জেনেও সে অফ হবে! পিপিং পিটারকে স্পষ্ট দেখতে পেলুম আড়াল থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে। শেয়ানা ছোকরা, আমাদের ত্রিমূর্তি-মিলনে চতুর বলেই চতুরানন হতে চায়নি ওয়ান– নো টু, টু-মেনি হতে যাবে কেন?
শিপ্রা খুশি মনে খানের বকর বকর শুনছে : ততক্ষণে কীর্তি জিরিয়ে নিক, মনের জট ছাড়াক। বলল, আমার ঘরে একটা বেতার আছে। মিনিট দশেক পরেই বিবিসি খবর।
আমাদের ত্রি-মূর্তির ওই একটামাত্র কমন পয়েন্ট। বেতারাসক্তি কারওরই নেই। শুনেছি, লেবাননের আরব চাষা হাল চালাবার সময় বলদের শিঙে ট্রানজিস্টার ঝুলিয়ে বেলি ডানসের তালে তালে হেলে-দুলে এগুতে থাকে। বেতার বটতলার মাল। এখন অগত্যা শুনি। কপাল!
বলদটাও তালে তালে পা ফেলে তো? তা হলে নিশ্চিন্ত মনে নটের গুরুর কাছে দীক্ষা নাও। তোমার তো, জানি, দুটোই বাঁ পা।
নো, মাদাম, ভূতের হয়। আমার চারটে।… তা কী হবে, কও (বার-এর কোন মদ্য খাবের পরিভাষা)? কীর্তি হোয়াট ইজ ইওর পয়জন? তোমার সর্বাঙ্গে বিষ ছড়িয়ে পড়েছে। কড়া বিষ খাও। চাঙ্গা হয়ে উঠবে।
শিপ্রা বললে, ব্র্যান্ডি অ্যান্ড চেসার-ই ভালো। আর আমার জন্য আলাদা করে পাঠিয়ো না। আমি ওরই থেকে এক-আধ চুমুক নেবোখন। খান অন্তর্ধান।
.
শিপ্রা ঝুঁকে নিচু হয়ে কীর্তির কানের লতিতে চুমো খেয়ে কানে কানে বলল, কাপড় ছাড়বে না, কীতা?
মিতা, এখন তুমিই আমার সব। আমি সব সয়ে নিয়ে সব করতে পারব। আমি হৃদয় দিয়ে বলছি, শিপি, আমার সব অবশতা কেটে গিয়েছে। আগরতলাতে আমি সত্যি বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলুম, কিন্তু করিমগঞ্জে আমার বিভ্রান্তি অন্তর্ধান করল। দাঁড়াও বুঝিয়ে বলি; আগরতলাতে যেন শীতের ছায়া-ঢাকা দুপুরে হঠাৎ কে আমায় পিছন থেকে ধাক্কা মেরে হিম-শীতল জলে ফেলে দিল আর আমি সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় অবশ। এমন সময় দেখি, ওপারে বুড়ো গোছের লোক দিব্য সাঁতার কেটে কেটে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছে। ইতোমধ্যে আমার হাত-পা নিজের থেকেই একটু-আধটু নড়াচড়া আরম্ভ করে দিয়েছে– রক্ত সঞ্চরণের প্রয়োজনবশত। আমি ভালো সাঁতার জানি, ডুবে মরতুম না নিশ্চয়ই। এবং অবশ্যই পত্র-পাঠ ফের ডাঙায় ফিরে আসতুম, কিন্তু ঠাণ্ডা জলের প্রতি বুড়োটার ওই ন্যক্কার-ভরা তাচ্ছিল্যে যেন আমার অজানতেই সর্বাঙ্গের জড়ত্ব ডাঙাশ মেরে তল্লাট-ছাড়া করে দিয়েছে। আম্মো ততক্ষণে পাই পাই করে মাঝ পুকুরে চক্কর মারছি আর ডুবসাঁতারে পুকুরের এপার-ওপারে মাকু চালাচ্ছি। করিমগঞ্জে গিয়ে সে-বুড়োটার কাহিনী শুনলুম। কিন্তু তুমি কি খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছিলে? খবর গুজব যতই ছড়াচ্ছিল ততই তোমার কথা ভাবছিলুম।
শিপ্রা সদয় মুচকি হেসে বললে, প্রথমদিনটা বড় খারাপ গেল। দু কান বন্ধ করে রইলুম পাছে খবর গুজব শুনে ফেলি। তার পর কী যেন হল জানিনে। নিজে যেচে খান যে-জিমির কথা বলছিল তার কাছে গেলুম। ও-রকম ছেলে হয় না। সে-ই আমার রয়টার, টাস্ এবং মাতাহারি।
মাতাহারি? স্পাই?
ইনটেলিজেন্স্ ম্যান। আমি জানতুম না ট্রাঙ্ককল কর্মীদের ভিতর এত দোস্তি সমঝোতা থাকে। কোথায় জলপাইগুড়ি, কোথায় বনগাঁ শিলচর শিলঙ একে অন্যকে কখনও দেখেনি কিন্তু গলা চেনে নাম জানে। ওরা যে অনেক কথাবার্তা শুনতে পায় সে তো জানা কথা। জিমির এক বন্ধু ট্রাঙ্কে কাজ করে। সে ইভো-পাক বর্ডারের যত সব তাজা খবর জিমিকে জানাত। তাই জিমি আমার মাতাহারি x ১০০ = ০০
শেষটায় যখন শুনলুম ঢাকায় আরম্ভ হয়ে গিয়েছে শয়তানের কারবার হেলেট লুস তখন সব ভয় কেটে গেল।
পড়ল পড়ল ওই তো ভয়
পড়ে গেলে সব-ই সয় ॥
কীর্তি বলল, কী আশ্চর্য! আমার বুড়োর কাহিনী ওই ট্রাঙ্ককল অপারেটার দোস্তি নিয়েই শুরু। ২৫ মার্চ বিকেলের দিকেই ঢাকার ট্রাঙ্ক কর্মীরা জেনে যায়, রাত্রেই আর্মি ক্র্যাক ডাউন ঢাকা, চাটগাঁ, আরও অনেক টাউনে একইসঙ্গে আরম্ভ হবে। আর্মির আপন বেতার, জোরালো ট্রানমিটার আছে, কিন্তু কাজের চাপ সামলে উঠতে না পারলে ওরা সাধারণ ট্রাঙ্কেরই শরণ নেয়। নিশ্চয়ই টাপেটোপে এবং পাঞ্জাবি ডায়লেটে ঢাকা থেকে অফিসাররা অন্যান্য শহরের অফিসারদের ইনস্ট্রাকশনস্ দিচ্ছিল ক্র্যাকডাউন সম্বন্ধে। কিন্তু ট্রাঙ্কের লোক আড়ি না পেতেও আপন কাজের খাতিরেই কয়েকটা চালু ভাষা বেশ শিখে ফেলে– আর পাঞ্জাবি তো তারা শোনে নিত্যি নিত্যি, সিভিল মিলিটারি দুই-ই।
আমি যে-বুড়োর বাহাদুরির কথা বলছিলুম, তিনি আদৌ বুড়ো নন। এমনকি প্রৌঢ়ও বলা চলে না। বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি অফিসারদের একজন মেজর। তিনি কী করে খবর পেলেন সিলেটের হবিগঞ্জ টাউনে বসে, ২৫-এর সন্ধ্যায় যে, আজ রাত্রেই শুরু হবে বোঝাঁপড়া? ট্রাঙ্ক কর্মীর কল্যাণে। অবশ্য অন্য মাধ্যমও হয়তো ছিল।
