আমার হাল তবে এবারে শোনো। আমি এখানে একা। তোমাদের তিনজন, ম্যানেজার-ট্যানেজার ওরা কাজের লোক, আপন কাজ নিয়ে থাকেন। ব্যস্। আমি মেয়েছেলে। আমার এক দোস্ত, আরেকজন তাকে আমি মহব্বত করি দুজনা আটকা পড়েছে আগরতলায়। হয়তো-বা বেরিয়ে আসতে পারবে, হয়তো-বা পারবে না। আমার বাপ নেই, ভাই নেই। এবারে যাও, মিয়া, ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ো। আর ওই আহাম্মক ছোকরাটাকে বল, সক্কলেরই দিল এখন কাতর। সে কী বলেছে, না বলেছে। তাতে কী যায়-আসে? ভাবনা বাড়বে? কমবে? তার কথায়? এখন যাও।
এই যে আল্লার নাম নিয়ে শিপ্রা বুড়োকে শান্ত করল সে নিজে কি ঈশ্বর মানে?
আর বহুলোকের মতো শিপ্রা ছিল ধর্ম বাবদে মোটামুটি উদাসীন। প্যারিসে টুরিসট গাইড তাকে সুদু একপাল মার্কিনকে নিয়ে গিয়েছিল বিরাট এক গির্জা দেখাতে। গির্জা তখন ফাঁকা। শিপ্রা বেরুবার সময় গাইডকে বলল, চমৎকার! ফুলদানিটা অতি সুন্দর। কিন্তু ফুল কোথায়? মানুষ উপাসনা করছে সে-ই তো গির্জার ফুল। তার পর সে মাঝে মাঝে গির্জায় যেত উপাসনার সময়। বিশেষ করে মমারৎর-এ পুরো শনির রাত হৈ-হুঁল্লোড় করে রবির ভোরে বাড়ি ফেরার মুখে। ক্যাথলিক গির্জার অর্গেন সঙ্গীত ধ্বনি-লোকের অপূর্ব গম্ভীর যেন বিরাট সিন্ধু। হাড়-পাকা নাস্তিকও সে সঙ্গীতে অবগাহন করে। পেচি নাস্তিক ওই সঙ্গীতে ডুবে যাওয়ার ভয়ে গির্জাঘর এড়িয়ে চলে। শিপ্রার ভয় নেই, ভরসাও নেই।
একদা এক প্যারিসিনী তাকে শুধিয়েছিল, সে ঈশ্বর-বিশ্বাসী কি না?
যেন শব্দগুলো বাছাই করে করে শিপ্রা বলেছিল, ভগবান বাজারে বিক্রির রেডিমেড টমাটো কেচাপ নন– কিনে নিয়ে ব্যাগে পুরলেই হল। সমস্ত জীবন ধরে তাকে উপলব্ধি করতে হয়। অভিজ্ঞতার পর অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে।
রোদন-ক্রন্দনের বিকৃত মুখ, দুশ্চিন্তার শোকে ভেঙে পড়ার বিকট ভঙ্গি শিপ্রা আগেও দেখেছে। কিন্তু আজকের মতো নয়।
কীর্তির সর্বাঙ্গ কম্পনের সঙ্গে সঙ্গে তার অন্তর্লোকের আকস্মিক পরিবর্তন শিপ্রার কাছে এক মুহূর্তে সরল স্বচ্ছ হয়ে গেল নিদ্রাভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ যে রকম আগের দিনের কঠিন সমস্যার সহজ সমাধান পেয়ে যায়।
শিপ্রা কোচ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কটেজ ছেড়ে সুস্থ গতিতে হোটেলের মেন বিল্ডিঙে গিয়ে দাঁড়াল রিসেপশনিস্টের মুখোমুখি হয়ে। স্মিত হাস্য দিয়ে আপ্যায়িত করল গুড ইভনিং সহ। পুনরায় গুড় ইভনিং– এয়া-এর–
হন্তদন্ত হয়ে ছোকরা বললে, সরি, মিস রে– আমাকে উইলস বলে ডাকে সবাই জিমি উইলসন।
ছোকরা হকচকিয়ে গিয়েছে। এতদিন দু চারবার শিপ্রাকে যখনই দেখেছে, তখনই তার মনে হয়েছে, ইনি অন্যলোকের প্রাণী। আজ রাত এগারোটায় সেই নিরাসক্তা, গম্ভীরা এ কী রূপে দিল দরশন! তার মন বলছে, হাউ লাভলি! হাউ সুইট।
শিপ্রা সহজ সুরে শুধাল, এনি নিউজ?
আসলে এতদিন সে কোনও রিসেপশনিস্টের সঙ্গে কথা বলেনি- পাছে কোনও অপ্রিয় গুজব, সংবাদ, ওয়ার্নিং ওরা দিয়ে ফেলে। বিশ্বময় ওই গোত্রের কর্মচারী অর্থাৎ রিসেপশনিস্টদের চোদ্দ আনা চ্যাটারবকস।
ছোকরা কাউন্টারের উপর একটু ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বললে– যদিও স্থানটা জনশূন্য উয়েল মিস রে, বলব কি বলব না, বুঝতে পারছিনে। আমার এক বন্ধু আছে এখানকার ট্রাঙ্ক-কল দফতরে। ওরা অনেক কিছু শুনতে পায়। এখখুনি সে আমায় ফোন করেছিল। তারই মতো আরেক ট্রাঙ্ককর্মী শুনতে পেয়েছে ইন্ডো-পাক বর্ডারের গারো না ডাউঁকি না যশোর কোথা থেকে কে যেন কাকে ট্রাঙ্ক-কল-এ বলেছে, আজ রাত্রেই নাকি ঢাকাতে ট্রাবৃল আরম্ভ হয়ে যেতে পারে। তা, তা, মিস রে, সে-ও যে খুব শ্যোর শুনেছে তা নয়।
গুজব হোক, খবর হো এইটেই যদি সে ঘণ্টাটাক পূর্বে শুনতে পেত তবে আপাদমস্তক মুষড়ে পড়ত। কিন্তু এখন তার বুকের ভিতর কে যেন একখানা টিন প্লেট বসিয়ে দিয়েছে।
স্বাভাবিক কণ্ঠে শুধাল, আর যশোর, কুমিল্লা, বাদবাকি বর্ডার?
ছোকরা উত্তর দিল, আজ, এখখুনি, তো আর কিছু বলেনি। তার পর খানিকক্ষণ ঘাড় চুলকে বললে, কিন্তু দিন পাঁচেক আগে বলেছিল, গোলমাল লাগলে সব জায়গায় একসঙ্গেই লাগবে। তবে সে শ্যোর ছিল না এটো। এখন কে শ্যোর হয়ে কী বলতে পারে?
শিপ্রা হাঁটুর কাছে কেমন যেন একটা দুর্বলতা অনুভব করল।
খানিকক্ষণ না জানি কোন দেবতার কৃপায় তার দুশ্চিন্তা-বর্ষার অবিরল বারিধারা সম্পূর্ণ থেমে গিয়েছিল, কিন্তু তার পরের ইলশেগুঁড়ি ক্ষণে আসে ক্ষণে যায়। তারই স্বচ্ছ যবনিকা যেন নেমে এল তার বুকের ভিতর।
তবু মুখে হাসির ক্ষীণ পরশ লাগিয়ে বললে, তোমার কথা খাঁটি, উইলসন। সব-কথা বিশ্বাস করলে কি আর মানুষ বাঁচতে পারে? থ্যাঙ্কয়ু, অল্ দ্য সেম। গুড নাইট শিপ্রা মনে মনে বললে, ছেলেটি দরদি, লক্ষ করল তার বুশ শার্টের বুকের কাটে দেখা যাচ্ছে ছোট্ট একটা ক্ৰস্। বললে, মাদার মেরি, তোমার মঙ্গল করুন। গুড নাইট ওলড ম্যান।
জিমি যদিও ছোকরা বেয়ারারের মতো ওরকম খুনিয়া ফো পা অর্থাৎ সাপের ন্যাজ মাড়ায়নি তবু শিপ্রার ভাব পরিবর্তন থেকে আমেজ করতে পেরেছিল সে বেসুরো কর্কশধ্বনি ছেড়ে বসেছে। এক ফো পা মেরামত করতে গিয়ে দুসরা কদম খাদে ফেলল না। কাউন্টার ঘুরে শিপ্রার পাশে পাশে, কিন্তু সম্মানার্থে আধ কদম পিছনে পা ফেলে তাকে কটেজে পৌঁছিয়ে দিতে সঙ্গে চলল। যেতে যেতে বলল, মাদার মেরি হেভেন্ আর্থের কুইন মেরি! তাকে আমার স্মরণে আনি আর নাই আনি, তাঁর করুণাধারা কখনও ক্ষান্ত হবে না।
