সর্বপ্রথম এবং সর্বপ্রধান সংবাদ। ঢাকায় কাল রাত থেকে লেগে গেছে ধুন্ধুমার। অন্য কোন কোন জায়গায় সে খবর সঠিক কেউ বলতে পারেনি তবে খুব সম্ভব সব ক্যান্টনমেন্ট টাউনে। জোর দিয়ে বার বার বলল, শিলচর ইজ সেফ–পাকা খবর।
কী করে শ্যোর হলে জিমি?
গুড লর্ড! আমি আমার ট্রাঙ্ক-বন্ধুদের অতিষ্ঠ করে তুলিনি, সেই ভোরবেলা থেকে, শিলচরের খবর জানাতে? মুচকি হেসে বলল, ওরা হয়তো ভেবেছে আমার ফিয়াসে বুঝি শিলচরে।
আরেকটা ইমপর্টেন্ট খবর, মাই লেডি, পাক আর্মি ইন্ডিয়ান এলাকায় ঢুকবে না এইটেই ৯৯% রিপোর্টার স্বামীনাথন তো বলল, সে তার লাস্ট শার্ট বেট করতে রাজি আছে? অতএব শিলচর ভেরি সেফ।
সিলেটের খবর?
গলা নামিয়ে বললে, ভালো নয়, মন্দও নয়। তবে স্বামীনাথন জোর গলায় বলল, সে নিজে জানে সিলেটে পাঞ্জাবি পাঠান সেপাই অতি অল্প নেগলিজেবল!
শিপ্রা একটু চিন্তা করে বললে, দ্যাট ইট। বল তো, জিমি, এখানকার সবচেয়ে সরেস রেডিয়ো-ডিলার কে?
গুডনেস মি! সে তো আমার ইয়ার বরুয়া। নাইস চ্যাপ। কিন্তু ম্যাডাম আপনি টাকা দেবেন না। শুধু দামটা জিগ্যেস করবেন। তার পর দেখি তার দৌড় কদ্দূর।
টাকা না দিলে—
দেবে না? মানে? হেভেনস্। ন টার সময় দোকান খোলে যাকে বলে কারেক্ট টু দি গান।
কী দরকার দর-কষাকষি করে?
প্লিজ, ম্যাডাম। আমাকে অন্তত একটা চান্স দিন। আপনি এখন খুশি। লেট মি বি হ্যাপি ওলসো।
শিপ্রা এখন গুজব, খবর, ব্লা, প্রপাগান্ডা, সব শুনতেই রাজি।
কাঁটায় কাঁটায় ন টায় বরুয়ার দোকানে গেল ট্যাক্সি করে। সর্দারজি ঢাকা, কুমিল্লার যেসব রোমাঞ্চকর গুল্-ই-বাকলির কেচ্ছা শোনাল তার কাছে জিমির রিপোর্ট সরকারি ইশতেহারের মতো পানসে, বলে অনেক মিন করে নাথিং, যেন হাওয়ার কোমরে রশি বাঁধা। কোনওপ্রকারের উসকানি শিপ্রাকে দিতে হয়নি। সেদিন ডিকটেটর ইয়েহিয়ার কাহিনীই সকল কাহিনীর ডিকটেটর। এমনকি পুঁচকে ডিকটেটর ইয়েহিয়ার তুলনায় দানবকায় বড়া ডিকটেটর হিটলারের অতর্কিত রুশ আক্রমণের খবর তার দুশমন চার্চিল-রুজভেল্ট দুজনাই জানতেন ও স্তালিনকে মাসখানেক পূর্বে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। মুসসোলিনির অতর্কিত গ্রিস আক্রমণের পূর্বাভাস হিটলার পাননি। আমাদের পুঁচকে ডিকটেটর হেইয়া সাব কিন্তু কুল্লে ডিকটেটরকে এ বাবদে ঘোল খাওয়ালেন। শেখের সঙ্গে সন্ধির কথাবার্তা দিনের পর দিন তিনি যখন চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন পশ্চিম পাক থেকে তিনি আনাচ্ছেন টর্নেডো বেগে হাজার হাজার পাঠান-পাঞ্জাবি সঙ্গে সঙ্গে দিনের পর দিন। ২৫ মার্চের দুপুররাত পর্যন্ত ঢাকার অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করত, ইয়েহিয়া-মুজিবের মধ্যে একটা ফয়সালা হয়ে গিয়েছে। সদর (শব্দার্থে চক্রবর্তী) ইয়েহিয়া দু একদিনের মধ্যেই ফৈসালার বিবরণ প্রকাশ করবেন। ২৬ মার্চ সকালে ইয়েহিয়া-ভুট্টো-মুজিবের সম্মিলিত হওয়ার পাক্কা এপয়েন্টমেন্ট। ২৫ মার্চ বিকেল পাঁচটায় ইয়েহিয়া ঢাকা ত্যাগ করলেন মুজিব এমনকি তাঁর বামহস্ত ভুট্টোকে পর্যন্ত কোনও খবর না দিয়ে। সেদিন সে খবর জানতে পারল অতি অল্প লোকই। খোদ ঢাকা শহরেও। আর্মি অফিসার ইয়েহিয়া তাবৎ সিভিলিয়ান ডিকটেটরদের শিখিয়ে দিল একটি নবীন তত্ত্ব। আর্মি ডিসিপ্লিনে যে কোনও প্ল্যান গোপন রাখা অফিসারদের ধর্ম–সিভিলিয়ানের পক্ষে সেটা অস্ত্রমাত্র।
শিলঙ জানতে পেরেছে ২৬ মার্চ সকালে ধুন্ধুমারের খবর। যুদ্ধারম্ভের পূর্বেই ঢাকার রণাঙ্গন থেকে জঙ্গি লাটের পলায়ন- যথা, দুর্যোধনের হৃদয়ে সাহস দেবার জন্য শঙ্খ না বাজিয়ে পিতামহ ভীষ্ম যদি চুপিসাড়ে পুস্পক প্লেনে পলায়ন করতেন, তোবা! তোবা শুনলেও পাপ হয়– এ খবর হয় তো লাগে তাক না হয় তুঙ্কারূপে কোনও কোনও ফলিত জ্যোতিষী অনুমান করেছিলেন মাত্র। ড্রাইভার সর্দারজি হয়তো পূর্বজন্মে জ্যোতিষী ছিল।
শিপ্রার স্মরণে এসেছে, আগরতলায় মিঞা সাহেবের কথা।
তা হলে শিয়া ইয়েহিয়া শেষ পর্যন্ত মহররমের পবিত্রতা বিনষ্ট করে ওই মাসেই নরহত্যায় লিপ্ত হল।
ইসলামি পঞ্জিকা-খানাতে শিপ্রা শনৈঃ শনৈঃ অগ্রসর হচ্ছিল বটে, কিন্তু ঠিক যে স্থলে সংক্ষেপে বলা হয়েছে, মুসলমানি হিসেবে দিবস আরম্ভ হয় সন্ধ্যা থেকে, সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে, সে অবধি পৌঁছয়নি। ২৫ মার্চ দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। কিন্তু সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আরম্ভ হয়ে গিয়েছে বিশ্ব মুসলিমের স্যাবাৎ পবিত্র জুম্মাবার, শুক্রবার। কট্টর শিয়া আরম্ভ করলেন তার নরহত্যা শিয়া-সুন্নি উভয় সম্প্রদায়ের পবিত্র জুম্মাবার রাত এগারোটায়, সুন্নির কাছে পবিত্র, শিয়ার কাছে পবিত্রতম মুহরম মাসে!
শিপ্রা দোকানে ঢুকে বেছে নিল সবচেয়ে ভালো বেতারযন্ত্র– পরের মুখে ঝাল না খেয়ে সে স্বকর্ণে শুনতে চাইল ঢাকা, কলকাতা, পিভি, বিবিসি এবং জোরদার বিদেশি স্টেশনগুলো। দাম শুনে শুধাল সর্বোত্তম এরিয়ালের সরঞ্জাম বরুয়ার লোক হোটেলে ফিট করে দিয়ে আসতে পারবে কি না, তার চাই আজই, এখুনি। বলতে না বলতে জিমি এসে উপস্থিত। মাদামকে আরেক দফা সুপ্রভাত জানিয়ে তাকে বলল, আপনার সেট পছন্দ হয়েছে? গুড়। এবারে আপনি সেটটি সঙ্গে নিয়ে যান, আর এই লাগিয়ে দিচ্ছি ঘণ্টা দুয়েকের তরে মোস্ট টেম্পরারি একটা এরিয়েলের তার। তারের অন্য প্রান্তটা কোনও একটা জানালা দিয়ে বাইরে ঝুলিয়ে দেবেন। দাঁড়ান, এই আমি ১৩ মিটারে লাগিয়ে দিচ্ছি। নিডলটা। ডাইনে-বাঁয়ে ওটাকে সামান্য নাড়লেই পেয়ে যাবেন এবিসি, আই মিন অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি না করপোরেশন কী যেন? মিনিট পনেরো পরেই পেয়ে যাবেন নিউজ বুলেটিন। ইন্ডো-পাক খবর বিতরণে এরা প্রায়ই বিবিসিকে কানা করে দেয়। টাকা? সে আপনি আমাকে বরুয়ার নামে চেক দিয়ে দেবেন অ্যাকাউন্ট পেয়ী। অবশ্য সেটা পছন্দ হলে। নইলে আজ বিকালে আমি বরুয়ার সেটটা– বেস ইন দি ইটা অব সুয়েজ, মাদাম। বলে সেট তুলে নিয়ে চলল মাদামকে আধ বোটের মতো পিছনে পিছনে টেনে।
