শিপ্রা জিগ্যেস করলে, এরা পার্টিশনের সময় পশ্চিম পাকিস্তান গেল না কেন? সেখানে তো অন্তত শিক্ষিত পাঞ্জাবিরা উর্দু বলে, অশিক্ষিতেরাও অনেকখানি বোঝে। বাঙলায় এল কেন?
হাজি বললে, ওই তো সরল রহস্য, ভদ্রে। পশ্চিম পাকিস্তানে ওই সময়ে গেল উত্তর প্রদেশ ও দিল্লি অঞ্চলের অনবদ্য উর্দুভাষী বিস্তর লোক। ওদের সামনে বেহারির উর্দু যেন রবীন্দ্রনাথের সামনে আমার কুমিল্লার খাজা বাঙলা! তদুপরি পাঞ্জাবিরাও রাইটলি অর রংলি দাবি করে তাদের উর্দু বেহারিদের উর্দুর চেয়ে বেহৃতর– যদিও লক্ষ্ণৌ দিল্লিবাসীদের মতে দুটোই একটা গাধার দুটো কান।
পুব বাঙলায় যেসব বেহারি আছে তারা পাঞ্জাবিদের চেয়ে নৃশংস পদ্ধতিতে লড়বে লীগের বিরুদ্ধে। পাঞ্জাবিরা অবস্থা মারাত্মক জানা মাত্রই ফিরে যাবে আপন দেশে, এরা যাবে কোথায়? দে হ্যাঁ বার্নট দ্যার বুল কার্টস।
এবং আছে আর একটা দল তামাম উত্তর ভারত জুড়ে। এবং পশ্চিম বাংলার মুসলমান বাঙালিও কিছু সংখ্যায় আছেন।
তিন কলকাতাগত জনের চোখের সামনে ভেসে উঠল মির্জার কুটিল মুখচ্ছবি।
তবে এদের অধিকাংশ মক্তব-মাদ্রাসার লোক।
ভারতের পূর্বাঞ্চলের এই ধরনের মুসলমানদের পাকপ্রীতিও স্বার্থজাত। এরা ভাবে, কাল যদি ভারতে কমনাল রায়ট বাধে তবে আমরা যাব কোথায়? পুব বাঙলাই তো হাতের কাছে। সে-দেশটা যদি লীগের পন্থা অবলম্বন করে স্বাধীন হয়ে যায়, তবে তারা ধর্মনিরপেক্ষ বা সেকুলার হয়ে যাবে সঙ্গে সঙ্গে। তখন আমরা মুসলমান বলে তো কোনও আদর, প্রেফারেন্স পাব না। বেহারি মুসলমানরা আরও জানে, বাঙালি মুসলমান ভিতরের-বাইরের দু দল বেহারিকেই ধীরে ধীরে প্যাঁদাবে।
ইয়েহিয়া এজেন্ট জোগাড় করতে চায় এই পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতাবিরোধী, অতএব পশ্চিম পাকপ্রেমী দল থেকে। এবং সবচেয়ে বেশি চায় কলকাতায়। কলকাতাবাসীর পয়সা আছে, তাদের পক্ষে পুব বাঙলার স্বাধীনতা সংগ্রামকে সাহায্য করা খুবই স্বাভাবিক। তাদের বিস্তর হিন্দু ইনটেলেকচুয়েল সর্বদেশের স্বাধীনতা সগ্রাম মনেপ্রাণে সমর্থন করে। এই পশ্চিম বাঙালি সাহায্য করবেই করবে অন্তত ভাষা বাবদে তার বেরাদর পুব বাঙালিকে। বেতারযন্ত্রটা তার প্রধান অস্ত্র।
অতএব কলকাতায় একটা গণ্ডগোলের সৃষ্টি করতেই হবে। এবং সেটা আখেরে সাম্প্রদায়িক রূপ নেবেই নেবে। অবশ্য চেষ্টাটা দিতে হবে তাবৎ ভারতে আগুন জ্বালাতে।
খান বলল, কলকাতায় এসেছেন ওই মন্ত্রধারী একটা আস্ত ঘুঘু। তার কথা তোমাকে বলিনি। নাম লারি
কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই হাজি হার হায় করছে আর মাথা থাবড়াচ্ছে। শেষটায় বলল, ওকে আমি চিনিনে? ব্যাটা কুমিল্লাতে এলে সুধা পান করে কেন্টনমেন্টে। আর আমার বাড়িতে। কিন্তু বেরাদর, ওকে আমি হাড়ে-হদ্দে চিনি। ব্যাটার কাছে পাকিস্তান হিন্দুস্তান মুসলমান কেরেস্থান সব বরাবর। মাত্র দুটি জিনিসের তরে সে সব করতে পারে। তার আপন স্বার্থের তরে। তার খাই প্রচণ্ড। মাতৃগর্ভে তার দাঁত ছিল না কেন, জানেন কীর্তিবাবু? মায়ের নাড়িভুড়ি খেয়ে ফেলত যে! সে চেনে দুটো জিনিস একটাও বলা যেতে পারে। রূপচাঁদ ঠাকুর– টাকা, টাকা; ওই দিয়ে মদ আর থাকগে। আপনি তো, কীর্তির্বাবু, গোঁড়া হিন্দু নন। ওকে দুইয়ে দিন কিঞ্চিৎ। টিকে গজিয়ে নামাবলি পরে না, বরঞ্চ তান্ত্রিক পন্থাই বেটা বেছে নেবে। ওর কথা অন্য মোকায় সবিস্তর বলবে।
শিপ্রার দিকে তাকিয়ে বললে, আমি জানি, ম্যাডাম, আমি জানি আপনার ডানার নিচে আমার বউবাচ্চা পাবে সর্বোত্তম প্রটেকশন। কিন্তু অপরাধ নেবেন না, দেবী, রায়টের সময় খুনখারাবি করে এ পাড়ার গুণ্ডা ও-পাড়ায় গিয়ে এবং ভাইস ভার্সা। এক দল অন্য দলকে লেটেষ্ট খবর দেয়, কার বাড়িতে সোনা দানা রুক্কা টাকা পাওয়া যাবে, কোন ব্যাচেলরের বাড়িতে পাওয়া যাবে না কিছুই। আমি রায়ট দেখেছি, ঢাকা-কলকাতা দুই শহরেই।
কিন্তু মুসলমান পুষেছেন এ কথাটা প্রকাশ পাবেই পাবে, এবং তখন হামলা হবেই হবে।
আপনার বাড়ি এমনিতে লুঠ হবে না। দারওয়ানের বন্দুক আছে, বরঞ্চ তার চেয়ে বেশি বন্দুক চালাবেন আপনি, জানি, বিলক্ষণ জানি। ফরাসিদের কাছ থেকে শুধু একাডেমিক মিলিটারি স্ট্র্যাটেজি শিখেছেন আর ওরা আপনাকে আত্মরক্ষার্থে যেটুকু প্রয়োজন বলতে কী তার চেয়ে ঢের ঢের বেশি বন্দুক-পিস্তল চালাতে শেখায়নি সেটা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। আপনার ভিতর দক্ষতা আছে, নৈপুণ্য আছে। সেটা লক্ষ করার পরও? প্রকৃত হুনুরি, সত্যকার আর্টিস্ট– তা তার আর্ট বন্দুক চালানোই হোক, আর ছবি আঁকাই হোক– সে উপযুক্ত পাত্র পেলে তার ভিতর আপন ইনুর, সাধনালব্ধ সম্পদ রাখবেই রাখবে। ম্যাডাম যদি বলতেন যে ফরাসি আপাশ সম্প্রদায়ের গুনিন পকেটমারদের সঙ্গে কাটিয়েছেন, তা হলে কার নামে কিরে কাটব?– আপনারই সুন্দর নামে কাটি– বিচক্ষণ ব্যক্তির যা সর্বথা করা উচিত, আমি তাই করলুম– গলা কাট্যা ফেলাইলেও মানিব্যাগটা এখানে আনতুম না।
সিরিয়াসলি বলছি, কলকাতাতে দাঙ্গা লাগার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।
সে অবস্থায় গোটাকয়েক মুসলমানের জিন্মেদারি আপনার স্কন্ধে চাপাই কোন বিবেকহীন বুদ্ধিতে?
শিপ্রা বললে, এ আপনার আদিখ্যাতা। প্রত্যেক দাঙ্গায় কত মুসলমান কত হিন্দুকে বাঁচিয়েছে, কত হিন্দু কত মুসলমানের প্রাণ রক্ষা করেছে, হাজি সাহেব।
