তাই এহেন উভয়সঙ্কট ম্যানেজার মাত্রেরই মুখে মাত্র একটি বুলি, ট্যাট, জিমি, ট্যাফ্ট। একটুখানি ট্যাক্ট দিয়ে ম্যানেজ করো না কেন? তোমার কী দরকার, জানো, জিমি? আরেক আউন্স্ ট্যাক।
ব্যাপারটা ট্যাকটের সীমা ত্রিসীমানার ওপারে সেটা জিমি সবিস্তর বুঝিয়ে বলেনি ককখনও। তার যথেষ্ট ট্যাকট আছে বলেই সে জানে, বলাটা হবে ট্যাকটলেস। ম্যানেজারকে আহাম্মুক বানিয়ে তার লাভ? সব জেনে বুঝেও তাঁর আত্মসম্মানে লাগবে চোট। তাই সেটা হবে মোক্ষম ট্যাকটলেস। হুঁ: ট্যাকট? হিটলারকে বললেই হত, একটুখানি ট্যাকট খর্চা করলেই তো স্তালিনগ্রাদের লড়াইটা জিততে পারতে!
এবং ম্যানেজার সেটাও বুঝতে পারত, দু তিন দিন পরে অকারণ তার পিঠ চাপড়ে বলত, উয়েল, জিমি, জীবনটা কীরকম? হাও ইজ লাইফ?
.
এই হোটেলের চাকরিতে জিমির এরকম অভিজ্ঞতা পূর্বে কখনও হয়নি।
চাকরির দৈনন্দিন জীবনে আপিসে হোটেলে দোকানে চাকুরের ক্ষুদ্র সুখ-দুঃখ আছেই। এই যে ম্যানেজার অ্যাব্বড়া তনখা পায় তাকেও তো জাতাকলের ভিতর দিয়ে যেতে হয় প্রতিদিন। তবে হ্যাঁ, কারও কলটা বড্ড ভারী, কারওটা অপেক্ষাকৃত হালকা।
এরকম ধারা রাত এগারোটায় তাকে এতদিন কোনও টুরিস্ট দুটো গেলাসসহ আহ্বান জানানো মাত্রই বস্তুত জানানোর পূর্বেই সে গোঁফ দেখতে পেত জানানোর পর শিকারি-বিড়ালসুদ্ধ। ডিউটির সময় আমাদের ড্রিঙ্ক বারণ ৩২ নম্বর অপেক্ষা করছেন টোকিও থেকে একটা ট্রাঙ্ক-কল; আমাকেই কানেক্ট করতে হবে দুনিয়ার কুল্লে সত্য কারণ, মিথ্যে অজুহাত, দুটোর ককটেল অছিলা– এটা অবশ্য এখনও পরখ করে নেয়নি–আবহাওয়া দপ্তর এখখুনি খবর দিয়েছে, কাঁটায় কাঁটায় এগারোটা দশে আমাদের হোটেলে দারুণ ভূমিকম্প হবে। সেটা সামলে নিয়ে, এই এলুম বলে, ম্যাডাম। প্রায় সবকটাই এস্তেমাল করেছে জিমি এখন তার রেস্তো তলানিতে খতম খতম করছে– এক কড়ির ফায়দা ওঠাতে পারেনি।
আজ এই তার জীবনে সর্বপ্রথম দুটো গেলাস সে নির্ভয়ে– না, নির্ভয়ে নয় বড় তৃপ্তি আর আশা পূরণের দৃঢ় আশ্বাস নিয়ে এসেছে। ডিউটিতে, বাইরে, বাড়িতে না, বাড়ি বলতে হতভাগার প্রায় কিছুই নেই, গৃহে মাতা নাস্তি এমনকি অপ্রিয়বাদিনী ভার্যা চ নেই তার জীবন বৈচিত্র্যহীন। প্রত্যেকটি দিন যেন অন্তহীন একটা মালগাড়ির ওয়াগন– সবকটা হুবহু একই ঢঙ একই বহরের। জন্মমুহূর্তে এঞ্জিনটা চলে গেছে পশ্চিম দিকে অস্তাচলের দেশে, এখন সে দেখছে, রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা ওয়াগনের পর ওয়াগন চলেছে তো চলেছেই। অবশ্য কোনওটার রঙ-চটা, কোনওটা ডাইনে-বাঁয়ে দুলছে, কোনওটা-বা ঝাঁ চকচকে সদ্য বার্নিশ পালিশ করা। কিন্তু এ মালগাড়ির শেষ কোথায়? পূর্বাচলের দিকে তাকিয়ে দেখে গাড়ির শেষান্ত সেখানে বিলীন, ফের অস্তাচলের দিকে তাকিয়ে দেখে প্রারম্ভাংশও সেখানে অদৃশ্য।
কী মহিমান্বিত, কী ডিগনিফাইড এই সুন্দরী। সামান্যতম অস্বস্তির চিহ্নমাত্র নেই তাঁর প্রশান্ত মুখচ্ছবিতে। আর কী সহজ সুরে বললেন, তোমাকে আমার বড় ভালো লেগেছে, জিমি। তোমার মুখটা খাঁটি মাদারস ডার্লিঙের মতো, কিন্তু দেহটা বাই অল দাট ইজ হোলি– কী মজবুত, ম্যাগনাম সাইজের হাড় দিয়ে তৈরি।… শোনো, তোমাকে ডেকে আনলুম, সেলিব্রেট করতে। স্টেশনটার কী নাম ধরতে পারিনি। বলল, রাশা নাকি অতি দৃঢ় ভাষায় ইয়েহিয়াকে বলেছে, রক্তারক্তি বন্ধ করতে। আমার মনটা যেন নাচছে।… কই তুমি খাচ্ছ না কেন? আমি কিন্তু, ভাই, কিছু মনে করো না, এক গেলাসের বেশি খাইনে। তুমি নির্ভয়ে খেয়ে যাও। বানচাল হবার বহু আগেই তোমার একটা চুলের অ্যাটুন কাঁপন দেখেই তোমাকে থামিয়ে দেব।
জিমি মনে মনে বললে, সে আবার বলতে! আস্ত বোতল গেলার মতো চিজ ইনি নন। গেলাসটা নাক অবধি তুলে ধরে একটু বাও করে বলল, আমাদের ভিতর সক্কলেই কোনও না কোনও দিক দিয়ে পুব বাঙলার সঙ্গে বিজড়িত। আমার মুরুব্বি মিস্টার সেন– হেম সেন– সিলেটে তাঁর বেশকিছু টাকা পড়ে আছে। ভিসা পাননি সেখানে গিয়ে তদ্বির করার জন্য। শেষটায় আমি যাই, সিলেটের চা-বাগান ম্যানেজার এক ইংরেজকে পটিয়ে। বাগাতে পারলুম সামান্যই এক বেহারির বাচ্চা খামোখা দিল বাগড়া পদে পদে। ওই বিচ্ছুগুলোই বি ইন দি অয়েন্টমেন্ট। আর এটা তো নিশ্চয়ই শুনেছেন, কোন এক মেজর জিয়া আজ সকালে চাটগাঁ বেতারে পুব বাঙলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন? কিন্তু ম্যাডাম, আপনার আনন্দে আমি পুরোপুরি যোগ দিতে পারছিনে। আমার ট্রাঙ্ককলের বন্ধু ঘণ্টাটাক আগে আমাকে জানাল সেই সুন্দরবন অঞ্চলের হাসনাবাদে, পশ্চিমে পদ্ম পেরিয়ে উত্তর বাগডোগরা অঞ্চলে আর এই আমাদের দক্ষিণের সিলেট বর্ডার পেরিয়ে দুটি-পাঁচটি রেফুজি আসতে আরম্ভ করেছে, অলরেডি
আর শিলচর?
যে দু পাঁচটি ওই পুব বর্ডারে ক্র করেছে, তারা নিশ্চয়ই করিমগঞ্জেই আশ্রয় নেবে। আমি রেফুজি দেখেছি অনেক। ওদের শরীরে কি কিছু আছে যে ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে দূর শিলচরে যাবে!
আমার বন্ধুরা তা হলে কাল না-ও আসতে পারে?
আপনার অনুমতি নিয়ে, কেন?
ওরা বোধহয় রিফুজিদের সাহায্য করতে চাইবে।
জিমি খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, আপনারা তো কলকাতার লোক। অপরাধ নেবেন না, আমি কিই-বা জানি। তবু বলি, সাহায্য করতে পারে কলকাতা আর দিল্লি। ড্যাডি আমাকে বলেছিল, চল্লিশের দশকে যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তখন সবচেয়ে বেশি সাহায্য আসে কলকাতা থেকে। কিন্তু কলকাতার খাস বাসিন্দারা তো অনেক পরে জানতে পারবে, তা-ও আপন চোখে দেখে নয়, ওদের কী মরণ-বচন হাল। করিমগঞ্জ, শিলচরে ভলান্টিয়ারের অভাব হবে না, আমি শ্যোর। আপনার বন্ধুরা ইনফিনিটলি বেশি সাহায্য করতে পারবেন, কলকাতাতে চাল-ডাল, ওষুধপত্র এবং টাকা- ইয়েস্ টাকা জোগাড় করে। ওঁরা তো আগরতলা, করিমগঞ্জ, শিলচরে যথেষ্ট দেখেশুনে ওয়াকিফ হয়ে গিয়েছেন। ওঁরাই পারবেন কলকাতায় পাবলিক ওপিনিয়ন ফর্ম করতে। স্যরি, ম্যাডাম।
