অতএব মার্কিন কোটিধারিণীরা বিশ্বপরিক্রমায় বেরোন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সভ্য অসভ্য নানা সৌন্দর্য উপভোগ করতে। হিল স্টেশনে অর্ধসভ্য, পূর্ণ অসভ্য সর্বশ্রেণির মানুষ সুলভ। এঁদের অনেকেই অতিসভ্য ককটেল, মাত্রাধিক মার্জিত পুরুষসঙ্গ, সর্বাধুনিক নৃত্য অত্যধিক উপভোগ করার ফলে এ সবের তরে সোয়াদ রুচি হারিয়ে ফেলেন। তারা তখন বেরোন প্রকৃতির সন্ধানে। সভ্যতা দ্বারা অকলুষিত তরুণ-তরুণীর সন্ধানে যারা পূর্ণিমা রাতে গাঁয়ের ছোট্ট নদীটির পারে পারে বাঁশি বাজিয়ে প্রিয়াকে জানায় আহ্বান, প্রকৃতিদত্ত তার দেহটি মনুষ্যনির্মিত কোনও উপাদান দ্বারা কলঙ্কিত না করে তরুণী নিমজ্জিত করে আছে তার দেহবল্লরীটি ঝরনাধারার স্বপ্নমগ্ন বালুচরের উপর। পূর্ণচন্দ্রের উজ্জ্বল রৌপ্যালোক তার ঘনকৃষ্ণ চিকূণ মসৃণ চর্মে বার বার আঘাত হেনে চতুর্দিকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে।
হিল স্টেশনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ : সমস্ত রাত ধরে পাহাড়িদের সঙ্গে নৃত্যগীতে টুরিস্ট মগ্ন হলেন, লুকোচুরি খেললেন, সমতলভূমি হলে ছোট্ট নদীটিতে জলকেলি করলেন, ওদের হোম মেড় বিয়ারে ধক্ অত্যল্প বলে বে-এক্তেয়ার হলেন না, ওদের আচার-ব্যবহার কায়দা-কেতায় খাপ খাইয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারলে ওরাই অতিথির (ঠিক শব্দ নয়, যেন ভিন্ গায়ের জাতভাই) নিঃসঙ্গতা সইবে না, গা ঘেঁষে বসে এমন এক বলা-না-বলার ভাষায় ভাবের আদান প্রদান করবে, আভাসে ইঙ্গিতে মৃদুহাস্যে লজ্জাবনত নয়নে কতনা না-বলা-বাণী দিয়ে ভিনদেশিকে সম্পূর্ণ আপন করে নেবে। সখীরা কখনও কাছে এসে, কখনও দূরের থেকে সাহসিকাকে গানে-গীতে সঙ্গ দেবে, আর কখনও-বা অশরীরিণীর মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।… পক্ষান্তরে তাঁতের ঘরে বলদ ঢোকার মতো রামপেঁচা গাড়লস্য গাড়ল কোনও কোনও টুরিস্ট ইডিয়টের মতো বেমক্কা জেব থেকে নোটের তাড়া বের করে সঙ্গিনীর হাতে ঠাস করে চড় খেয়েছে এ হেন বিপর্যয়ও অবিদিত নয়। এবং মাঝে-মধ্যে শ্রাদ্ধারম্ভ হয় সেখানেই। পরের দিন পাহাড়ি বেয়ারাদের ঠোঁট-কাটা-কোনও-একজন কাহিনীটি কীর্তন করে অন্য বেয়ারাদের কাছে এবং ক্রমে ক্রমে সেটা লেফাফা-দুরস্ত ক্লাবেও পৌঁছে যায়। এ পরিস্থিতিতে মাঝদরিয়ার জাহাজ থেকে নিষ্কৃতি কোথায়? হিল স্টেশনের সেই তো সুবিধে। চলে যাও অন্য কোনও স্টেশনে। বেটার লাক নেক্সট টাইম এট নেক্সট প্লেস, ওল্ড বয়, ও রভোয়া। রাত তো কাটল প্রকৃতির অকলুষ বাতাবরণে আনন্দঘন চৈতন্য থেকে চৈতন্যান্তরে।
দুপুরে টুরিস্ট ফের সভ্যতার উচ্চতম শিখায় আরোহণ করবে, অর্থাৎ ঝকঝকে চকচকে উচ্চ দণ্ডাসনে বসবে পেতল, স্টেনলেসের বার-এর সম্মুখে। বার-এর থাকে। থাকে স্ফটিক পাত্রে বিচ্ছুরিত হচ্ছে নানা বর্ণের রশিচ্ছটা। বার-মেড় হেথায় মেড় অব্ লিপস্টিক, রুজ, ম্যাসকারা মাখানো আঁখিপল্লব; ভুরুর স্থলে দুটি বঙ্কিম রেখা যেন অনঙ্গ বিহঙ্গ এই এক্ষুনি দুটি বিস্তৃত পক্ষ সামান্যতম কম্পন লাগাতে না লাগাতেই বিলীন হয়ে যাবে দিকচক্রবালে। মাথায় প্রতিদিন নিত্য নবীন কবরী। কভু-বা বাবুই পাখির বাসা, কভু-বা ব্রোন্টের আঁকা বিদেশি সদাগরের পাগড়ি-পরা, কভু-বা মুণ্ডুটা যেন আস্ত একটা টি-পট– তার উপরে বসিয়ে দিয়েছে ভুটানি টি-কোজি।
উত্তম উত্তম পানীয়। দূর থেকে ভেসে আসছে বিলিতি বাদ্যির বাজনা। দু চক্কর শটিশে বা পেনশনারদের মতো মন্থরগতিতে সম্মুখপানে মর্নিং ওয়াক, মন্থরতর গতিতে প্রত্যাবর্তন– ল্যামবে ওয়াক।
কিন্তু বেচারী জিমি সভ্যতার এ প্যাটার্নের সঙ্গে নিজেকে কখনও খাপ খাওয়াতে পারেনি। চা বাগিচার রদ্দি থার্ড ক্লাস ইংরেজও যে ভিতরে ভিতরে তাকে অ্যাংলো বলে তাচ্ছিল্য করে সে সেটা আট বছর বয়সে প্রথম স্কুলে গিয়েই টের পেয়েছে, পরে অপমানিত বোধ করেছে, এখন অনেকটা সয়ে গিয়েছে। কারণ বিজনেস ইজ বিজনেস, খদ্দেরকে সন্তুষ্ট করতেই হবে, হোক সে পাড় মাতাল, লম্পট ইংরেজ, হন তিনি মার্কিন লক্ষ ডলারের মালিক।
সেইখানেই তো সঙ্কট। সে বড় হয়েছে তার কট্টর পুরিটান পিতার হাতে। তার মনে কোনও দ্বিধা ছিল না যে, হোটেল বার-এ যে সভ্যতার প্যাটার্ন বিরাজ করে সেটা খ্রিস্টানদের কলঙ্ক। কারণ এসব নারকীয় উচ্ছঙ্খলতা এদেশে প্রবর্তন করে ইংরেজ এবং তারা খ্রিস্টান।
তদুপরি জিমির চেহারাটি যেমন মধুর হাসলে দু পাটি দাঁত ঝলমলিয়ে ওঠে শরীরটাও তেমনি দড় মজবুত। সুন্দুমাত্র তার কব্জি কতটা চওড়া একবার তাকিয়ে দেখলেই হয়, বুকের পাটা থাক্। মার্কিন টুরিস্টিনীদের কেউ কেউ সর্বভুক, দূরের অনেককে নিকটতম বন্ধুরূপে পেতে চান। ঠেকাবে কী, কে? ডলার নেই?
একথা সত্য যে ম্যানেজার, প্রোপ্রাইটারের ইচ্ছা এটা নয় যে জিমি অনিচ্ছায় হোটেলের বেসরকারি জিগোলো–পুং বেশ্যা–রূপে মার্কিন মহিলাদের সঙ্গ দিক। অবশ্য এটাও সত্য, ব্যাপারটি জানাজানি হয়ে গেলে হোটেলের কিছুটা বদনাম হবে। সেটা তাদের স্বার্থবিরুদ্ধ। পক্ষান্তরে জিমির অনমনীয়তায় ক্রুদ্ধ হয়ে কোনও মার্কিন যদি পরদিন জিমির বিরুদ্ধে উল্টোপাল্টা অভিযোগ আনেন সেটাও হোটেলের সুখ্যাতিকে ক্লিষ্ট করে আর জিমির পক্ষে ভয়াবহ সঙ্কট।
হোটেল-ম্যানেজারকুল উকিল ডাক্তারের চেয়েও বহুদর্শী। ম্যানেজার জানে অভিযোগ মিথ্যা।
