খান বললে, শিপ্রাদি, প্রথমেই আমার একটা নিবেদন আছে। সবাই আমাকে হাজি বলে ডাকে, ব্যঙ্গ করে। একে তো হজ করিনি, অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠান বাবদেও আমি গাফিল। প্রতিবারে আমাকে হাজি নামে ডেকে হয়তো ওঁদের ওই ব্যঙ্গ করার পিছনে আছে তাদের সদিচ্ছা, আমি যেন ধর্মপথে চলি। অবশ্য, আল্লার ডাক শুনতে পেলে আমি কে, আমার ঘাড় তখন যাবে মক্কায়। কিন্তু আপনি আমাকে এ নামে ডাকবেন না।
শিপ্রা বললে, আচ্ছা ডাকব না। কিন্তু আমারও সদিচ্ছা হয় না, আপনি ধর্মপথে চলুন। আমার বিশ্বাস আপনার পথ ধর্মপথে গিয়ে মিশবে।
হাজি আবেগভরে বললে, আমেন, আমেন। তাই হোক তাই হোক। মূল কথায় ফিরে গিয়ে হাজি বলল, দাঙ্গার ভিতরও আল্লা তাঁর করুণা প্রকাশ করেছেন, যেমন আমার মতো অপদার্থও তার দয়া পেয়েছে।
কীর্তি : দেখুন হাজি, আমার সঙ্গে কম্পিট করতে যাব না। অপদার্থ বলতে বোঝয় কীর্তি রায়!
হাজি সবিনয়, দাদা বয়সে অজস্র হলেও এ ব্যাপারে আমি আপনার অনুজ, বিশ্বস্ত অনুগামী।…
প্রতি দাঙ্গায় হিন্দু-মুসলমান যখন একে অন্যকে বাঁচায়– তখনই দেখি, প্রতিবার, মানুষের মনুষ্যত্ব। স্বার্থপর পলিটিশিয়ানের প্রপাগান্ডা উপেক্ষা করে, পথভ্রষ্ট ধর্মযাজকদের অনুশাসনে কান না দিয়ে, সশস্ত্র গুণ্ডাদের ভীতি প্রদর্শনকে তুড়ি মেরে মানুষকে তখন সত্যের পথে, আর্তজনকে রক্ষার পথে চালায় কে?– সে তার মনুষ্যত্ব। বললে পেত্যয় যাবে না কেউ, আমার মতো অপদার্থ–সরি পাষণ্ডের ভিতরও খুব সম্ভব ওই ধাতুটির একটি ক্ষুদ্রতম কণার ক্ষীণতম ছায়া অতি কালে-কস্মিনে চিলিক মেরে যায়– নইলে বুকে হাত দিয়ে বলুন তো আপনারা দোহাই মনুষ্যত্বের– এতকাল ধরে বউ আমাকে বরদাস্ত করছে কী করে? হুঃ। কিন্তু ওই লারি সম্প্রদায়ের ভিতর মনুষ্যত্বের অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমাকে বিস্তর পরিশ্রম করতে হয়েছে মেহনত আমার সয় না।
কিন্তু, ম্যাডাম, আমার প্ল্যানটা আপনার সামনে পেশ করি।
আগরতলা বিপন্ন হলেই আমি বউবাচ্চা নিয়ে চলে যাব, কিছুটা মোটরে বা পুরোটাই হেঁটে চলে যাব পার্বত্য ত্রিপুরা অঞ্চলে, যার উপর দিয়ে আপনি প্লেনে উড়ে এলেন– সেখানকার পাহাড়িদের সঙ্গে আমার বিস্তর ভাবসাব আছে। সেখানে এখনও প্রায় ফি-বছর যাই শিকারে। প্রথমযৌবনে মেয়েগুলোর সঙ্গে নেচেছি, এদের তৈরি নেটিভ বিয়ার বিস্তর খেয়েছি। ইয়েহিয়ার বাপের সাধ্য নেই সেখানে নাক গলায়। আর ওরাও কারও সাতেপাঁচে নেই। এর চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা আমার কল্পনার বাইরে।
আর আপনার নিজস্ব, আপন কলকাতা তো আমার হাতের পাঁচ নো–পাঁচ কোটি রইলই।
কীর্তির দিকে তাকিয়ে বললে, কই কীর্তিবাবু এ অধম গাইড যেটুকু পারে সে তো দেখাল। এবারে পাকেচক্রে কলকাতায় এলে বাঙালকে হাইকোর্ট দেখাবেন তো?
কীর্তি কিছুমাত্র চিন্তা না করেই বললে, আল্লা করুন এবার যেন বাঙালরা পাঞ্জাবিদের হাইকোর্ট দেখিয়ে দেয়।
হাজি কার্পেটের উপর বসে পড়ে হাত দুটি উঁচু করে তুলে ধরল। আবেগভরা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, আমেন, আমেন।
.
০৩.
স্পষ্ট মনে আছে শিপ্রার, বারটা ছিল বৃহস্পতি।
যে বেয়ারা বিকেলের চা নিয়ে এল তার চেহারা-ছবি ধরনধারণ দেখে শিপ্রার ধারণা হল লোকটা বোধহয় সিলেটি। শুধাল, তোমার দেশ কোথায়?
বেয়ারা বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। শিপ্রার চেহারা, চাল-চলন, তার প্রসাধনের যে কটি কৌটো শিশি ড্রেসিংটেবিলে সাজানো ছিল সেগুলোর বাস বিলিতি টপ ঢং দেখে তার প্রত্যয় হয়েছিল, ইনি অতি খাঁটি মিসিবাবা, অর্থাৎ ইনি জানেন শুধু ইংরেজি, আর সে যে উর্দু-অহমিয়া-খাসিয়া-সিলেটি ভাষার লাবড়াকে হিন্দুস্তানি নামে চেনে, সেইটে বলতে পারেন চালে-কাঁকরে মিলিয়ে। তাঁর মুখে আচম্বিতে বিসুদ্দ বাঙলা ভাষা বেরিয়ে আসায় সে এমনি হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছে যে তার মুখ থেকে, যেন রিলেক্স্ অ্যাকশনের মতো, বেরিয়ে গেল খাস সিলেটি, কিতা কইলা?
আদর করে শিপ্রা যে নামে ডাকে কীতা কখনও সে জুড়ে দেয় মিতা, এ কদিন দুশ্চিন্তার ভিতরে কবি এ শব্দের সঙ্গে যে মিল দিয়েছে তারই স্মরণে মনে মনে বলেছে, আমি কি বিস্মৃতা?
সিলেটি রহস্যময় কিতা শুনে তার বুক ছ্যাঁৎ করে উঠল।
ইতোমধ্যে বেয়ারা নিজেকে সামলে নিয়ে হোটেলের ভদ্রস্থ হিন্দুস্তানিতে একাধিকবার বলেছে, সিলেটি, মেমসাহেব, সি মুলুক, মেমসাব।
তুমি মুসলমান? না?
জরুর জরুর। হাম্রা নাম শেখ গাত্ৰু, মেমসায়েব। মনে মনে দৃঢ় প্রত্যয় হয়েছে, এই মিসিবাটি নিশ্চয়ই কেরামতি জানেন নইলে কোন দূরের মুল্লুক থেকে এসেই তাকে দেখে ধরে ফেলেছেন, সে এদেশেরই লোক নয় এবং সে মুসলমান। এবারে শিপ্রা যে প্রশ্ন শুধাল তাতে তার বিস্ময় পৌঁছল চরমে। একমাত্র তার সহকর্মী দেশ-ভাইদের দু একজন তাকে তার জিন্দেগিতে মাত্র দু একবার শুধিয়েছে।
এখনও কি মহরম মাস চলছে?
এর সঠিক নির্ভুল উত্তর শ্ৰৈহট্ট অর্থাৎ শ্রীহট্ট, সিলেট-সন্তান গা মিঞার দেওয়া সম্ভবপর নয়। অবশ্য মহরমের শুক্লা দশমীতে (হিন্দু গণনায় একাদশী বা দ্বাদশী) হয়ে গেল মহরমের পরব– তাজিয়া তাবুদের প্রসেশনসহ। তার পর যে কটা দিন গেছে সেটা গুনে যোগ করলেই মহরমের ক তারিখ, না পরের মাস সফর শুরু হয়ে গেছে ধরা পড়ে যায়। অবশ্য মিয়া গাফ্র কটা দিন গেছে আঙুল গুনে মোটামুটি খবরটা দিতে পারত কিন্তু এহেন বিদ্যাধরী মিসিবাবা যিনি কি না মহরম যে সুদু একটা পরব নয়, মাসও বটে, সে হেন খাস ইসলামি খবর রাখেন তাকে তো উল্টোপাল্টা মাস তারিখ দেওয়া সৎ গুনাহ্ হবে।
