হন্তদন্ত হয়ে বললে, আমাদের মোল্লাজি বেয়ারাদের ঘরে থাকেন। তাঁর কাছ থেকে ইসলামি পঞ্জিকা এখুনি নিয়ে আসছি। সব খবর পাবেন। হঠাৎ তার মনে ধোকা লাগল : এনা খানদানি মিসিবাবা, ইনি বাঙলা, না হয় বাঙলা বলতে পারেন, কিন্তু পড়তে পারেন কি? সভয়ে প্রশ্নটা শুধাল। শিপ্রা ঘাড়টি সামান্য বেঁকিয়ে মুচকি হাসল। গোস্তকির বিস্তর মাফ চেয়ে উধ্বশ্বাসে ছুটল পাঁজি আনতে।
যবে থেকে শিপ্রা শিলঙ পৌঁছেছে সেই থেকে কীর্তি বা খানের কোনও খবর না পেয়ে আস্তে আস্তে সে অধীর হয়ে উঠেছে। এখন শঙ্কার চৌকাঠে পা দিয়েছে। ঘরের ভিতর ভীতি, বিভীষিকা।
সব কটা খবরের কাগজ লাইন-বাই-লাইন পড়েছে। সেগুলো এমনি বিস্ফোরক উত্তেজনায় ভরা যে সাবধানে নাড়াচাড়া করতে হয় পাছে না একটুখানি খোঁচা খেলেই বোমার মতো ফেটে ওঠে। ওদিকে বিটউইন দি লাইন্স্ পড়ে শিপ্রা ঠিক বুঝে ফেলে, অন্তত আগরতলা থেকে পাঠানো সংবাদ হয় অতিরঞ্জিত, নয় মৌনগুঞ্জিত। হাজি, মিঞাসাহেব–
মিঞাসাহেবের নাম মনে আসতেই সে যেন তাঁর শেষ কথা কটি আবার শুনতে পেল। ডিনার শেষে, গভীর রাত্রে, খাস করে তার কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় একমাত্র তাকেই বলেছিলেন, যেন তাকে খানিকটে আশ্বস্ত করার জন্য, কিংবা পরিস্থিতির যে ছবিটা তর্কাতর্কি, লেটেস্ট সংবাদের অদলবদলের রঙ দিয়ে নিমন্ত্রিতেরা এঁকেছিলেন সেটাতে একটা অংশ ফাঁকা রয়ে গিয়েছে সেই ব্যক্তিনিরপেক্ষ তত্ত্বটির দিকে শিপ্রার নিছক দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য : পবিত্র মহরম মাসে কি কট্টর শিয়া ইয়েহিয়া খুন-খারাবি আরম্ভ করবে?
সেই গম্ভীর ইঙ্গিতভরা প্রশ্নরূপে প্রকাশিত তত্ত্বকথাটি শিপ্রার মনে আসতেই শিপ্রা কেমন যেন এক রকমের অকারণ অস্বস্তি অনুভব করেছিল। কিন্তু সেটা নির্ভর করছে, এখনও মহরমের মাস চলছে কি? তাই চোখের সামনে যে পড়েছে তাকেই প্রশ্নটা জিগ্যেস করেছে।
হায় রে প্রখরা বুদ্ধিমতী রমণী শিপ্রা! তুমি সমস্ত প্রাণমন দিয়ে কামনা করছ, যে গ্রহনক্ষত্র বিশেষ করে শশীকলা লক্ষ লক্ষ বৎসর ধরে অলঙ্ নিয়মে যে বেগে চলেছে, পূর্ণিমা-অমাবস্যা এসেছে-গিয়েছে, এদের গতিবেগ যেন অকস্মাৎ মন্থর হয়ে যায়, এই মহরম মাসটা যেন বিলম্বিত হতে বিলম্বিততর হয়ে, ২৯/৩০ দিনের পরিবর্তে ২৯/৩০ মাস ধরে চলে। শুধু তার প্রিয়, তার বল্লভ কীর্তির চতুর্দিকে দাবানলের প্রজ্বলন নিরুদ্ধ করার জন্য। তার ফলে কার কীই-বা ক্ষতি হত? স্বয়ং যে রাজার রাজা মহারাজার কনিষ্ঠা-ইঙ্গিতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে চলেছে তারই-বা কী ক্ষতি হত? তাই তো। হঠাৎ তার মনে এল একটি গীত। তারই এক বাল্যসখা উভয়ের কৈশোরে এ গীতটি তাকে উপহার দিয়েছিল। কবিতাটি শিপ্রা ছাপাতে কখনও দেখেনি কারণ কবিও বাংলা সাহিত্যে কণামাত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেননি। বাইবেলে বর্ণিত কিশোরী তার বল্লভের সন্ধানে যেরকম দোরে দোরে ঘা দিয়ে নিরাশ হয়েছিল, এ গীতি যে কাগজে লেখা সে-ও বহু সম্পাদকের টেবিলের উপর ফ্যানের হাওয়াতে কাঁপতে কাঁপতে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়নি। এমনকি তার প্রিয়া কালী পেঁচির দৃষ্টিও না।
মহরম দীর্ঘতর হলে সৃষ্টিকর্তার কীই-বা হত ক্ষতি। গানটার মোতিফ ছিল একই :
কী বা হত তোমার, রাজা,
একটু মোরে দিলে?
কীই বা ক্ষতি হত কাহার
বিরাট এ নিখিলে?
তোমার বিশ্ব বসুন্ধরা
অনন্ত বৈভবে ভরা;
কণাটুকু যেত না তো।
করুণা বর্ষিলে।
চন্দ্র সূর্য গ্রহে গ্রহে।
সাজাও আলিম্পন
তারায় তারায় বাঁধো, তুমি
অলখ আলিঙ্গন।
তোমার এ যে পূর্ণ ছবি।
মিথ্যা হত এর কী সব-ই।
প্রিয়ার চোখে আমার চোখে
যদি যেত মিলে।
শিপ্রার মনে আছে, কবিতা বা কবি কারওরই চোখের সামনে সেই ধুমসীর চোখ মেলেনি। অথচ আখেরে এ লক্ষ্মীছাড়িটা বিধির বিধানে পেয়েছিল কলাগাছ যে রকম কার্তিককে পায়। এবং সে ছোঁড়া ছিল কুবের কুলের পিদিম! বিধির অধর্ম কি কোনওদিন বিধির বিধি কোনও সর্বেশ্বর বিচার করবেন না? প্রলয়শেষে কিয়ামতের দিনে?
যখন কবিতাটি শিপ্রা প্রথমে পড়ে তখন মনে হয়েছিল এটা ইন্টার ক্লাস। তবু এক একটা নিতান্ত বাজে সুর যেরকম মানুষের পিছনে অষ্টপ্রহর লেগে থাকে, তাকে হট করে এটাও করেছিল তাই। সেই মেয়েটা এবং একঝাঁক সম্পাদকের এই কাব্যের উপেক্ষিতাকে আজ শিপ্রা–কবিগুরু যেরকম ঊর্মিলাকে তাঁর করুণাধারা দিয়ে অভিষিক্ত করেছিলেন সেইরকমই কবিতাটিকে তার হৃদয়-আসনে বসাল।
হঠাৎ ওই অনবদ্য প্রবন্ধটির আরেকটি অংশ স্মরণে আসতে তার সর্বচৈতন্য বিকল হয়ে গেল। অবশ্য শুধু ভাবার্থটুকু। শব্দে শব্দে আছে :
সলজ্জ নবপ্রেমে আমোদিত বিকচোখ হৃদয়-মুকুলটি লইয়া স্বামীর সহিত যখন প্রথমতম মধুরতম পরিচয়ের আরম্ভ সময় সেই মুহূর্তে লক্ষ্মণ… বনে গমন করিলেন!
কিছুতেই মনে আনতে পারল না শিপ্রা, আর্যপুত্র ঊর্মিলাবিলাসী বনগমনের পূর্বে কয়দিন নববধূ নির্জনে সঙ্গোপনে একান্ত আপন ভাবে আর্যপুত্রকে কণ্ঠাশ্লেষে আবদ্ধ রাখার অবসর পেয়েছিল। সে তুলনায় শিপ্রা কদিনের তরে কীর্তিকে? আর এখন সে কোথায়, কোন অবস্থায়।
চিন্তাধারা শিলাখণ্ডে বাধা পেল। ভালোই হল। জানালা দিয়ে দেখতে পেল, ঝঞ্ঝা-তাড়িত মেঘদূতের ন্যায় পবনবেগে আসছে গাব্ৰু শেখ। হাতে ঢাউস একখানা কেতাব, মুখে বিস্তৃত হাসি।
