গৃহস্বামী অর্ধপরিচিত। বুঝিয়ে বললে, আপনি যদি ঘুণাক্ষরেও স্বীকার করেন আপনি আমাদের দেখেছেন– কথা কয়েছেন বললে তো কথাই নেই তবে আপনিও নিস্তার পাবেন না। তার পর তাদের দামি পাতলুন বুশসার্ট বার্টার করে পেল তিনখানা গামছা– চারখানা ছিল না। উপদেশ দিল, জামা পাতলুন উপস্থিত বাসন মাজার ডোবাতে ডুবিয়ে রাখুন– যদিও তার খুব একটা দরকার নেই, কারণ আমরা যখন মেথরের পথে ঢুকি, তখনও বাকি খানগুলো পিছন ফিরে গলির মুখ অবধি পৌঁছয়নি।
বন্দুক তারা গোটাপাঁচেক খাটা পাইখানা পেরুবার সময় যেটা সবচেয়ে জঙ্গলে ভর্তি, নোংরা সেটাতে পুঁতে দিয়ে দ্বিতীয় গলিতে ঢোকে নিরস্ত্র নিরীহ নাগরিকের মতো।
তখন তাদের সামনে একমাত্র সমস্যা, রাত্রের মতো বা দু দিনের মতো আশ্রয় নেয় কোথায়? গামছা-পরা অবস্থায় সঙ্গের দশ টাকার একগুচ্ছ নোট রাখে কোথায়? ওদের কপাল ভালো, একটা বাড়ির সামনে দেখতে পেল কাটা মুরগির রক্ত। খোঁড়াতে বেড়াতে গিন্নিমার কাছ থেকে ভিক্ষে চেয়ে নিল খানিকটে হলুদ চুন আর ন্যাকড়া। নোট কানা পায়ে সাজিয়ে তার উপর বাঁধল নোংরা ন্যাকড়ার বান্ডেজ। তার উপর মাখাল মুরগির রক্ত, কোনও জায়গায়-বা কিঞ্চিৎ হলুদ রক্তের সঙ্গে মিশিয়ে করা হল পুঁজের সাব্সটিটুট। এমারজেনসির জন্য দু দুখানা দশ টাকার নোট ভাঁজ করে পিটে পিটে প্রায় কবচের সাইজে এনে, কলাপাতা দিয়ে মুড়ে, বেঁধে মাড়ি আর গালের মাঝখানে দুজনা দুটো গুজল।
রাত্রিটা কোথায় কাটানো যায়, এই তখন সমস্যা। এদের একজন উকিল। তিনি সঙ্গীকে বললেন, আদালতে সঞ্চিত তার অভিজ্ঞতা মতে ক্রিমিনাল মাত্রেরই একমাত্র ভরসা বেশ্যাবাড়ি। সেখানে যে কোনও লোক বনাফাইডি ক্লায়েন্টরূপে যেতে পারে। কোনও পুলিশ, সেপাই আর যা শুধোর শুধুক, এ প্রশ্নটা তুমি এখানে কেন?– সম্পূর্ণ অবান্তর। ক্রিমিনালকে লুকিয়ে রাখা, আশ্রয় দেওয়া ওদের একটা সাইড প্রফেশন। কিন্তু এই গামছা-পরা লোকদুটোকে আশ্রয় দেবে কি? দেবে। যদি আগাম টাকা ফেলা যায়। উকিল তাই বুদ্ধি করে কিছুটা গালে পুরে রাখার ব্যবস্থা করেছিল। মেয়েদের পাড়ায় বরাতজোরে তারা আশ্রয় পেয়ে গেল। খেয়া পেরুবার সময় নৌকাডুবিতে ওদের জামাকাপড় ভেসে গেছে এ অজুহাত মেয়ে দুটো কতখানি বিশ্বাস করেছিল সেটা অবান্তর। রোক্কা দশটি টাকা সর্বঅজুহাতের চেয়ে বড় যুক্তি।
রাত্রে মেয়েগুলো আমাদের মিলিটারি সম্বন্ধে তাদের অভিজ্ঞতা শোনাল। প্রথমেই আরম্ভ করল, বলে ওরা নাকি মুসলমান। ডোম-চাড়ালকেও ওরকম মেয়েমানুষ গিলতে আমরা কখনও শুনিনি। কোনওদিন আমাদের নিয়ে যেত ছাউনিতে সেখানে যা হত বলে কাজ নেই নীলাটা তো মারাই গেল। পালাতে পারলে তো বাঁচি। আশ্রয় দেবে কে আর রোজ ওই এক জিগির, ওদের সর্দার ভদ্রঘরের মেয়ে চান, আমরা জোগাড় করে দিলে মেলাই টাকা পাব। তার পর তারা প্রায়ই ঠা ঠা করে হেসে বলত, মাস খানেক পরে মুতেই পাওয়া যাবে। ঢাকা থেকে খবর এলেই আমরা শুরু করব সব কুছু। একদিনেই স্কুল-কলেজ থেকে এক ঝাঁপটায় নিয়ে যাব সবকটা মেয়ে আর পাড়ায় পাড়ায় বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে।
কীর্তি দম নিয়ে বললে, দুই বন্ধু এ কথাগুলো পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি কিন্তু আমি করি।
সপ্তাহখানেক ওদের লেগেছিল পাবনা পৌঁছতে।
শিপ্রা শুধাল, ওরা অত দূরের পথ না নিয়ে পদ্মা পেরিয়ে ইন্ডিয়া চলে গেল না কেন?
ওদের কপাল। ওরা ভুল খবর পেয়েছিল, চাঁপাই-নওয়াবগঞ্জ থেকে যশোর অবধি মিলিটারির কড়া পাহারা অবশ্য সে পাহারা মোতায়েন হয়েছে, সবে, সেদিন।
পাবনার পাশ দিয়ে যাবার সময় এক কনস্টেবল উকিলকে চিনে ফেলল। কিন্তু সে করল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত আচরণ। ছুটে এসে তাকে কানে কানে বলল, উকিলের নামে হুলিয়া বেরিয়েছে।… তখন জানতে পারলেন, পুলিশ আর ফৌজে তখন রীতিমতো নিরস্ত্র লড়াই, পারলে ওদের আশ্রয় দেয়। পুলিশটাই দুজনাকে জেলেডিঙিতে তুলে দেবার সময় বলল, ওই একটামাত্র বাঁচওতা রয়েছে এখনও। খানরা পানি বড় ডরায়। নৌকো দূরে থাক, লঞ্চে পর্যন্ত উঠতে চায় না।
কীর্তি কথার মোড় ফিরিয়ে বললে, এদের হাতে এখন মাত্র দু মাস সময়। পুব বাঙলার এদিকটায় বিশেষ করে চেরাপুঞ্জির তলাকার সিলেটে বর্ষা নামে কলকাতার অনেক আগে। দু মাসেই কাজ গুটিয়ে নিতে হবে ওদের। তাই ওদের দণ্ড নেমে আসবে খুব শিগগিরই এ ধারণাটা কাল রাত্রেই আমার হয়েছিল; আজ এরা আপন অজানতে কনফার্ম করল।
আরেকটা কথা; এরা বললে, সেই দূর রাজশাহী অঞ্চল থেকে এই আগরতলা অবধি বহুলোকের সঙ্গে তাদের আলাপচারী হয়েছে। একজন লোকও পায়নি যার ধারণা আছে, এবারে যে মিলিটারি জুলুম আসছে সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকারের। ওরা ধরে নিয়েছে, পঁচিশ বছর ধরে নানা রাজা, নানাপ্রকারের খেল দেখিয়েছেন, এবারও সেটা হবে– বেশিরভাগেরই অবশ্যই উইশফুল থিঙ্কিং সমঝোতা হয়ে যাবে সেটারও প্রকৃতি হবে একইরকমের। উনিশ-বিশ হবে শুধু পরিমাণে।
কীর্তি বললে, ওদের দুজনাকে আমি তোমার কলকাতার ঠিকানা দিয়েছি।
শিপ্রা একটু চমকে বললে, তোমার প্রোগ্রাম কী?
যতটা বলেছি, ততখানি ঠিক আছে। আমি তোমাকে শিলঙে মিট করব। তার পর কলকাতা যাব। সেটার দিন স্থির করা তোমার হাতে। কলকাতায় ফিরে গিয়ে আমার কী হবে, আমি কী করব সেটা আমার হাতে তো নয়ই, তোমার হাতেও নয়, খুব সম্ভব।
