শিপ্রা বললে, ওদের দুজনার নাম দাও তো। আমি শিলঙ থেকে রামাকে জানাব, এঁরা যদি আমার কলকাতা ফেরার আগে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন তবে যেন ওদের কলকাতার ঠিকানা ঠিক ঠিক লিখে রাখে এবং বলে আমি ফিরে আসা মাত্রই ওদের সঙ্গে দেখা করব। ঠিক তো?
তোমাকে তো ককখনও অঠিক কাজ করতে দেখিনি। আয়াকে ডাকব তোমার খোঁপাটা বেঁধে দিক। আমাদের একবার হলে যাওয়া দরকার।
তার পর হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে, দাঁড়িয়ে উঠে, মাথা নিচু করে শিপ্রার তরঙ্গে তরঙ্গে নেমে-আসা কুঞ্চিত কেশদামে মাথা গুঁজে দিয়ে পরিতৃপ্ত নিশ্বাসে বুকভরে নিল।
শিপ্রা এলোখোঁপায় পাক লাগাতে লাগাতে বলল, চলো, ডার্লিং। হ্যাঁ, সৃষ্টিকর্তা এতকাল ধরে তোমাকে অপদার্থ, অকর্মণ্য করে রাখেননি তিনি তোমার ব্যাটারি চার্জ করেছিলেন। এইবারে খেলো, খেলো, তব ভৈরবখেলা।
শিপ্রা লক্ষ করেছে, কীর্তির কম্পন সম্পূর্ণ থামেনি বটে, তবে যেটুকু আছে বাইরের লোকের চোখে পড়ার মতো নয়।
.
০২.
লাফ দিয়ে উঠল হাজি। খনে দু হাত দিয়ে কপালের রগ চেপে ধরে করুণ কণ্ঠে গোঙরায়, গেলুম, গেলুম, আমায় ধরে তো, পরমুহূর্তে দু হাতে বুক চেপে ধরে গভীর পরিতৃপ্তির শ্বাস ছেড়ে বলে, আহ্ কী আরাম, এসো ক্ষুদিরাম।
শিপ্রা সোফাতে হাজির পাশের জায়গায় বসে মুচকি হেসে বললে, আমি একদম সোজা ঘোড়ার মুখ থেকে পাক্কায়েস্ট খবর পেয়েছি তা-ও যে-সে ঘোড়া নয়, উত্তম স্কচ জাতীয় হোয়াইট হর্স-এর মুখ থেকে, যে আপনি তিন বোতল হোয়াইট হর্স গেলার পরও ঘোরঘুটি অন্ধকারে পথ-বিপথ ঠাহর করে করে, কালোয় কালোয় বর্ডার ক্রস করতে পারেন। অতএব আপনি যে এই অতি অল্প সময়ের মধ্যেই দ্রব্যগুণের প্রভাবে
বিষাদে হরিষ, ম্যাডাম হরিষে বিষাদ। এইমাত্র সেদিন আপনার আসার সঙ্গে সঙ্গে গোটা আগরতলাটা আলোয় আলোয় ঝলমল করে উঠল। চোখ কচলালুম, দু চোখ ভরে আরও দেখব বলে, চোখ খুলতেই দেখি, গোধূলির ম্লান আলো। আপনি গোধূলির ধূলি না ছুঁয়ে আপন ধুলো-পায়েই ফিরতি পথ ধরেছেন। হবে না বিষাদ? আর আপনার সঙ্গসুখের আনন্দটাও কি বেআইনি ক্ষণস্থায়ী।
কিন্তু এ বিষাদেও, হর্ষ না হোক, আমি একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারছি। উপস্থিত যা হাল তাতে গোটা পূর্ব-পাকিস্তান এবং লাগোয়া আগরতলা কোনও প্রাণীর পক্ষে স্বাস্থ্যকর তো নয়ই বরঞ্চ আয়ুক্ষয়, এমনকি বায়ু নির্বাপণেরও যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত সম্ভাবনা আছে।
শিপ্রা গম্ভীর কণ্ঠে বলল, পূর্ব পাকের আগুন আগরতলাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, এই তো আপনার আশঙ্কা? তবে বউবাচ্চাদের কথা ভাবছেন না কেন? দিন না পাঠিয়ে আমার সঙ্গে। ভাই খান, তুমি একটা কসম খেয়ে তাকে ভরসা দাও, প্লিজ, যে আমার বাড়িতে ওদের স্থানাভাব হবে না, আদরযত্নের ক্রটি হবে না। আমার মনে হয় আপনি এবং বাদবাকি বিবাহিত পুরুষের ৯৯% বড্ড ইরেসপনসি– ওই বিষয়টায় অন্তত।
হাতজোড় করে হাজি বিনীত কণ্ঠে বললে, আমি করজোড়ে স্বীকার করছি দারা-পুত্র সম্বন্ধে কোনও প্রকারের দুর্ভাবনা আমার সুখনিদ্রাটিকে কোনও কালেই রত্তিভর জখম করতে পারেনি কিন্তু ওদের নিরাপত্তা সম্বন্ধে আমি দশ বছর পূর্বেই একটা ফৈসালা করে রেখেছি। অবশ্য সবই ভগবানের হাতে। কিন্তু ইতোমধ্যে অর্থাৎ আজ ভোরে আমি অতি বিশ্বস্ত সূত্রে একটা ভয়াবহ সংবাদ পেয়েছি। কাহিনীটি প্রাচীন ও দীর্ঘ; আমি অতি, অতি সংক্ষেপে সারছি।
ইয়েহিয়া চায়, ভারতে একটা ক্যুনাল রায়েট লাগুক।
কম্যুনাল রায়েটের জন্য উত্তর ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের জমিন সবসময়েই তৈরি। উত্তর ভারতের উগ্রতম পন্থি কিছু হিন্দু আছেন, যারা পাকিস্তানের বিনাশ চান, এবং ভারতের মুসলমানদের নিতান্ত দায় পড়ে সহ্য করেন। এঁরা এই ইচ্ছেটা প্রকাশ করেন পলিটিকসের মুখোশ পরিয়ে (পাকিস্তান তৈরি হয়ে যাওয়া মাত্রই ভারত আক্রমণ করবে; তার পূর্বেই আমাদের আক্রমণ করা উচিত) এবং নিজেদের মনগড়া এক আজব হিন্দুধর্মের ঝাণ্ডা তুলে। আমি পরিপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ হিসেবে বলছি, তাঁরা যা প্রাণ চায় সে পলিটিক্স করুন, কিন্তু সনাতন ধর্মের এরকম নীচ অবমাননা যেন না করেন– ধর্মে সইবে না।
আর ভারতের প্রতি বিশেষ করে বহু বহু পাঞ্জাবিদের ঘৃণা, বিদ্বেষ, নফরত, শত্রুতা এমনই প্রচণ্ড যে তার কোনও তুলনা নেই। এদেরও একটা আজব মনগড়া ইসলাম আছে যে ইসলাম বলে, অমুসলমান মাত্রই কাফির এবং ভারতের কাফিরকুল তন্মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট অমানুষ। এদের কতল করা ইসলামের (তাদের মনগড়া ইসলামের) আদেশ– দোষী-নির্দোষী উভয়কে সমভাবে। এবং এদের স্ত্রীজাতিকে লুণ্ঠন করা সম্পূর্ণ শাস্ত্রসম্মত। পাঠানদের রক্তে-মজ্জায় থাকে সবচেয়ে বড় যে রিপু সেটা– লোভ, গৃধুতা ও তজ্জনিত তঙ্করবৃত্তি। কাফিরদের প্রতি তাদের ঘৃণা পাঞ্জাবিদের মতো রিফাইনড মিন নয়। ফলে পিণ্ডিতে যে কোনও সরকারই রাজত্ব করুন না কেন, ভারত-বিদ্বেষনীতি তারা অবলম্বন করতে বাধ্য, এবং গোপনে সোসাহে বিশেষ করে পাঠানদের আপ্যায়িত করেন এই বলে, দাঁড়াও না, দিল্লি লুণ্ঠন করার ব্যবস্থা শিগগিরই হচ্ছে।
উত্তর ভারতে কট্টর অখণ্ড পাকিস্তানপন্থি, যাদের সঙ্গে অন্য কারুরই তুলনা হয় না বেহারি মুসলমান। এদের এক প্রভাবশালী অংশ কলকাতায় বাস করেন। তাঁদের পাকিস্তান-প্রীতি চৌদ্দ আনা পরিমাণ নিতান্ত হীন স্বার্থবশত। তাদের ভাই-বেরাদর, একদা যারা, কবিদের মতো ঈষৎ অতিশয়োক্তি করে বলছি, পাটনা স্টেশনে কুলির কাজ করত আজ তারা পূর্ব বাঙলায় ট্রাফিক ম্যানেজার, রেলওয়ে সেক্রেটারি। বাইরে তারা উর্দু কথাবার্তা বলে খানদানি মনিষ্যিরূপে পরিচিত, ভিতরে বলেন, ভোজপুরি মঘি বা মৈথিলি। বিদ্যাপতি নিশ্চয়ই আপনার প্রিয় কবি; সে ভাষা যদি উর্দু হয় বদ্ধমানের পদী পিসির কোঁদলের ভাষাও তা হলে উর্দু। এই বেহারিদের অর্ধশিক্ষিত সম্প্রদায় উর্দুর কল্যাণে পাঞ্জাবিদের সঙ্গে একজোট হয়ে পুব বাঙলাকে শুষছেন, হীনতম কলোনির মতো। এরা এবং বেহার ও কলকাতার বেহারিগণ সূচ্যগ্র পরিমাণ স্বায়ত্তশাসন পূর্ব বাঙলাকে দিতে রাজি নয়। এরই ওপর নির্ভর করছে তাদের পাকিস্তান-প্রীতি।
