শিপ্রা মৃদু কণ্ঠে দরদভরে বলল, আমেন।
সঙ্গে সঙ্গে বহুদিনের অনভ্যাস সত্ত্বেও, ফরাসিদেশের আর পাঁচজনের মতো অজানতেই ডান হাত দিয়ে বুকের উপর ক্রসচিহ্নের প্রতীক দেখাল।
উইলসন একটু লজ্জা পেল। বিধর্মী পালন করল সেই আচার– সে যেটা সমাজে পাঁচজনের অযথা দৃষ্টি আকর্ষণ না করার জন্য আপন সমাজের বাইরে এড়িয়ে যেত। কটেজের সামনে পৌঁছে বলল, গুড নাইট, ম্যাডাম। এনি থিং এলস্ আর কিছু?
এই অস্বস্তিজনক পরিস্থিতিতেও তার মনে পড়ল– প্রাচীন স্মৃতি নবীন পরিস্থিতির বিনা অনুমতিতেই উদয় হয় প্যারিসের রেস্তোরাঁতে ওয়েটার খানা অর্ডার দুফে দফে শেষ হওয়ার পর যখন জিগ্যেস করত, এনি থিং এলস্ মাদাম তখন তাদের মধ্যে বেপরোয়া মেয়ে বলে উঠত, হ্যাঁ, তোমার প্রেম!
শিপ্রা বললে, থ্যাঙ্ক ইউ, গুড নাইট, ইয়াং ম্যান্। মা মেরি তোমার মঙ্গল করুন।
কুটিরে ঢুকে শিপ্রা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ভুলে গিয়েছে এর পর কী করতে হবে, তার পর কী, শুয়ে পড়বার আগে। মাথাটা যেন ভেকুয়াম। এবং সে বোধশক্তিও নেই। হাতমুখ ধোয়া, কাপড় ছাড়া, এসব নিত্য রাতের যান্ত্রিক রীতি– তবু–
এমন সময় কাঠের বারান্দায় দুমদাম করে পায়ের শব্দ হল। ছুটে আসছে কেউ। হঠাৎ একেবারে চুপ। আস্তে আস্তে দোরে টোকা। মৃদু কণ্ঠে মাদাম, টেলিগ্রাম।
তার হাত কেঁপেছিল কি না, পরে স্মরণ করতে পারেনি। শুধু একসপেরিমেন্ট করে দেখেছিল বারান্দার ক্ষীণালোকে টেলিগ্রামটা পড়া যায় কি না। তখন কিন্তু পেরেছিল।
বেচারা জিমি ঠায় দাঁড়িয়ে।
যেই দেখল, শিপ্রার মুখে হাসি ফুটেছে, ভদ্র হোটেলের বেবাক এটিকেট ভুলে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, গুড় নিউজ, ম্যাডাম?
থ্যাঙ্কু। হ্যাঁ। জিমির তিন লম্ফে পলায়ন।
শিলচর থেকে তার। সাতাশ তারিখে পৌঁছাচ্ছি। কী খান।
.
০৪.
শিলঙকে বলা হয়, হিল স্টেশনের রানি– রাজা কে? দার্জিলিং
রবীন্দ্রনাথ দুটো তুলনা করেছেন অতিশয় সঙ্কীর্ণ পরিসরে :
দার্জিলিঙের তুলনাতে ঠাণ্ডা হেথায় কম হবে,
একটা খদর চাদর হলেই শীত-ভাঙানো সম্ভবে।
কিন্তু দার্জিলিঙের সঙ্গে তুলনা না করে তার পর শিলঙের যে-বর্ণনা দিয়েছেন তাতে শিলঙের প্রায় কোনও মাধুরিমাই বাদ পড়েনি। যে পাইন বন শহরে পৌঁছুবার বহু আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় সেটাই শিলঙের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। রবীন্দ্র কবিতাতে দু দুবার তার উল্লেখ করেছেন।
খুব ভোরেই শিপ্রার ঘুম ভেঙেছে। কিন্তু এই পাইন বনের অকল্যাণে বিশেষ করে যেখানে বনটা নিবিড় ঘন– কবি বর্ণিত :
এখানে খুব লাগল ভালো গাছের ফাঁকে চন্দ্রোদয় সেই চন্দ্রোদয়, সূর্যোদয় শিলঙের বহু জায়গা থেকেই দেখা যায় না। তাই শিপ্রার চোখে পড়েছে, অনেকক্ষণ ধরে ঘন পাইনবনের ছাঁকনির ভিতর দিয়ে গলে আসা প্রদোষের আধ-আলোর কেমন যেন সবুজ সবুজ ভেজা ভেজা রেশের পরশ। কিন্তু কানে আসছিল যে–
বাতাস কেবল ঘুরে বেড়ায় পাইন বনের পল্লবে।
তারই ক্ষীণ ঝিরঝির মধুর, যেন কুচিৎ জাগরিত বিহঙ্গ-কাকলি। শিপ্রা কিন্তু পূর্ণ জাগরিত। নিত্য ঊষায় তার সদভ্যাস– প্রথম আলোর চরণধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে সে প্রথম পদক্ষেপ করে শয্যা থেকে ভূমিতে কলকাতায় শেষের দু ভোরে করেছে পাদপীঠ পরে। কীর্তি সোনালি-নীলের গালায় আঁকা, ঢেউ খেলানো পা-ওলা বর্মা দেশের একটি পাদপীঠ তার অজানতে একদিন চুপিসাড়ে রেখে গেছে।
বেদনার উত্তেজনাতে মানুষ তবু কিছুটা কাজকর্ম করতে পারে, কিন্তু নির্ভাবনার প্রশান্তি আনে অবসাদ।
ছোট্ট জানালাটির শার্সির ভিতর দিয়ে সে তাকিয়ে আছে মাঝারি পাইনের শীর্ষ পল্লবের মৃদু আন্দোলনের দিকে, আর হেথা হোথা টুকরো টুকরো নীলাকাশের পানে। ততখানি উপরে উঠতে দেবতার ঢের সময় লাগে। টিলার সানুদেশ পাইনপাতার ছুঁচে আবরিত। এখানে-ওখানে সূর্যরশ্মির গোম্পদ। চিকচিক করে তার পিচ্ছিলতা। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে কেমন যেন একটা সঁতসেঁতে ভাব মনটাকে প্রফুল্ল করে তোলে না।… একটি খাসিয়া মেয়ে পিছলে পাইনপাতার উপর পা টিপে টিপে সন্তর্পণে পাহাড়ে চড়ছে। মাঝে মাঝে পিছন পানে তাকাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে ওদিকে? ওখানে কাঠ কাটতে দেয় না। একটা ছোকরা এসে নিচের রাস্তা থেকে ডাকল ওকে। মেয়েটা কিছু উত্তর না দিয়ে সন্তর্পণতা বর্জন করে লাফিয়ে লাফিয়ে চলল উপরের দিকে। কীই-বা করে ছোঁড়াটা! সে-ও ছুটল পিছনে। দুজনাই অদৃশ্য। অনেকক্ষণ পর নেমে এল দুজনা, হাত ধরাধরি করে, কিন্তু রাস্তায় নেমে একে অন্যের হাত ছেড়ে দিল। শিপ্রার মনে হল এদের রস আছে– নইলে এত সকালে লুকোচুরি খেলা!
বেয়ারা ভোরের চা নিয়ে এল। শিপ্রা বিছানা থেকেই বলল, বাইরের ঘরে রেখে যাও। সে সুসংবাদ পেয়েছে, ওকে মুখ দেখায় কী করে। কবির বিনু ছিল কমবয়সী তার চিত্তে উদয় হয়েছিল ভাব, বিশ্বসংসারের দুঃখ না ঘোচাতে পারলে তার সেই হঠাৎ-পাওয়া আপন আনন্দ সম্পূর্ণ হবে না। শিপ্রার সে সাধ হওয়ার কথা নয়, তবু চেনা জনের দুশ্চিন্তা, তার সামনে বেরোয় কোন মুখে।
আবার দুমদাম শব্দের সঙ্গে নিস্তব্ধতা, টোকা, কাম ইন্।
তিনবার গুড মর্নিং বলার পর উত্তেজনায় ফেটে চৌচির জিমি একরাশ খবর দিল। সেগুলো সংগ্রহ করেছে, কিছুটা বেতার থেকে, কিছু ট্রাঙ্কতারের বন্ধুর কাছ থেকে, কিছুটা ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় সবজান্তাদের ফোন করে, ফোন পেয়ে।
