প্যোরেস্ট অব দি প্যোর অহমসন্তান বড়য়া সমস্তক্ষণ দু কান-ছোঁয়া মৃদু হাস্য, তৎসহযোগে ঘাড় নেড়ে নেড়ে, অফ কোর্স, সার্টেনলি, টাকার কথা কে তুলেছে?– নট মি, বহক, ম্যাডাম, বহক, চেয়ারতায় বসূটে আজ্ঞা হোক মৃদু কণ্ঠে বলে যাচ্ছে তো বলেই যাচ্ছে। শিপ্রা দু একবার আপত্তি তোলবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিল।
প্লাগে কনেকট করতে আর তার লটকাতে ক মিনিট লাগে। নিডল একটু ছুঁতে না ছুঁতেই মেলবার্ন গাক গাঁ করে উঠল, এরিয়ালের উদ্বাহু, বামন বেতারের কল্যাণেই। ইতোমধ্যে দেখতে পেল এসে গেছে অহম দেশের গভীরতম অরণ্যের গগনচুম্বী বংশাবতংশদ্বয়। এ-হেন এরিয়েল দিয়ে কটকের চিউ চিউ মিউ মিউ থেকে টোকিয়োর গাক গাক শোনা যাবে পরিষ্কার– দাঁতমুখ খিঁচিয়ে স্পিকারে কান না সেঁটেও!
সমস্ত দিন কাটল শিপ্রার এ-স্টেশন ও-স্টেশন শুনে শুনে।
বিশেষ করে কলকাতার ডি সি বেতার রিসেপশন এতই পীড়াদায়ক যে, সে সেখানে তাদের যন্ত্রটাকে কয়েক মাস নাড়াচাড়া করে একদম তালাক দিয়েছিল।
এখানে কী লাক!
প্রথম সন্ধ্যাতেই, পিন্ডি থেকে নিডল একটু সরে যেতেই শিপ্রা শুনতে পেল পরিষ্কার যদিও ঈষৎ মৃদু কণ্ঠে, ইসি পারি, ইসি পারি। এখানে প্যারিস এখানে প্যারিস, মেমোয়েজেল, মেদাম–।
শিপ্রা মুহ্যমান! কত বর্ষ, কতকাল পরে সে শুনতে পেল সেই প্রাচীন যুগের নিত্যদিনের সঙ্গী ইসি পারি, ইসি পারি। সংবিৎ হারিয়ে প্যারিস দিচ্ছিল খবর- সে কথা কইতে লাগল প্যারিসের সঙ্গে উই উই– হা হা, মে সার্তেনমা– নিশ্চয় নিশ্চয় তার পর কী একটা অনিবার্য দুর্ঘটনার সংবাদে মে ক্য ভুলে ভু–আহা, তার আর কী করা যায়–ফ্রানসবাসী যে কোথাকার কোন এক কনফারেনসে তাদের ফরেন মিনিস্টার যাচ্ছেন না শুনে মোটেই বিচলিত হয়নি শুনে শিপ্রা ঘাড়-গর্দান ত্যাগ করে মুখ বেঁকিয়ে বলল, জ্য মা ফু অসি– আমো থোড়াই কেয়ার করি।
কে যেন দরজায় নক করল। শিপ্রা তখন প্যারিসে।
আঁত্রে, সিল ভু প্লে–ভিতরে আসুন প্লিজ। যেই দেখল ঢুকেছে সেই জোয়ান সিলেটি বেয়ারা, অমনি কোথায় মিলিয়ে গেল প্যারিস! একটা ফু-তে নিভে গেল পিদিমটি। অন্ধকার।
.
০৫.
শিপ্রা ইংরেজি, ফরাসিস, বাংলা বুঝতে পারে ভালো, কিছুটা হিন্দি।
সকালে মেলবার্ন হতে যাত্রা আরম্ভ করে পিন্ডি, দিল্লি হয়ে বিবিসি, দুপুরে জর্মনির কলোন, সন্ধ্যায় প্যারিস। সর্বশেষে চীন আর রাশা। ইতোমধ্যে হয়তো উটকো আজারবাইজান থেকে শুনল ফরাসিতে কিংবা ভয়েস অব আমেরিকা থেকে বাংলাতে।
ফলে সবকিছু গেল ঘুলিয়ে। পরে কিছুতেই মনে পড়ল না স্বাধীন বাংলা বেতারের বাক্যস্ফূর্তি হয়েছিল কোন দিন, আর, ঢাকা বেতার লীগ-প্রেমীদের হাত থেকে খানরা ছিনিয়ে নিল কোন সময় ছাব্বিশের সকালে। বস্তৃত ঠিক সে সময় শিপ্রা বেতার কিনতে বাজারে গিয়েছে। তবে তার ভাসা ভাসা একটা ধারণা হয়েছিল, খানদের অমানুষিক অত্যাচার এবং পাশবিক বর্বরতার সর্বপ্রথম সংবাদ দেয় এবিসি।
শেষপর্যন্ত শিপ্রার হৃদয়ঙ্গম হল, বিস্তর স্টেশন শুনে বিশেষ কোনও লাভ হয় না। পঞ্চপাণ্ডবের চেহারা হুবহু এক রকমের হলে দ্রৌপদী নিশ্চয়ই আপত্তি জানাতেন। এস্থলে গোটা পাঁচ বিবিসি, মার্কিনি এবং গোটা দুত্তিন, একুনে ওকিবহাল পঞ্চ স্টেশন বিস্তর মেহনত ও দেদার পয়সা ঢেলে খবর সংগ্রহ করে; বাদবাকি কুল্লে দুনিয়ার বুড়ি বুড়ি স্টেশন এদের সঠিক সার্টিফিকেট প্রাপ্ত কার্বন নন বটে কিন্তু ওই পঞ্চপাণ্ডব প্রদত্ত সংবাদের বিভিন্ন রকমের ঘাট বানিয়ে বিতরণ করে। শিপ্রার এত প্যারা যে ইসি পারি তিনি পুব বাংলা বাবদে প্রায়শ উদাসীন কিন্তু যখন নিন্দে করতে চায় তখন বিবিসির মতো পিন-পিনিয়ে শ্যাম-কুল রক্ষা না করে, দ্যায় চুটিয়ে গালাগাল এবং মাঝে মাঝে একটা হুলো আর মেনী বেড়াল গালগল্পের মাঝখানে এমন সব বর্ডার-ছোঁয়া আদি-রসাত্মক মাল ছাড়ে যে আমাদের একস-প্যারিসিনী শিপ্রা ভিন্ন– মেয়ে নয়– যে কোনও পুরুষেরই পিলে চমকে উঠত।
লিবেরতে, লিবেরতে তুজুর লা লিবেরতে।
কোন বেতার কতখানি লিবেরতে উপভোগ করে সে প্রশ্নটা শিপ্রার মনে আবার উদয় হল। বছর কয়েক আগে সে পাক-ভারত লড়াইয়ের সময় বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে আর-সবাই শুনতে চায় বলে সে-ও সঙ্গ দিয়ে কয়েকবার বিবিসি শুনেছিল। এখন মাত্র দু দিন অবশ্য বেশ বার-কয়েক–বিবিসি শুনে তার মনে হল দায়িত্ববোধ মাত্রাধিক বেড়ে যাওয়ার ফলে সে ক্লীব হয়ে যাচ্ছে। আধ-ফর্সা সুন্দরীর আপন ফর্সা বাঁচানো সম্বন্ধে দায়িত্ববোধ যখন বড্ড বেশি বেড়ে যায় তখন সে যেমন রোদ্দুরে বেরুতে চায়। চিন্তা করে শিপ্রা সিদ্ধান্ত করল, এখন বিবিসির মূল্য নেতিবাচক। অমূক গুরুত্বপূর্ণ নিউজ-আইটেমটা পুব পাকের প্রতিবেশী বর্মা বেতার দিয়েছিল সকালবেলা, সেদিন তো নয়ই, পরের দিনও বিবিসি সেটা উল্লেখ করল না, এমনকি বর্মার বরাত দিয়েও না। অতএব খবরটার সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ করার যথেষ্ট অবকাশ আছে।
ইতোমধ্যে পশ্চিম পাক বেতার যে একটাই রেকর্ড অনবরত, কিবা দিন কিবা রাত্রি, বাজিয়ে চলেছে তার ধুয়ো তামাম পূরব বাঙালময় অখণ্ড শান্তি, অপার নিরাপত্তা। ওইটা যে হবে সে তো নিতান্ত স্বাভাবিক। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রপাগান্ডা বিশারদ হের ডক্টর গ্যোবেও শেষপর্যন্ত আপন প্রপাগান্ডার হাড়কাঠে মুণ্ডটি হারালেন। বার্লিনের পতন কখনও হবে না, বার্লিন কস্মিনকালেও পরাজিত হতে পারে না এ জিগির তিনি শত শত বার শুনিয়েছেন বেতারে, বিশেষ বিশেষ বুলেটিনে, মার্চ ম্যাজিকের তেজীয়ান তালয়সহ, বলীয়ান রণদামামা সহযোগে বিশ্বাসী অবিশ্বাসী বার্লিন নাগরিকদের আজ যে রকম হুবহু পৃথিবীতে শান্তি অন্তরীক্ষে শান্তি জিগির গাইছেন চোটা ডিকটেটর ইয়েহিয়া– বার্লিন পতনের পূর্ব মুহূর্তে সেই কাপ্তান গ্যোবেলস্ নিমজ্জমান বার্লিন-মানওয়ারি জাহাজ থেকে খালাসি-লস্করকে আপন আপন নসিবের হাতে সমর্পণ করে এক লাফে লাইফ-বোটে আশ্রয় নেবেন কী করে? সে তো অনেক দূরের কথা– ইয়েহিয়ার তরে, এখন। এখন তার জীবনপুঁথির নয়া পাতা সে উটিয়েছে মাত্র। কিংবা সে নব-বর। আতশবাজির ফাঁকা আতশ আগুন নয়, উৎসব-বহ্নি দাউ দাউ করে জ্বলছে, জ্বালাচ্ছে হাট-বাড়ি, মন্দির-মসজিদ। কাঁচা বাঁশের খুঁটি আগুনে তেতে উঠে যে বিকট শব্দে ফেটে উঠছে তার কাছে কোথায় লাগে পাঠানের বিয়েতে রাইফেলের ফাঁকা আওয়াজ? লোকে বলে ইয়েহিয়া পাঠান, আসলে সে শিয়া দারওয়ান গুষ্টির ছেলে, জাতে কিজিলবাশ, পাঠান কুত্রাচ শিয়া হয় না। বিয়ের বর্ণ লাল, লালে লাল, রক্ত লাল। আবির আর পিচকারি মারার তরে লাল রঙের কী প্রয়োজন? মোগল ছবিতে হোলির দিনে, বিয়ের সাঁঝে পাঠান মোগল হারেম-মহিলারা পিচকারি দিয়ে টকটকে সুগন্ধি লাল জল– সুখ-আ মারতেন একে অন্যের তনুদেহে- এন্তের মোগল তসবিরে আছে, মুসলিনের দু পাট্টা, সোনার চুমকিদার উড়িষ্যার ফিলিগিরি রুপোর তার আর রেশমি সুতোয় বোনা সদরিয়া ভেদ করে সিক্ত করে দিয়েছে শুভ্র ফেননিভ সিত কুঞ্চলিকা। নৃত্যের তালে নীবিবন্ধ শিথিল হতে শিথিলতর হয়ে উন্মোচিত করে দিয়েছে নাভিপদ্ম। লক্ষ্য ভেদ করো, মারো পিচকারি, হে হারেমরাজ নটবর ইয়েহিয়া মহরমের শুক্রের রাতে। কী? রক্তরাগরঞ্জিত বারি আর নেই!
