কী ভাবনা তব ওহে সৈনিক,
হোয়ো নাকো ম্রিয়মাণ।
না, না, না– ফটিকাধার থেকে শিরাজের লাল পানি নিচ্ছ কেন, রসরাজ। যদি তুমি এখন ঢাকেশ্বরীর প্রসাদাৎ প্রাসাদে দুর্বার স্কন্ধাবার নির্মাণ করে থাক তবে আনাও না রক্ত, জোয়ানদের তাজা খুন, রমণীদের অঙ্গরক্ত। বুড়িগঙ্গার পানি তো ডুবে মরেছে উপরের রক্তস্রোতের চাপে। কোনও লাস্যবতী ন্যাকরা করে বলতে পারবে না, বঁধু রঙ দিয়ো না গায়।
তুমি তো দিচ্ছ রক্ত। ড্যাম ইয়োর রঙ।…
সাতাশে মার্চ শিপ্রা ধীরপদে গেল রাত এগারটায় হলঘরে। উইলসন মাস্টার ছোট্ট একটা কমজোর বালব ছাড়া, সবকটা আলো নিভিয়ে ঝিমুচ্ছে। যেন ঘিয়ের পিদিমের আলোতে একটা বাচ্চা ছেলে ঘুমুচ্ছে। কোনওপ্রকারের শব্দ হলেই সে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে নিদ্রালু ভাব কাটবার আগের থেকেই জপ করতে আরম্ভ করে, ইয়েস্ প্লিজ! হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ। কিন্তু শিপ্রা এসেছে অতিশয় নিঃশব্দে। এবং তার পায়ে দিল্লির বিল্লি মোরান মহল্লার সেলিম-শাহি– এর সোল নাকি তৈরি হয় চামচিকের ডানা পিটে পিটে; সত্য নির্ণয় কঠিন। শিপ্রা দুই হাত আড়াআড়ি বিছিয়ে তার উপর বুকের ভর দিয়ে দিয়ে চুপসে দাঁড়িয়ে রইল। দেখছিল, সরল কিশোরের তন্দ্রা তার মুখচ্ছবি কী মধুর আর সরলতর করে দিয়েছে। এরকম আদুরে আদুরে মুখ থাকলে কি কিশোর, কি যুবা, কি শিশু সবাইকে কন্টিনেন্টে বলে মাদার ডার্লিং মায়ের দুলাল।
একসময় জেগে উঠবেই। ধড়মড়িয়ে দাঁড়িয়ে গুড়– সম্পূর্ণ করার পূর্বেই শিপ্রা শুধল, জিমি, সে, ইউ গট ব্র্যান্ডি, কন্যা–ফ্রেঞ্চ?
জিমি থ। ইনি অবশ্যই সোসাইটি লেডি। এর চতুর্দিকে যে আবহাওয়া সে তো সোসাইটি লেডিরই উপযুক্ত, এবং সে-ও ইলিয়ট রোডের প্রাচীন দিনের অ্যাংলো– মদ্যের সঙ্গে শিশু বয়েস থেকে তার পরিচয়– তবু এ লেডির সঙ্গে কন্যা কেন, ব্র্যান্ডির ফোঁটা পর্যন্ত খাপ খাওয়াতে পারল না। যেরকম তার ড্যাডি। পাল-পরব ভিন্ন তাকে সে কখনও সে পাশ মাড়াতে দেখেনি।
জিমি : সার্টেনলি, সঙ্গে সোডা, না প্লেন জল?
সোডা আর জল দুই-ই। আর দুটো ওয়াইন গ্লাস নিয়ে আসবে, সঙ্গে করে। কিন্তু বঁ দিয়ো ইয়াল্লা– কাউন্টার সামলাবে কে?
কী যে বলেন, মাদাম! বেয়ারা রেখে যাব। সে ডেকে দেবে। কিন্তু এখন তো বড় কিছু একটা কাজ থাকে না।
শিপ্রা কটেজের ড্রইংরুমে জিমিকে মুখোমুখি বসিয়ে হিয়ার ইজ লাক! বলে জিমির গেলাসে আপন গেলাসের সঙ্গে টক্কর লাগিয়ে টুং করে ধ্বনিতরঙ্গ জাগাল।
জিমির বয়স কম হলেও বড় হোটেলের রিসেপশনিস্ট্ররূপে তার অভিজ্ঞতা হয়েছে বহু বিচিত্র এবং প্রচুর। সে তাগড়া জোয়ান, চেহারা মিষ্টি মিষ্টি, সব্বাইকে আপ্যায়িত করতে হামেহাল তৈরি। বিস্তর চা-বাগানের মেমসায়েব, নেটিভ মেমসায়েব, সোসাইটি লেডি, মার্কিন টুরিস্টিনী হিল স্টেশনে আসে নিছক যৌনক্ষুধা পরিতৃপ্ত করতে। তাদের ভিতর আবার গড় ড্যাম পার্ভার্ট। কলকাতায় পুরুষরা বড় বড় হোটেলে ঢলাঢলি করেন। শঙ্কর তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে সে-নাটকের অত্যুত্তম বর্ণনা এবং নিতান্ত নৈর্ব্যক্তিক পদ্ধতিতে যে রস সৃষ্টি করেছেন, সেটি গৌড়জন আনন্দে করিছে পান সুধা নিরবধি। অবশ্য ঢলাঢলির জন্য রমণী দরকার। অতএব তেনারাও আছেন, কিন্তু সেখানে তারা প্যাসিভ উপাদান মাত্র, যেমন হুইস্কি। কিন্তু বোম্বাই-কলকাতাতে যৌন-ক্ষুধাতুরা রমণীরা সক্রিয় স্বাধীন পদ্ধতিতে রতি-সখার সঙ্গসুখ উপভোগ করার জন্য বড় বড় হোটেলের সদ্ব্যবহার করতে ঈষৎ কুণ্ঠিত হন। ফলে বংশানুক্রমে এঁরা যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন সেটা বহুবিধ পথ আবিষ্কার করেছে। তার মধ্যে দুটি পন্থা উৎকৃষ্ট। জাহাজে করে দরিয়ায় দরিয়ায় ভাসতে ভাসতে নব নব যৌনাভিজ্ঞতানন্দ সঞ্চয় অত্যুত্তম বটে, কিন্তু যদি অত্যধিক, সহ্যাতীত উৎকট উৎঙ্খলতার দরুন সঙ্কট দেখা দেয়– যদিও এস্থলে পরিষ্কার বলে রাখা ভালো, এসব টুরিস্ট জাহাজের অধিকাংশই ইহভুবনে সর্বজনবিদিত, সমর্থিত জলচর সোনাগাছি–সোনাগাছিকে অপমান করা এ পুস্তকের উদ্দেশ্য নয়– তখন কাপ্তেনের আদেশে কাট, আউট কেবিনে রুদ্ধাবস্থা থেকে সে রমণী মুক্তি পায় কী প্রকারে? অথচ প্রতি রাত্রে কোটিপতিনীর অসহ্য প্রয়োজন একটা তাগড়া জোয়ানের, কোনও কোনও স্থলে একাধিক। কথিত আছে, রাশার জারিনা কাতেরিনার জন্য প্রতিদিন নিত্যনতুন গার্ড অব অনার উপস্থিত রাখা হত, নিত্য নবীন বলিষ্ঠ প্রিয়দর্শন আর্মি-অফিসার দ্বারা নির্মিত। মহারানি ফাইলের সম্মুখ দিয়ে ধীরপদে যেতে যেতে যাকে সে-সন্ধ্যার নৰ্মসখারূপে উৎকৃষ্ট মনে হত তার দিকে এক মুহূর্তের শতাংশেক মাত্র চোখের একটি ঝলক বুলিয়ে দিতেন। মহারানির সহচর বয়স্যের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ক্ষুরধার অসিকে এক কটাক্ষে দ্বিখণ্ডিত করতে পারত। মানুষ মাত্রেরই ভ্রান্তি হয় এ প্রবাদটি বক্ষ্যমাণ বয়স্যের ক্ষেত্রে নিতান্ত অপ্রযোজ্য। যমরাজ সম্বন্ধে সুপ্রচলিত গল্পটির ট্র্যাজেডি অব এরর তিনি কুত্রাপি কদাচ ঘটাতে দেননি কিংবদন্তি সে-বিষয়ে সবিশেষ সোচ্চার।
কিন্তু মার্কিন কোটিধারিণীরা যা-ই করুন না কেন, জারের আর্মি অফিসারদের মতো বিশ্ববাছাই সুদর্শন যুবক সংগ্রহ করা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব। কারণ জারের আর্মিতে বা রাজদরবারে প্রবেশ করার গৌরব তথা অর্থলাভার্থে পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকে বাছাই বাছাই সুদর্শন, দুঃসাহসী, দ্ৰাচরণসম্পন্ন যুবক আসত সেন্ট পিটারসবুর্গে, মস্কোতে। রুশের কালিদাস কবিসম্রাট পুশকিন্-এর মাতামহ মূলত ছিলেন আবিসিনিয়ার হাবশি– পিটার দি গ্রেটের ফৌজে তিনি জেনারেল পদে উন্নীত হয়েছিলেন। আজ কি নিকসন, কি মাও সে তুং এ সম্মেলন করতে অক্ষম। ন্যাশনালিটি তার বিষফল পাসপোর্ট স্বদেশে আপন নাগরিকতা না হারিয়ে ভিন্ন দেশের ফৌজে ঢোকা আজকাল প্রায় অসম্ভব। শ্রীসুভাষের ফৌজ হিটলার বা মিকাডো-ফৌজের অঙ্গরূপে শপথ নেয়নি। এ তত্ত্বটির প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করি, কারণ বাঙলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পূর্বে ও পরে এ সমস্যা দেখা দিয়েছিল।
