সাইজে এক্কেবারে যেন শুণ্ডপ্রেস পঞ্জিকা। ভিতরে ওই মতো ফুলকপি মুলোর বিজ্ঞাপন, এবং মুসলমান ধর্মের আচার অনুষ্ঠান, পালপরবের সবিস্তর বর্ণন। তার বিস্তর শব্দ তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত এবং কোটেশনগুলো যে কোন ভাষা থেকে নেওয়া সে সম্বন্ধে তার সামান্যতম ধারণা নেই। এই বিরাট দণ্ডকারণ্যে কোথায় মহরমের সন্ধান? হঠাৎ লক্ষ করল পঞ্জিকার এক্কেবারে শেষপ্রান্তে ময়ূরপালকের বুক মার্ক সামান্য একটুখানি বেরিয়ে আছে। সেখানে কেতাব খুলতেই চোখে পড়ল আধপাতা জুড়ে বাংলা, মুসলমানি, শক, ইংরেজি, বিক্রম বহু অব্দের তারিখ গয়রহ দেওয়া আছে। হ্যাঁ, ২৫শে মার্চ, এখনও মহরম, থ্যাঙ্ক গড়।
মহরম মাসে শিয়া ইয়েহিয়া খুন-খারাবি করতে ইতস্তত করতে পারে। সেই নিছক চোরাবালির অনুমানের ওপর, দ্যাখ তো না দ্যাখ, শিপ্রা গড়ে তুলল, ইয়াব্বড়া পর্বতপ্রমাণ দেউল– কোণারকের মন্দির। যে খায় চিনি তারে যোগায় চিন্তামণি। সে চিনির তলায় ফাটা সাকি আছে, না মিং বংশীয় সর্বোৎকৃষ্ট পর্সেলিন– কোন মূর্খ করে তার বিচার?
বেয়ারা এতক্ষণে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করতে পেরেছে। শিলঙ শহরে বারো আনা লোকের মুখ চিন্তাকুল। এদের সক্কলেরই কেউ না কেউ আছে– সিলেট, কুমিল্লাদিতে। এই সর্বব্যাপী দুশ্চিন্তা উপস্থিত অন্য কোনও দুর্ভাবনাকে আমল দিচ্ছে না। মেমসায়েবের মুখে দুশ্চিন্তার আভাস সুস্পষ্ট। রিসেপশনিস্টের কাছে শুনেছে তিনি ডাক, তারের জন্য ব্যাকুল। অতএব তারই মতো অবশ্যই মেমসায়েবের কেউ না কেউ পুব-পাকে আছে। আপন অজানাতেই যেন মুখ থেকে প্রশ্ন বেরিয়ে গেল, মেমসায়েব, আপনার পোশ কুটুম কি কেউ পাকিস্তানে আছে? সঙ্গে সঙ্গে তড়িঘড়ি বার বার আপন বে-আদবির জন্য মাফ চাইল। শিপ্রা তার দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, এতে মাফ চাইবার কী আছে! তোমার দিলে দরদ আছে। তাই শুধিয়েছ।
গাব্রু মিঞা কী করে শিপ্রাকে চিনবে? সে বেচারী চেনে দুই জাতের মেমসায়েব। চা-বাগানের ইংরেজের স্ত্রী মেমসায়েব এবং তাদের অনুকরণে গড়া দিশি মেমসায়েব। এ দু জাত দূরে থাক সে কোনও জাতেরই মেমসায়েব, গিন্নিমা, বেগম সায়েব কিছুই নয়। বিধাতা তাকে কোন কোন ধাতু দিয়ে নির্মাণ করেছেন, পঞ্চভূতের মশলা মেশাবার সময় যে-তৃতীয়টি তেজ প্রচুর পরিমাণে ঢেলেছেন– সে বিষয়ে অবশ্য কারও মনে কোনও সন্দেহ নেই, সর্বোপরি তার স্বাধ্যায়, একাধিক। সমাজ-দেশের সঙ্গে তার কুণ্ঠাহীন হৃদ্যতা, তার বিচিত্র বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতা তার জীবনদর্শন- এসব মিলিয়ে যে শিপ্রা, তাকে বিশ্লেষণ করবে কে? যার নির্মাণ, যার জীবন শিপ্রার চেয়েও বিচিত্র বৈভবে ভরা সে-ই তো? সে কোথায়? তবে কি না, ভালোবাসার সোনার কাঠির পরশ যার প্রাণে লেগেছে সে হয়তো পারে। কীর্তি হয়তো একদিন পারবে।
শিপ্রা বললে, আমার দুই আপনজন আগরতলায়।
এর উত্তরে গাব্রু যে মন্তব্য করেছিল তার জন্য সে মনে মনে নিজের গাল দুটোকে অকাতরে চড় মেরেছে। মোল্লাজির কাছে কাদো কাঁদো হয়ে সে-কাহিনী যখন শোনাল তখন তিনি মনে মনে না– সশব্দে তার দু গালে দুটো চড় কষিয়েছিলেন। একসারি কটু শব্দ বলে গিয়েছিলেন অল্পশিক্ষিত মোল্লাজি তার গুরুর কাছে যেগুলো শুনেছিলেন– আরবি ফারসি উর্দু, সিলেটি ভাষা-উপভাষায়, আহম্মক, নাদান, উলুকে পাট্টা থেকে সিলেটি আচাভুয়া হুমাভুতা পর্যন্ত।
গাব্রু সরাসরি অজানতে বলে ফেলেছিল, আখাউড়া আগরতলা তো বরাবর।
বলতে না বলতেই সে বুঝতে পেরেছিল, কী সর্বনেশে কথা কটি তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। রাখালের মাসি যেরকম বুঝেছিল।
সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ করেছে, মিসিবাবার মুখ যেন মলিন হয়ে গেল।
গাব্রু প্রথমটায় ছুট লাগাতে চেয়েছিল, কিন্তু থেমে গেল। একখানা আধা সেলাম অসমাপ্ত রেখে ধীরে ধীরে কোয়ার্টারে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
রাত্রে খাবার নিয়ে এল অন্য বেয়ারা। শিপ্রা শুধাল, সে বেয়ারার কী হল? আমি জানতে চেয়েছিলুম, সিলেটের খবর ঠিকমতো পায় কি না, তার পরিবার
এ বেয়ারা বৃদ্ধ, বহুদর্শী, নানা গেস্টের বহু উনুনে পোড় খেয়ে খেয়ে সে ঝামা হয়ে গিয়েছে। সে পর্যন্ত কুল্লে কায়দাকানুন ভুলে গিয়ে দু হাত দিয়ে হঠাৎ চোখমুখ ঢেকে ফেলল।
শিপ্রার প্রশ্নটা অসমাপ্তই রয়ে গেল। কী হল– বলতে গিয়ে থেমে গেল। বুড়ো নিঃশব্দে কাঁদছে– তার দু হাতের কাঁপন থেকে বোঝা যাচ্ছে।
বুড়োকে কিছুক্ষণ কাঁদতে দিয়ে শিপ্রা বলল, যাও তো মিঞা, মুখ ধুয়ে আসবার সময় মাস্টার্ড নিয়ে এসো।
মাস্টার্ডের কোনও প্রয়োজন ছিল না শিপ্রার। তার মাথার ভিতর একসঙ্গে বহু চিন্তা লড়ালড়ি করছে। কিন্তু অল্পক্ষণের ভিতরই সে কিছুটা শান্ত হয়ে কিছুটা মনস্থির করে ফেলেছে।
বুড়ো ফিরে এল।
শিপ্রা শুধাল, মিঞা তুমি নামাজ পড়ো?
জি মেমসায়েব।
রোজা রাখো।
জি, হ্যাঁ।
আচ্ছা তবে শোনো। এ সব তো করো আল্লার হুকুমে? না? আমি বুঝতে পেরেছি। তুমিও সিলেটি, তোমার বাল্-বাচ্চাও সেখানে? না?
বুড়ো ঘাড় নাড়ল।
তা হলে এবারে ভালো করে শোনো। সমস্ত জীবন ধরে নামাজ-রোজা সব করলে আল্লার হুকুমে। তার ওপর নিশ্চয়ই তোমার ভরসা ছিল, নইলে হুকুম মানলে কেন? তুমি আমার বাপের বয়েসী। অবশ্যই তোমার মাথার ওপর দিয়ে বহুত ঝড়-তুফান গিয়েছে। তারই ওপর ভরসা রেখে এসব বিপদ-আপদ কাটিয়েছ। এখন এই শেষ বয়সে সে ভরসা কম-জোর হয়ে গেল? তুমি ভেঙে পড়লে ওই অল্প-বয়সী বেয়ারাটাকে হিম্মত যোগাবে কে? উপরে মালিক সব দেখছেন।
